পদ্মা সেতুকে রাজধানী ও দক্ষিণবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে টোল নির্ধারণ করেছিল সরকার। কথা ছিল পদ্মা সেতু চালুর দিন থেকেই তা কার্যকর হবে, কিন্তু তার আগেই সেই টোল বাড়াতে চায় সরকার। জনগণের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় নীতিমালার আলোকে ওই টোল নির্ধারিত হয়েছিল। অর্থ বিভাগ অনুমোদিত ওই টোল হার বাড়িয়ে পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

টোল নীতিমালা-২০১৪ অনুযায়ী মাঝারি ট্রাককে ভিত্তি ধরে টোল নির্ধারণ করা হয়। নীতিমালার গাণিতিক হিসাবে ৫৫ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়েতে মাঝারি ট্রাকে কিলোমিটারের টোল ২০ টাকা ১৮ পয়সা। কিন্তু পদ্মা সেতুর উচ্চ টোল ও জনগণের ওপর চাপ কমাতে কিলোমিটারে ১০ টাকা প্রস্তাব করেছিল টোল নির্ধারণে গঠিত কমিটি। নীতিমালা অনুযায়ী, বড় বাসে টোল মাঝারি ট্রাকের ৯০ শতাংশ। এ হিসাবে এক্সপ্রেসওয়েতে বড় বাসের টোল কিলোমিটারে ১৮ টাকা ১৬ পয়সা। তবে কমিটি ৯ টাকা প্রস্তাব করেছিল। কমিটি সূত্র জানিয়েছে, এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় তুলতে নীতিমালা অনুযায়ী টোল আদায় করতে চায় সরকার। কমিটির এক সদস্য সমকালকে জানিয়েছেন, নীতিমালার চেয়ে কম টোল নির্ধারণ করলে আইনি প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে কমিটির প্রস্তাব থাকবে, মাঝারি ট্রাকে কিলোমিটারে ১৩-১৪ টাকা টোল নির্ধারণ করার।

কমিটির সদস্য যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী সমকালকে বলেছেন, পদ্মা সেতুতে টোল বেশি। এক্সপ্রেসওয়েতেও নীতিমালা অনুযায়ী টোল ধরলে পরিবহন ব্যয় বাড়বে। শুনেছি, কিলোমিটারে ১২ টাকা প্রস্তাব করা হতে পারে। তবে ১০ টাকাই অনেক বেশি। এর চেয়ে বেশি হওয়া যৌক্তিক নয়।

এক্সপ্রেসওয়ের টোল হার পর্যালোচনা ও পুনর্নির্ধারণে আজ মঙ্গলবার সড়ক পরিবহন সচিব নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অংশীজনদের সঙ্গে সভা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা স্থগিত করা হয়েছে। আগামী ৪ জুন অবসরে যাচ্ছেন নজরুল ইসলাম। এ বি এম আমিন উল্লাহ নূরী সচিবের দায়িত্ব পেয়েছেন। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উপসচিব (টোল ও এক্সেল) ফাহমিদা হক খান সমকালকে বলেছেন, নতুন সচিবের সভাপতিত্বে এক্সপ্রেসওয়ের টোল পুনর্নির্ধারণে সভা হবে।
আগামী মাসে পদ্মা সেতু উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেদিন থেকেই টোল আদায়ে গত ১৭ মে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সেতু বিভাগ। একই দিন এক্সপ্রেসওয়েতে টোল আদায়ের কথা সমকালকে জানিয়েছেন এর নির্মাণকারী সংস্থা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) প্রধান প্রকৌশলী এ কে এম মনির হোসেন পাঠান। এখন টোলপ্লাজা নির্মাণ না হওয়ায় কীভাবে টোল আদায় সম্ভব- এ প্রশ্নে প্রধান প্রকৌশলী বলেছেন, টোল আদায় হবে সফটওয়্যারে। তা ইনস্টল ও কারিগরি দিক ঠিক করতে বেশি সময় লাগবে না।

পদ্মা সেতুর টোল আদায় ও রক্ষণাবেক্ষণে কোরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে করপোরেশন (কেইসি) ও চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে (এমবিইসি) নিয়োগ করেছে সরকার। এক্সপ্রেসওয়ের টোল আদায় ও রক্ষণাবেক্ষণের ঠিকাদারি কাজ কেইসিকে দিতে গত আগস্টে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।

দুই পাশে সার্ভিস লেনসহ ১১ হাজার ৪৪ কোটি টাকায় নির্মিত ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা সড়ক দেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে। কিলোমিটারপ্রতি ২০১ কোটি টাকা নির্মাণ ব্যয়ের কারণে সড়কটি দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুলও। প্রতি মোড়ে ওভারপাস, ফ্লাইওভার থাকায় বিনা বাধা, বিনা সিগন্যালে এতে গাড়ি চলে। পর্যায়ক্রমে সব চার লেনের মহাসড়কে টোল আদায় করতে চায় সরকার। তবে সার্ভিস লেনে টোল ছাড়াই চলতে পারবে যানবাহন। সার্ভিস লেন স্থানীয়সহ সব ধরনের যানবাহনেই উন্মুক্ত থাকবে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে প্রথম বুড়িগঙ্গা সেতু, ধলেশ্বরী-১ ও ২ সেতু হয়ে মাওয়ায় পদ্মা সেতুর সংযোগ সড়ক পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ের দৈর্ঘ্য ৩৫ কিলোমিটার। সংযোগ সড়কের দৈর্ঘ্য ১২ কিলোমিটার। ৩ দশমিক ১৪৮ কিলোমিটার ভায়াডাক্টসহ পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ২৯ কিলোমিটার। পদ্মা সেতু পেরিয়ে পাচ্চর থেকে আড়িয়াল খাঁ সেতু হয়ে ভাঙ্গা ইন্টারচেঞ্জ পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ে ২০ কিলোমিটার।

