বন্দরনগরী চট্টলায় অবশেষে নতুন নেতৃত্বে সাজতে যাচ্ছে যুবলীগ। আগেই বেজেছে চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা যুবলীগের কমিটি গঠনের বাঁশি। ঠিকঠাকও হয়ে আছে সম্মেলনের দিনক্ষণ। এর মাধ্যমে ভাঙবে নেতৃত্বের খরায় পড়া যুবলীগের অচলায়তন। তিন ইউনিটের শীর্ষ ছয় পদ (সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক) বাগাতে চলছে অসম এক প্রতিযোগিতা। পদযুদ্ধে নামা নেতার সংখ্যা ১৮৯। রীতিমতো রেকর্ড! এর আগে চট্টগ্রাম যুবলীগের শীর্ষ পদ পেতে এত সংখ্যক নেতাকে একসঙ্গে লড়তে দেখা যায়নি। যুবলীগের সম্মেলন হলেও এবার ভোটাভুটির পথে হাঁটার সুযোগ কিংবা সম্ভাবনা দুটিই কম। তাই চট্টগ্রামের প্রভাবশালী সাত আওয়ামী লীগ নেতার অঙ্গুলি হেলনের ওপর ভর করে আসতে পারে নতুন নেতৃত্ব। এ কথা জানা জীবনবৃত্তান্ত জমা দেওয়া ১৮৯ পদপ্রত্যাশীর।

এ প্রেক্ষাপটে শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের সঙ্গে সম্পর্কের সেতু তৈরির চেষ্টায় আছেন যুবলীগের মহানগর কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশীরা। তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ সালামের দপ্তর ও বাসায় যাওয়া-আসা বাড়িয়েছেন উত্তর যুবলীগের শীর্ষ দুই পদ কবজায় নিতে আগ্রহী নেতারা। আর দক্ষিণ যুবলীগের পদপ্রত্যাশীরা 'দোয়া' চাইছেন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও দক্ষিণের সভাপতি মোছলেম উদ্দিন এমপির কাছে। যুবলীগের নেতৃত্বে নিজেদের নাম দেখতে চট্টগ্রামের প্রভাবশালী সাত আওয়ামী লীগ নেতার কাছে ধরনা দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন তিন সাংগঠনিক জেলার পদপ্রত্যাশী এক ডজনের বেশি নেতা।

কমিটির ফাঁড়া কাটছে দেড় যুগ পর :চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের শেষ সম্মেলন হয়েছিল ১৮ বছর আগে। চট্টগ্রাম উত্তর জেলায় সম্মেলন বসছে দীর্ঘ ১৯ বছর পর। আর চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলায় সম্মেলন করে যুবলীগের কমিটি গঠনের ঘটনা হবে এবারই প্রথম। আগামী ২৮, ২৯ ও ৩০ মে যথাক্রমে অনুষ্ঠিত হবে চট্টগ্রাম দক্ষিণ, উত্তর ও মহানগর যুবলীগের সম্মেলন। এ জন্য গত ২ থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে রাজনৈতিক জীবনের ইতিবৃত্ত সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় কমিটি। সব মিলিয়ে জমা পড়েছে ১৮৯টি। এর মধ্যে আগ্রহী বেশি মহানগরে। এখানে সভাপতি পদে ৩৫ আর সাধারণ সম্পাদক পদে লড়তে চান ৭১ জন। অন্যদিকে, উত্তর জেলায় সভাপতি পদে ৯ জন ও সাধারণ সম্পাদক পদে ২২ জন আর দক্ষিণ জেলায় সভাপতি পদে ১৩ ও সাধারণ সম্পাদক পদে ৩৯ জন জীবনবৃত্তান্ত কেন্দ্রে জমা দিয়েছেন।

ইলেকশন, না সিলেকশন :চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুবলীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুর রহমান সোহাগ বলেন, 'চট্টগ্রাম যুবলীগের মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলার নতুন নেতৃত্ব সম্মেলনের মাধ্যমে তুলে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিতর্কিত কেউ এবারে কমিটিতে আসতে পারবে না।' নগর, উত্তর ও দক্ষিণের কমিটি গঠনে কেন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের সমর্থন চাচ্ছেন আগ্রহী প্রার্থীরা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'কোন প্রক্রিয়ায় কমিটি হবে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত আসবে। আমরা চেষ্টা করব, ভোটাভুটির মাধ্যমে নেতৃত্ব ঠিক করতে। যদি ভোটাভুটি হয়, তাহলে আওয়ামী লীগ নেতাদের সমর্থন কোনো কাজে আসবে না। যাঁরা এখন ছোটাছুটি করছেন, তাঁরা মনে করছেন- সিলেকশনের মাধ্যমে কমিটি হবে। আসলে কী হবে, তা এখন বলতে চাই না আমরা।'

পদপ্রত্যাশীরা যা বলছেন :মহানগর যুবলীগের সভাপতি পদপ্রত্যাশী এম আর আজিম নওফেলের অনুসারী। তিনি বলেন, 'নগর আওয়ামী লীগের যেসব নেতা ছায়া দিয়েছেন, তাঁদের সমর্থন নিয়েই এগোচ্ছি আমি।' আরেক অনুসারী হাবিবুর রহমান তারেক বলেন, 'বড় নেতাদের আশীর্বাদ না থাকলে রাজনীতিতে সামনে এগিয়ে যাওয়া কঠিন।' সাধারণ সম্পাদক পদের প্রার্থী নুরুল আজিম রনি বলেন, 'যোগ্যতা নেতা নির্বাচনের মাপকাঠি হওয়া উচিত। কমিটি গঠনের আগে নিশ্চয় স্থানীয় আওয়ামী নেতাদের সঙ্গে আলাপও করবেন কেন্দ্রীয় নেতারা।'

