রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল, শ্রীলঙ্কাকে দেওয়া ঋণসহ কয়েকটি বিষয় বাদ দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হিসাবায়নে আইএমএফের পরামর্শ মানবে না বাংলাদেশ ব্যাংক। সংস্থাটির হিসাব পদ্ধতি অনুসরণ করলে দেশের রিজার্ভ প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার কমবে। বর্তমান অবস্থায় তাতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নামবে ৩৪ বিলিয়ন ডলারের ঘরে। সংস্থাটির হিসাব পদ্ধতি অনুসরণ না করে বিদ্যমান নিয়মেই হিসাব চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এমন সিদ্ধান্ত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বৈঠকের সভাপতিত্ব করেন। এমন এক সময়ে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হলো যখন আমদানি বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স কমাসহ বিভিন্ন কারণে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমেছে। বাজার ঠিক রাখতে চলতি অর্থবছর বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে ৫৫০ কোটি ডলার বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে করে গত বছরের আগস্টে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করা রিজার্ভ এখন ৪২ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমেছে।

গত বছরের ৩ থেকে ১৪ অক্টোবর আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে আসে। বাংলাদেশ সফরের পর সংস্থাটির পক্ষ থেকে একটি 'সেফগার্ড অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট' বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয়। সেখানে রিজার্ভ হিসাবায়নে বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তারতম্য উল্লেখ করে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে তা নিরসন করার সুপারিশ করা হয়। এরপর গত বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সংস্থাটিকে চিঠি দিয়ে প্রাথমিকভাবে রিজার্ভের হিসাবায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন না আনার সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

গত সোমবারের বৈঠকের জন্য প্রস্তুত করা প্রতিবেদনে বলা হয়, আইএমএফ বাংলাদেশ ব্যাংককে জানিয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ), গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড (জিটিএফ), লং টার্ম ফাইন্যান্সিং ফ্যাসিলিটি (এলটিএফএফ) এবং সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিমানকে দেওয়া অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বাণিজ্যিক ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার দায়। বর্তমানে ইডিএফে ৬০০ কোটি, জিটিএফে ২০ কোটি, এলটিএফএফে ৩ কোটি ৮৫ লাখ এবং সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিমানকে ৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার ঋণ দেওয়া হয়েছে। এই ৬২৮ কোটি ৬৫ লাখ ডলারের বাইরে কারেন্সি সোয়াপের আওতায় শ্রীলঙ্কাকে দেওয়া হয়েছে ২০ কোটি ডলার।

আর ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইটিএফসি) আমানত রয়েছে যা রিজার্ভ হিসাবে দেখানো হচ্ছে। তবে আইএমএফ মনে করে, এসব দায় রিজার্ভ হিসেবে বিবেচিত হবে না। সংস্থাটির ভাষায় এগুলো ইনভেস্টমেন্ট গ্রেড সিকিউরিটিজ। আইএমএফের ব্যালেন্স অব পেমেন্ট অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন (বিপিএম-৬) ম্যানুয়াল অনুযায়ী এসব দায় রিজার্ভ হিসেবে বিবেচিত হবে না। ফলে সেফগার্ড অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্টের মাধ্যমে আইএমএফ ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে এ অসংগতি নিরসনের সুপারিশ করে। বিপিএম-৬ ম্যানুয়াল তথা রেসিডেন্ট টু নন-রেসিডেন্ট অনুসারে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের হিসাবায়ন, সংকলন এবং রিপোর্ট পদ্ধতি সংশোধন করতে বলে সংস্থাটি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের নিট ও গ্রস আলাদা হিসাব হয়। নিট হিসাব থেকে ইডিএফসহ অন্যান্য তহবিল বাদ যায়। আর ১৯৮৯ সাল থেকে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলে অর্থ জোগান দিয়ে আসছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যা রিজার্ভের গ্রস হিসাবে দেখানো হচ্ছে। এ পদ্ধতি নিয়ে আইএমএফ বা অন্য কোনো সংস্থা আগে প্রশ্ন তোলেনি। যে কারণে বিদ্যমান পদ্ধতি অনুসারে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হিসাবায়ন অব্যাহত থাকবে।