কয়েক দশক আগেও গ্রামবাংলায় দেশি কচ্ছপ বা কাছিমের দেখা পাওয়া অতি স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। তখন অনেক জলাশয়েই কচ্ছপ মিলত। কিন্তু তা এখন অনেকটা বিলুপ্তির পথে। বাসস্থানের অভাব, প্রাকৃতিক বনভূমি ধ্বংস, কৃষিজমিতে কীটনাশক প্রয়োগ, চাষের জন্য বনভূমি পোড়ানো, সাগরে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহারসহ নানা কারণে হারিয়ে যাওয়ার শেষ প্রান্তে রয়েছে বাংলাদেশের কচ্ছপ ও কাছিম। এ অবস্থায় আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব কচ্ছপ দিবস। যুক্তরাষ্ট্রের অলাভজনক সংস্থা আমেরিকান টরটয়েজ রেসকিউর উদ্যোগে কচ্ছপ রক্ষার ওপর নজর বাড়াতে ২০০০ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেগুলো পানিতে থাকে, সেগুলো কাছিম এবং যেগুলো স্থলে বসবাস করে, সেগুলো কচ্ছপ।

বিলুপ্ত হওয়ার শেষ প্রান্তে থাকা এসব কচ্ছপ ও কাছিমকে সংরক্ষণের জন্য কাজ করছে ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স (সিসিএ)। সংগঠনটির তথ্যমতে, পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত ৩৬১ প্রজাতির কচ্ছপ-কাছিম টিকে রয়েছে। এদের মধ্যে ৫১ শতাংশ বর্তমানে বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে। বাংলাদেশে ২৫ প্রজাতির মিঠাপানির কচ্ছপ-কাছিমের দেখা মেলে। এর মধ্যে ২১ প্রজাতির কচ্ছপ-কাছিমকে বাংলাদেশসহ পৃথিবীব্যাপী বিপন্ন, মহাবিপন্ন ও সংকটাপন্ন হিসেবে ঘোষণা করেছে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন নেচার (আইইউসিএন)। বন্যপ্রাণী বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা কনজারভেশন অ্যালায়েন্সের ২০১৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২২ প্রজাতির কচ্ছপ পাওয়া যায়। এ হিসাবে বিশ্বের সবচেয়ে কম জায়গায় সবচেয়ে বেশি প্রজাতির কচ্ছপ রয়েছে বাংলাদেশে। সামগ্রিকভাবে কচ্ছপের প্রজাতি সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম।

পরিবেশবিদ ও প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বঙ্গোপসাগরে জেলেদের ব্যবহার করা অবৈধ ট্রলিং জালে (ধ্বংসাত্মক বেহুন্দি প্রকৃতির জাল) সামুদ্রিক কচ্ছপ আটকা পড়ে মারা যাচ্ছে। এ ছাড়া কচ্ছপের যখন ডিম দেওয়ার জন্য বালিয়াড়িতে যাওয়ার সময় হয়, তখন সমুদ্রে মাছ ধরায় ব্যস্ত জেলেদের জালে আটকা পড়ে। আবার ট্রলারের পাখায় কাটা পড়ে মারা যায়। স্থলে থাকা কচ্ছপ বিলুপ্ত হচ্ছে নগরায়ণের ফলে।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. সাজেদুল হক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, সামুদ্রিক দূষণ (প্লাস্টিক ও অব্যবহূত পরিত্যক্ত জাল), সামুদ্রিক পরিবেশে পানির লবণাক্ততা, জৈব ও ভৌত গুণাগুণের পরিবর্তন এবং আবাসস্থলের চরম বিপত্তির কারণে কচ্ছপ মারা যাচ্ছে।

দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে কয়েক বছর আগেও ডিম পাড়ার জন্য গভীর সমুদ্র থেকে ছুটে আসত শত শত মা কচ্ছপ। শামুক-ঝিনুকে ভরপুর দ্বীপের নির্জন সৈকতে ডিম পেড়ে সেই কচ্ছপ পুনরায় গভীর সাগরে ফিরে যেত। এখন সে সুযোগ নেই। অতিরিক্ত পর্যটক, মাত্রাতিরিক্ত দূষণসহ নানা কারণে দ্বীপে ডিম পাড়তে এসে মারা পড়ছে অসংখ্য কচ্ছপ। জোয়ারের পানিতে সেই মরা কচ্ছপ ভেসে আসছে উপকূলে।

ওয়ার্ল্ড ফিশের ইকো ফিশ-২ প্রকল্পের পরিসংখ্যান বলছে, পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে একের পর এক মরে ভেসে আসছে কচ্ছপ। গত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত কুয়াকাটা সৈকতে ভেসে এসেছে সাতটি মৃত অলিভ রেডলি কচ্ছপ।

পার্বত্য অঞ্চলে জীববৈচিত্র্যের বাস্তব চিত্র জানতে ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত জরিপ চালান ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্সের গবেষকরা। কচ্ছপ সংরক্ষণের প্রথম ধাপ হিসেবে স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করে জনসচেতনতা সৃষ্টি করে ১০টি গ্রামের ১২০ জন পাহাড়ি শিশুর জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে তাদের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করে কচ্ছপ সম্পর্কে সচেতন করাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেয় তারা। দ্বিতীয় ধাপে ২০১৭ সালে গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে বাংলাদেশ বন বিভাগের সহযোগিতায় কচ্ছপ সংরক্ষণ সেন্টারে মহাবিপন্ন ১৬টি আরাকন কাছিম, শিলা কচ্ছপ, হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ ও দিবা কচ্ছপ দিয়ে এদের বংশবিস্তারের কার্যক্রম শুরু করে।

২০১৯ সালে এখানে আরও ১১টি এবং ২০২০ সালে আরও ১২টি কচ্ছপ যুক্ত হয়ে বর্তমানে ওই সেন্টারে ৩৯টি কচ্ছপ ও কাছিম রয়েছে। ২০১৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এখানে ১০২টি শিলা কচ্ছপের বাচ্চা প্রজনন হয়।

ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্সের কর্মকর্তা সরীসৃপ গবেষক শাহারিয়ার সিজার বলেন, আমরা প্রতিবছর অন্তত ২০০ কচ্ছপ বনে ফিরিয়ে দিতে চাই। আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আছে। কারণ, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া সংরক্ষণ সম্ভব নয়। ভাওয়াল কচ্ছপ সেন্টারের বাইরেও কাছিমের প্রজননের কাজ করছেন এবং এরই মধ্যে বড় সফলতা পেয়েছেন জানিয়ে শাহারিয়ার সিজার বলেন, চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামীর মাজারে যে কাছিম রয়েছে, তা বায়েজিদ বোস্তামীর কাছিম হিসেবে পরিচিত।

বোস্তামীর কাছিম নিয়ে কচ্ছপ সেন্টারের প্রকল্প ম্যানেজার ফাহিম জামান জানান, পুকুরের দূষিত পানি ও পকুরপাড়ের মাটি শক্ত হওয়ায় ডিম থেকে বাচ্চা ফোটে না। এ ছাড়া ডিম দেওয়ার জন্য নিরাপদ জায়গা না থাকা এবং কুকুর, বিড়াল, কাকসহ বিভিন্ন প্রাণী কাছিমের ডিম খেয়ে ফেলাসহ নানা সমস্যায় এদের প্রজনন বৃদ্ধি পাচ্ছে না।

বন অধিদপ্তরের উপপ্রধান বন সংরক্ষক (বন ব্যবস্থাপনা উইং) মো. জাহিদুল কবির বলেন, আমরা কচ্ছপের প্রজাতি সংরক্ষণে কাজ করছি। গাজীপুরের ভাওয়ালে ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্সকে কাছিম নিয়ে কাজ করতে আমরা অনুমতি দিয়েছি। কাছিম রক্ষায় সমন্বিতভাবে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।