আ জ ম নাছিরের অনুসারী হয়ে যাঁরা জীবনবৃত্তান্ত জমা দিয়েছেন, তাঁদেরও অভিন্ন মত। সভাপতি প্রার্থী দিদারুল আলম দিদার বলেন, 'চট্টগ্রামের রাজনীতিতে যাঁরা অপরিহার্য, তাঁদের মতামতের প্রতিফলন থাকতে পারে কমিটিতে।' সাধারণ সম্পাদক পদের প্রার্থী আবু মুহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, 'বিপদে-আপদে যে নেতাকে পাশে পাই, তাঁর দোয়া আছে আমার ওপর।'

উত্তর জেলার কমিটিতে সভাপতি প্রার্থী এস এম রাশেদুল আলম বলেন, 'উত্তরে আওয়ামী লীগের হাল ধরে আছেন যাঁরা, তাঁদের সবার সঙ্গে আলাপ করেই প্রার্থী হয়েছি আমি।' আরেক সভাপতি প্রার্থী রাজিবুল আহসান সুমন ও সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী মিজানুর রহমান এরই মধ্যে তিন নেতার সঙ্গে দেখা করে তাঁদের ছবি ফেসবুকে পোস্টও করেছেন।

দক্ষিণে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে যে চারজন আলোচনায় আছেন, তাঁদের সবাই ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও এমপি মোছলেম উদ্দিনের 'কাছের মানুষ' হিসেবে পরিচিত।
বড় নেতার ছায়ায় থেকে পদ বাগানোর ছক :মহানগর যুবলীগের শীর্ষ দুই পদে আগ্রহীর সংখ্যা ১০৬। দুটি বলয়ে বিভক্ত হয়েই জীবনবৃত্তান্ত জমা দিয়েছেন তাঁরা। এক বলয়ে মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের অনুসারী, অন্য বলয়ে আ জ ম নাছিরের সমর্থকরা। অতীতে দুটি বলয় থেকে 'ভারসাম্য রক্ষা' করে কমিটি দিয়েছে কেন্দ্র। এবারও দুই নেতার আশীর্বাদ নিয়ে পদ পেতে মরিয়া তাঁদের অনুসারীরা।

সভাপতি পদপ্রত্যাশী উল্লেখযোগ্য নেতারা হলেন- দিদারুল আলম দিদার, মাহবুবুল হক সুমন, এম আর আজিম, দিদারুল আলম, হেলাল উদ্দিন, নুরুল আনোয়ার, হাসান মুরাদ বিপ্লব, সুরজিৎ বড়ুয়া লাভু, আরশাদুল আলম বাচ্চু, হাবিবুর রহমান তারেক, আবদুল মান্নান ফেরদৌস, মোহাম্মদ সাজ্জাত হোসেন প্রমুখ।

সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য লড়ছেন- মোহাম্মদ ওয়াসিম, দেবাশীষ পাল দেবু, আবু মুহাম্মদ মহিউদ্দিন, ইলিয়াছ উদ্দিন, আবু নাছের চৌধুরী আজাদ, সনেট বড়ূয়া, ইমরান আহমেদ ইমু, নুরুল আজিম রনি, শহিদুল কাওসার, ফজলে রাব্বি সুজন, আলমগীর টিপু, ইয়াসির আরাফাত, তালেব আলী, মাহবুব আলম আজাদ, সাইফুল আলম লিমন প্রমুখ।

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবলীগের কমিটি গঠনে বড় ভূমিকা থাকতে পারে তথ্যমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ সালামের। পদপ্রত্যাশীরা এই তিন নেতার কাছে গিয়ে 'দোয়া' নিচ্ছেন।

উত্তর জেলায় সভাপতি পদ চাইছেন- নুরুল মোস্তফা মানিক, এস এম রাশেদুল আলম, রাজিবুল আহসান সুমন, মজিবুর রহমান স্বপন, দীপক দত্ত, নাসির হায়দার বাবুল, আবুল বশর, গোলাম কিবরিয়া, হাসান মুরাদ প্রমুখ। সাধারণ সম্পাদক পদে জীবনবৃত্তান্ত জমা দিয়েছেন- মিজানুর রহমান মিজান, আবু তৈয়ব, সৈয়দ মঞ্জুরুল আলম মঞ্জু, আরজু সিকদার, শেখ ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী, মো. শাহজাহান, এস এম আল নোমান, সালাউদ্দিন বাবু, এরশাদ হোসেন, মোহাম্মদ খালেদ, জয়নাল আবেদীন, আবদুল আউয়াল তুহিন, রাশেদ খান মেনন প্রমুখ।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা যুবলীগের কমিটি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এবং জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বোয়ালখালী আসনের এমপি মোছলেম উদ্দিন। এ দুই নেতার সমর্থন পেতে তাই নানাভাবে চেষ্টা করছেন আগ্রহী প্রার্থীরা।

দক্ষিণ জেলা যুবলীগের সভাপতি পদের জন্য লড়ছেন পার্থ সারথি চৌধুরী, মো. ফারুক, নাসির উদ্দিন মিন্টু, জহিরুল ইসলাম, তৌহিদুল ইসলাম, এম এ রহিম প্রমুখ। এ ছাড়া সাধারণ সম্পাদক পদ পেতে জীবনবৃত্তান্ত দিয়েছেন আবু সাদাত সায়েম, মহিউদ্দিন মাহি, নুরুল আমিন, সাইফুল আলম, আরিফুজ্জামান আরিফ, মো. আলাউদ্দিন প্রমুখ।