ঢাকা-মাওয়া অংশে ৮৪৭ মিটার দীর্ঘ বুড়িগঙ্গা সেতু ও ৮৫৩ মিটার দীর্ঘ ধলেশ্বরী সেতু রয়েছে। পাচ্চর-ভাঙ্গা অংশে আড়িয়াল খাঁ সেতু ৪৫০ মিটার দীর্ঘ। এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প পরিচালক সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সবুজ উদ্দিন খান সমকালকে বলেছেন, এক্সপ্রেসওয়েতে টোল আদায় শুরু হলে এ তিন সেতুতে আলাদা করে টাকা দিতে হবে না।

নীতিমালায় মাঝারি ট্রাককে ভিত্তি ধরে টোল নির্ধারণ করা হয়েছে। ৭৫০ মিটারের বেশি দৈর্ঘ্যের সেতুতে মাঝারি ট্রাকের টোল ৪০০ টাকা। এর চেয়ে কম দৈর্ঘ্যের সেতুতে টোল ২০০ টাকা। সড়কে প্রতি কিলোমিটারের টোল দুই টাকা। এ হিসাবে বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী ও আড়িয়াল খাঁ সেতুতে টোল হাজার টাকা। ৫৫ কিলোমিটার সড়কপথের টোল ১১০ টাকা। সর্বমোট ১ হাজার ১১০ টাকা, যা প্রতি কিলোমিটারে দাঁড়ায় ২০ টাকা ১৮ পয়সা। কমিটি এর অর্ধেকের পূর্ণ সংখ্যা তথা ১০ টাকা প্রস্তাব করেছিল।
নীতিমালা অনুযায়ী, তিন এক্সেলের ট্রেইলারের টোল মাঝারি ট্রাকের আড়াই গুণ, বড় ট্রাকে দুই গুণ। বড় বাসে টোল মাঝারি ট্রাকের ৯০ শতাংশ। মিনি ট্রাকে ৭৫ শতাংশ, মিনিবাসে ৫০, মাইক্রোবাস ও পিকআপে ৪০, প্রাইভেটকারে ২৫ শতাংশ এবং মোটরসাইকেলে ৫ শতাংশ।

এ হিসাবে এক্সপ্রেসওয়ের প্রতি কিলোমিটারে ট্রেইলারে ৫০ টাকা ৪৫ পয়সা, বড় ট্রাকে ৪০ টাকা ৩৬ পয়সা, ছোট ট্রাকে ১৫ টাকা ১৪ পয়সা, মিনিবাসে ১০ টাকা ৯ পয়সা, মাইক্রোবাস ও পিকআপে ৮ টাকা ৭ পয়সা, প্রাইভেট কারে ৫ টাকা ৫ পয়সা এবং মোটরসাইকেলে ১ টাকা ১ পয়সা।

৫৫ কিলোমিটারের এক্সপ্রেসওয়ের পুরোটায় চললে ট্রেইলারের টোল ২ হাজার ৭৭৫ টাকা টোল দিতে হবে। মাঝে পদ্মা সেতুতে ছয় হাজারসহ মোট দিতে হবে ৮ হাজার ৭৭৫ টাকা। নীতিমালা অনুযায়ী, এক্সপ্রেসওয়েতে বড় ট্রাকে ২ হাজার ২২০, বড় বাসে ৯৯৯, ছোট ট্রাকে ৮৩৩, ছোট বাসে ৫৫৫, মাইক্রোবাস, জিপ, পিকআপে ৪৪৪, প্রাইভেটকারে ২৭৮ ও মোটরসাইকেলে ৫৬ টাকা টোল আসে।

তবে কমিটি ট্রেইলারে ১ হাজার ৩৭৫ টাকা, ভারী ট্রাকে ১ হাজার ১০০, মাঝারি ট্রাকে ৫৫০, বড় বাসের ৪৯৫, ছোট ট্রাকের ৪১৩, ছোট বাসের ২৭৫, মাইক্রোবাস, জিপ ও পিকআপের ২২০ এবং প্রাইভেটকারের ১৩৮ টাকা প্রস্তাব করেছিল। যা গত বছরের এপ্রিলে অর্থ বিভাগ অনুমোদন করেছিল। কমিটির প্রস্তাবে মোটরসাইকেলের বিষয়ে কিছু বলা নেই।

কমিটি সূত্র জানিয়েছে, মাঝারি ট্রাকে কিলোমিটারে চার টাকা বাড়লে অন্যান্য যানবাহনে নীতিমালায় উল্লিখিত এই শতাংশের হিসাবে টোল বাড়বে। এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণাধীন ঢাকা বাইপাসের সমজাতীয় প্রকল্প। বাইপাসে মাঝারি ট্রাকে কিলোমিটারে ১৬ টাকা ৫০ পয়সা টোল নির্ধারিত হয়েছে। টোল নির্ধারণ কমিটির একজন সদস্য সমকালকে জানিয়েছেন, আপাতত ১৩-১৪ টাকা এবং দুই বছর পর বাইপাস চালু হলে এক্সপ্রেসওয়েতে সমান হারে টোল আদায়ের প্রস্তাব করা হবে।

বিষয় : ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে

মন্তব্য করুন