জিন্স ও টপস পরার কারণে এবার নরসিংদীতে তরুণীকে প্রকাশ্যে হেনস্তার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই এর জোরালো প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। কেউ কেউ এও লিখছেন, 'নারীরা কেমন পোশাক পরবে, এটাও কি কেউ ঠিক করে দেবে?' এর আগেও নানা সময় পোশাক পরা নিয়ে নারীকে লাঞ্ছিত হতে হয়েছে। ১৯৯৯ সালে টিএসসির সামনে 'থার্টিফার্স্ট নাইট' উদযাপনের সময় শাওন আক্তার বাঁধন নামে এক নারীর শ্নীলতাহানি করা হয়েছিল।

ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় সব আসামি খালাস পায়। সম্প্রতি কপালে টিপ পরা নিয়ে এক পুলিশ সদস্য একজন শিক্ষিকাকে হেনস্তা করেন। ঘরে, কর্মস্থল, রাস্তাঘাট- সর্বত্র প্রায়ই যৌন হয়রানির শিকার হন অনেক নারী। যদিও নারীর নিরাপত্তা ও নিরাপদে চলাচলে বাধা দিলে তা প্রতিরোধে দেশে বিভিন্ন আইন আছে। তবে এর প্রয়োগ নেই। এতে দিন দিন নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে। বদলেছে নিপীড়নের ধরনও। নারীর প্রতি সংবেদনশীলতা, মানবাধিকার, সম্প্রীতি, নৈতিকতার বিষয়গুলো সমাজের একটি বড় জনগোষ্ঠীর মনোজগতে অনুপস্থিত। এ ছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় নারীকে কটাক্ষ করে নানা ধরনের কথা বলেন অনেকে।

বিশিষ্টজনের মতে, বাংলাদেশে মাঝেমধ্যেই পোশাকের কারণে নারীদের বিব্রত হওয়ার খবর গণমাধ্যমে আসে। এমনকি নির্যাতনের শিকার হওয়া নারীকে উল্টো তাঁর পোশাকের জন্য দায়ী করার প্রবণতাও দেখা যায়। বাংলাদেশে একটি গবেষণা বলছে, নারীর প্রতি পুরুষের অবমাননাকর দৃষ্টিভঙ্গি এবং সহিংসতা দিন দিন বেড়েছে।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, দু'-একটি ছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারী নিপীড়নের ঘটনা ধাপাচাপা পড়ে। অনেকেই অভিযোগও করতে চান না। কেউ আবার অভিযোগ করলেও বিচারে দীর্ঘসূত্রতা ও সাক্ষীর অভাবে তা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে যায়। আবার অনেকে প্রভাবশালী হওয়ায় নির্যাতনের শিকার নারীরা মুখ খোলারও সাহস করেন না। আবার অনেক সময় দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে এক শ্রেণির বখাটে স্কুল-কলেজগামী ছাত্রীদের নিপীড়ন করে থাকে। তারা পোশাক ও শারীরিক গঠন নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে। অনেক এলাকার গ্যাং গ্রুপের সদস্যরা নারীদের টার্গেট করে এলাকায় দেয়ালে নানা ধরনের ছবি ও অশ্নীল কথা লিখে রাখে।

আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটের (উই ক্যান) প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক বলেন, রাষ্ট্রে নারী-পুরুষ সবার সমান অধিকার থাকবে। স্বাভাবিক নিয়মেই সবাই স্বাধীনভাবে চলাফেরা করবে। কিন্তু বাংলাদেশে নারীরা কি স্বাধীন? তাঁরা কি মুক্তভাবে সব জায়গায় যাওয়া-আসা করতে পারছেন? এর উত্তর- 'না।' এই দেশ নারীদের জন্য মোটেই নিরাপদ হয়ে উঠতে পারেনি। ঘর থেকে বের হলেই মনের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করে, ঠিকভাবে ঘরে ফিরতে পারবে তো? পথে কোনো সমস্যা হবে না তো? রাস্তা, যানবাহন, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোথাও নারী আজ নিরাপদ বোধ করছে না।

একশনএইড বাংলাদেশ বিভিন্ন সময়ে নারীদের নিয়ে নানা ধরনের গবেষণা করেছে। ওই সব গবেষণায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসহযোগিতা, বিচারহীনতা, যানবাহন, কর্মক্ষেত্র, রাস্তা, পার্ক ও বাজারে নারীর নিরাপত্তাহীনতার চিত্র উঠে এসেছে। এ ছাড়া যেসব আইন রয়েছে, তার যথাযথ প্রয়োগও নেই। এমনকি অনেকের আছে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা।

আইন থাকলেও নেই প্রয়োগ: বাংলাদেশে নারী ও শিশুর নিরাপত্তায় বেশ কয়েকটি আইন আছে। নারী-শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১০ ধারার বিধান অনুযায়ী অনধিক ১০ বছর, অর্থাৎ নিচে কিন্তু তিন বছরের ওপরে সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবে। দণ্ডবিধির ৩২৩ ধারার বিধান অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃত এক বছর পর্যন্ত যে কোনো মেয়াদে সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা এক হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড। মোবাইল কোর্ট আইন অনুযায়ী, ৫০৯ ধারার বিধান অনুযায়ী এক বছর পর্যন্ত যে কোনো মেয়াদে সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা জজকোর্টের আইনজীবী ওয়ালিউর রহমান দোলন সমকালকে বলেন, 'দেশের বিভিন্ন জেলা ও শহরে নারীর নিরাপত্তাহীনতা আছে। নারী কোনো দুর্ঘটনায় পড়ার পর আমরা খবর জানছি। কিন্তু নারীর কোনো ক্ষতি হওয়ার আগেই কীভাবে জানতে পারি, তার জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে মানুষকে সচেতন করা যেতে পারে। মানুষের মানসিকতা ও আচরণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কাজ করতে হবে।' আইন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নরসিংদীতে এমন একটা ঘটনা প্রকাশ্যে ঘটে যাওয়ার পরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মামলা না করার অজুহাত দেখিয়ে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। অথচ ঘটনাটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। গণমাধ্যমে প্রচার হয়েছে- তখন দোহাই দিচ্ছে 'ভুক্তভোগী মামলা করেননি'। এগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পুরোপুরি ব্যর্থতা।

মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, সচেতনতা বাড়ানো, আইনগত সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেগুলো দূর করতে পর্যাপ্ত আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব আমাদের অনেক পিছিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।