বয়স ৮০ পার হয়েছে বেশিদিন হয়নি। এখনও ভোরে রাজধানীর ধানমন্ডি লেকে হাঁটাহাঁটি করেন কবির হোসেন। জন্ম থেকেই তিনি ঢাকায়। বসবাস করেন জিগাতলায়। তিন মেয়ের বিয়ে হয়েছে। স্ত্রীকে নিয়ে ছোট্ট সংসার। ভোরের স্নিগ্ধতা গায়ে মাখতে ছোটবেলা থেকেই সকালে সবুজে হেঁটে বেড়ান তিনি। এখন থেকে ৬০ বছর আগের স্মৃতি রোমন্থনে মনে পড়ে যায় জোনাকির ঝিকিমিকি, ঝিঁঝির ঝিঁঝি ও ব্যাঙের ডাক, যা ছিল শহরের সন্ধ্যার পরিচিত শব্দ। ছিল ডোবা, পুকুর ও গাছগাছালি। জলাভূমি ও গাছপালাই ছিল জীববৈচিত্র্যের আদর্শস্থল। কিন্তু আজ সেই জোনাকির জায়গা নিয়েছে আলো, ঝিঁঝির স্থান নিয়েছে বিভিন্ন যানবাহনের শব্দ এবং সেই ব্যাঙের আশ্রয়স্থলে স্থান পেয়েছে বড় বড় অট্টালিকা। ফলে শহরের প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ধ্বংস হয়ে গেছে জীববৈচিত্র্য।

এত গেল ঢাকা শহরের কথা। চলতি বছরের মার্চে অর্ধশতাধিক ঘুঘু হত্যার ঘটনা ঘটে চাঁদপুরের হাইমচরে। বীজ খেতে এসে প্রাণ হারাতে হয়েছিল সেগুলোকে। কারণ, সেখানে মেশানো ছিল বিষ। এভাবে কৃষিজমিতে ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ ধ্বংস করতে গিয়ে ফসলের উপকারী পোকামাকড়ও ধ্বংস হচ্ছে। কীটনাশকের কারণে বহু বিল, হাওর মাছশূন্য হয়ে পড়েছে। বহু প্রজাতির পাখিও অদৃশ্য হয়ে গেছে।

এ অবস্থায় আজ রোববার পালিত হচ্ছে বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবস। প্রতিবছরের মতো এবারও বাংলাদেশে যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে দিবসটি পালিত হবে। চারদিকে প্রাকৃতিক বিপর্যয়, নদীভাঙন, বন্যা, নদীর নাব্য কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার, বহু বন্য প্রাণীর সংকটাপন্ন অবস্থায় চলে যাওয়া- সব মিলিয়ে এবার দিবসটি বাড়তি গুরুত্ব বহন করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষিতে ব্যাপকহারে কীটনাশক ব্যবহার, বন উজাড়, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, সমুদ্র ও নদীদূষণের কবলে পড়েছে জীববৈচিত্র্য। এখনই এমন আগ্রাসী কর্মকাবন্ধ করা না গেলে জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে সঙ্গে মানুষও বিপন্ন হবে।

ইন্টারগভর্নমেন্টাল সায়েন্স পলিসি প্ল্যাটফর্ম অন বাইওডাইভার্সিটি অ্যান্ড ইকোসিস্টেম সার্ভিসেসের (আইপিবিইএস) ২০১৯-এর প্রতিবেদন অনুসারে, ৮০ লাখ উদ্ভিদ এবং প্রাণিজ প্রজাতি বিলুপ্তির মুখোমুখি। বিলুপ্তির এ হার বাংলাদেশে ২৪ শতাংশ; যা আরও বেশি। আইইউসিএনের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১ হাজার ৬১৯ প্রজাতির প্রাণী বাংলাদেশে দ্রুতই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আবার জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার আরেক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী ১ দশমিক ৪ শতাংশ বনাঞ্চল হারিয়ে গেছে, যে হার বাংলাদেশে ২ দশমিক ৬ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ আইইউসিএনের হিসাব অনুযায়ী, মোট ৪০টির বেশি প্রজাতির উভচর, সরীসৃপ, পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণীকে মহাবিপন্ন বা সংকটাপন্ন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সুন্দরবনে বিপদগ্রস্ত বন্যপ্রাণী প্রজাতির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত- রয়েল বেঙ্গল টাইগার, অজগর, রাজগোখরা, অ্যাডজুট্যান্ট স্টর্ক পাখি বা হাড়গিলা, সাদা পেটের সমুদ্র ঈগল, দুই প্রজাতির উদবিড়াল, মাসকেড ফিনফুট বা কালামুখ প্যারাপাখি, রিং লিজার্ড, মেছোবাঘ, স্যান্ডপাইপার বা চামচঠু?ঁটো বাটান পাখি, ঈগল এবং লেজার অ্যাডজুট্যান্ট বা মদনটাক পাখি। বৈশ্বিকভাবে বিলুপ্তপ্রায় বাটাগুর বাসকা প্রজাতির কচ্ছপ সুন্দরবনে পাওয়া গেলেও এখন বিপন্ন। এ ছাড়া গাঙ্গেয় ডলফিন, ইরাবতী ডলফিন এবং লোনাপানির কুমির প্রজাতিও বিপন্ন। এ ছাড়া গত চার দশকে সুন্দরবন থেকে মাছ উৎপাদন কমেছে প্রায় ৫৬ শতাংশ।

আইইউসিএন বাংলাদেশের জাতীয় কমিটির সভাপতি রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তিন লাখ ৩১ হাজার সংরক্ষিত বনভূমির মধ্যে এক লাখ ৩৮ হাজার ৬১৪ একর দখল হয়ে গেছে। আমাদের পরিকল্পনার মধ্যে জলজ ও ভেষজ এলাকা বাড়ানো দরকার। কিন্তু ২৪ হাজার নদী বা ৩৭৩টি জলাভূমির মধ্যে সব জায়গায় সম্পদ হ্রাস পাচ্ছে। মাছের উৎপাদন প্রায় এক-চতুর্থাংশে নেমে এসেছে। দখল হয়েছে ৭৭০টি নদীর প্রায় ৫৭ হাজার একর। বাঁধ দেওয়ায় তৈরি হচ্ছে বড় পলির স্তর। ফলে সুন্দরবনের মতো জায়গায় আগুন ধরছে। একই সঙ্গে ঢাকা শহরে সবুজের বিস্তার কমতে কমতে এখন ৯ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে। ফলে সবুজ এলাকা নির্ধারণ করা দরকার।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, বর্তমানে উন্নয়নের যে ধারা তা ধ্বংসাত্মক, মানুষও প্রকৃতিবিরোধী। একটি ক্ষুদ্র লতা থেকে আবিস্কৃত হতে পারে অনেক জটিল রোগের নিরাময়। তাই প্রাণ, উদ্ভিদ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা ধ্বংস করে আবাসন, শিল্পায়ন করার প্রক্রিয়া রোধ করতে হবে।