করোনা শুরুর দিকে বড় স্বপ্ন নিয়েই ভারতের বেঙ্গালুরুতে যান ঢাকার হাতিরঝিলের বাসিন্দা ২২ বয়সের এক তরুণী। কথা ছিল সেখানে মাসে ৩০ হাজার টাকা বেতনে বিউটি পার্লারে চাকরি পাবেন। দিন দশেক যাওয়ার পর তাঁকে একটি যৌনপল্লিতে বিক্রি করা হয়। এরপর সেখান থেকে পালানোর পর গত বছরের মে মাসে টিকটক হৃদয়সহ নারী পাচারকারী একটি চক্রের হাতে পড়ে বীভৎস নির্যাতনের শিকার হন। ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ভারত-বাংলাদেশে তোলপাড় শুরু হয়।

প্রায় এক বছর পর গত শনিবার দেশে ফিরলেন নির্যাতনের শিকার ওই তরুণী। ঢাকা মহানগর পুলিশের একটি টিম যশোরের বেনাপোল বন্দর থেকে ভারতীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে আরও তিন তরুণীসহ তাঁকে বুঝে পায়। দেশের মাটিতে পা রেখেই অঝোরে কাঁদতে থাকেন ওই তরুণী। পুলিশের গাড়িতে ওঠার পর প্রথমে বললেন, 'মা-বাবার কাছে যেতে চাই। কত দিন তাঁদের দেখি না। ভাইবোনকে দেখতে চাই।' ঢাকায় পৌঁছার পরপরই ওই তরুণীকে তাঁর মা-বাবার সঙ্গে দেখা করানো হয়। এ সময় এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। মেয়েটির বাবা ভ্রাম্যমাণ শরবত বিক্রেতা। তিনি বারবার পুলিশকে বলছিলেন, 'স্যার আমরা এলাকা ছেড়ে চলে যাব। নতুনভাবে অন্য কোনো এলাকায় গিয়ে ঠাঁই নেব। অনেক দিন হাতিরঝিল এলাকায় আছি। কেউ মেয়ের দিকে ভবিষ্যতে বাজেভাবে তাকাবে, এটা সহ্য করতে পারব না। মা-বাবার সঙ্গে সাক্ষাৎপর্ব শেষে তাকে নেওয়া হয় ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে। আজ রুটিন শারীরিক পরীক্ষা করানো হবে। এরপর আদালতের মাধ্যমে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হবে।

ঢাকায় ফেরার পথে ওই তরুণী কী বললেন জানতে চাইলে পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, 'তরুণী বারবার বলছিলেন, স্যার এটা আমার দ্বিতীয় জীবন। লড়াই করেই বাঁচতে চাই। কারিগরি কিছু নিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াব। অনেক কষ্টের সংসার আমাদের। ভালো আয় করে সংসারের অভাব দূর করার স্বপ্ন ছিল। সেটা পারিনি। জীবনে এটা দ্বিতীয় বিপর্যয়। যার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল, সেও কোনো খোঁজ নিত না।

অনেক সময় বাসায় খাবারের কিছু থাকত না। এমন পরিস্থিতিতে ভারতে পার্লারে চাকরির প্রস্তাব পাই। পরিবারের অসম্মতিতে সেখানে গিয়ে বড় ধরনের বিপদে পড়েছি। কিছু লোক পাশে থাকার কারণেই প্রাণে বেঁচে দেশে আসতে পেরেছি।'

ওই তরুণী আরও বলেন, 'এটাই খারাপ ভারতে যারা আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছে তারা বাংলাদেশি। কয়েকজনের সঙ্গে আগে থেকেই পরিচয় ছিল। আমি নাকি পতিতালয় থেকে অনেক বাংলাদেশি তরুণীকে পালাতে সহায়তা করেছি। এই কারণে ওরা আমার সঙ্গে জঘন্য আচরণ করে। তবে ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ভারতীয় পুলিশ জড়িতদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। এরপর পাচারকারী চক্রেরই একজন পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেন। তখন টিকটক বাবুসহ অন্যরা ধরা পড়ে।

পুলিশের ওই কর্মকর্তা জানান, মেয়েটি যখন তাঁর সংগ্রাম, নিপীড়নের কাহিনি বলছিলেন তখন তাঁদের চোখও অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। এটা ভয়ংকর কাহিনির কোনো সিনেমার গল্পকে হার মানাবে।

তরুণী পুলিশকে জানান, হাতিরঝিলে বসবাসের কারণে একই এলাকার বাসিন্দা টিকটক হৃদয়ের সঙ্গে পরিচয় ছিল। ২০২০ সালে হঠাৎ একদিন হাতিরঝিলের লেকপাড়ে একটি মেয়েকে কাঁদতে দেখেন তিনি। পরিচয় জানতে চাইলে তিনি নিজেকে রিয়া বলে জানান। তখন রিয়া জানান, টিকটক হৃদয় তার বন্ধু। এ সময় ওই তরুণী বলেন, হৃদয় তারও বন্ধু। এরপর রিয়াকে তার মুগদার বাসায় নিয়ে যান ওই তরুণী। মাসে ২ হাজার টাকা ভাড়ায় একটি রুমে তাঁরা থাকতেন। ওই সময় নির্যাতনের শিকার ওই তরুণী ঢাকার একটি হাসপাতালে মাসে ৫ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করতেন। দুই মাস রিয়া তাঁর বাসায় থাকার পর অন্যত্র চলে যান। তবে ফোনে তাঁদের মধ্যে যোগাযোগ হতো। এক দিন রিয়া তাঁকে জানান, বেঙ্গালুরুতে ভালো চাকরি আছে। তাঁর মা সেখানে বিউটি পার্লার চালান। ওই প্রস্তাবে রাজি হয়ে টিকটক হৃদয়ের পরিচিত আরেক তরুণীর সঙ্গে বেনাপোল দিয়ে অবৈধ পথে ভারতে তাঁদের নেওয়া হয়। সীমান্ত এলাকায় আলামিন নামে একজন তাঁদের নৌকা দিয়ে পার হতে সহায়তা করেন। হৃদয়ের মাধ্যমে বেঙ্গালুরু যাওয়ার পর তাঁকে বিউটি পার্লারে কাজ করার কিছু সরঞ্জামও কিনে দেওয়া হয়। দিন দশেক পর একটি হোটেলে তাঁকে পাঠানো হয়। ওই দিন কৌশলে ওই হোটেল থেকে পালান তিনি। এরপর হৃদয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এর পরই হৃদয় ভারতে তাদের আরেকটি আস্তানায় ওই তরুণীকে নিয়ে বীভৎস নির্যাতন চালায়। এই চক্রে তার সঙ্গে ছিল বাংলাদেশ-ভারতকেন্দ্রিক নারী পাচারকারী চক্রের সদস্য সবুজ, জামাল, রাফসান মণ্ডল, রকিবুল ইসলাম সাগর, নদী, মোহাম্মদ বাবু, ডালিম আজিমসহ কয়েকজন।

পুলিশের আরেক কর্মকর্তা বলেন, আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের ঢাকার লিয়াজোঁ অফিস এনসিবির মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার ওই তরুণীকে ভারত থেকে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ভারত ও বাংলাদেশের দুটি এনজিও এতে সহায়তা করে। তাদের তত্ত্বাবধানে চার তরুণীকে ফেরত আনা গেছে। তাদের মধ্যে তিনজন যশোরের 'জাস্টিস অ্যান্ড সেফ হোম' নামে এনজিওর হেফাজতে রয়েছে। নারী পাচার চক্রের বিরুদ্ধে হাতিরঝিল থানায় ৬টি মামলা তদন্তাধীন। কয়েকটি মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে। এসব মামলায় এখন পর্যন্ত ২০ জনকে ঢাকায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ চক্রের সদস্যদের মধ্যে আছে ইসরাফিল হোসেন খোকন, আল-আমিন, আব্দুল হাই, সাইফুল, তাসলিমা, বিনাশ শিকদার, আমিরুল, আনিস, আলম, মেহেদি হাসান বাবু, মহিউদ্দিন, সালাম, বকুল ওরফে ছোট খোকন, পলক মণ্ডল, রিফাদুল ইসলাম হৃদয় ওরফে টিকটক হৃদয়, সাগর, আখিল, রুবেল ওরফে রাহুলসহ আরও অনেকে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেন, নির্যাতনের শিকার তরুণীকে সব ধরনের মানসিক সমর্থন দেওয়ার জন্য পরিবারের সদস্যদের বলা হয়েছে। তাকে কাউন্সেলিং করানো জরুরি।