'আমি ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর!/ আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী-সূত বিশ্ব-বিধাতৃর!/ আমি ব্যোমকেশ, ধরি বন্ধন-হারা ধারা গঙ্গোত্রীর/ বল বীর- চির-উন্নত মম শির!' কাজী নজরুল ইসলাম মাত্র ২২ বছর বয়সে ১৫০ পঙ্‌ক্তির তাঁর বিখ্যাত ভুবনবিজয়ী বিদ্রোহী কবিতা লেখেন। এ কবিতার মাধ্যমে তিনি অসত্য, অকল্যাণ, অশান্তি, অমঙ্গল, অন্যায় ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে কণ্ঠ উচ্চারণ করেন। শৃঙ্খল-পরা আমিত্বকে মুক্তি দিতে চান তিনি। তিনি এ কবিতাটি ১৯২১ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে লেখেন। ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি তাঁর এ 'বিদ্রোহ' কবিতাটি বিজলী পত্রিকায় প্রকাশ হয়। বিদ্রোহী এ কবিতাটির প্রকাশের শতবর্ষে পদার্পণ করেছে এ বছর। কবি নজরুল ধূমকেতুর মতো বাংলায় আবির্ভূত হয়েছিলেন সাম্য ও মানবতার গান নিয়ে। লিখেছিলেন, 'গাহি সাম্যের গান-/ মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।' রোমান্টিক কবি-প্রতিভায় সৌন্দর্য, প্রেমের জন্য সুতীব্র বাসনাও ফুটে ওঠে তাঁর কবিতায়। প্রেম, মুক্তি ও বিদ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৩তম জয়ন্তী আজ বুধবার। তিনি শুধু সাহিত্যে নন, বাঙালির রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলনেও প্রভাব বিস্তার করেন।

বাংলা ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ বর্ধমান জেলার আসানসোলের জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামে তিনি জন্মেছিলেন। তাঁর ডাক নাম 'দুখু মিয়া'। পিতার নাম কাজী ফকির আহমেদ ও মা জাহেদা খাতুন। শৈশব থেকেই দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করে বেড়ে ওঠেন তিনি। আর সেই পথপরিক্রমায় তিনি হয়ে ওঠেন অসাম্প্রদায়িক ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী।

কাজী নজরুল ইসলাম সাহিত্যের সব শাখায় বিচরণ করলেও তাঁর পরিচিতি মূলত কবি হিসেবে। ১৯২২ সালে তাঁর বিখ্যাত কবিতা-সংকলন 'অগ্নিবীণা' প্রকাশিত হয়, যা বাংলা কবিতায় এক নতুন ধারার সৃষ্টি করে। তাঁর রচিত 'চল, চল, চল' বাংলাদেশের রণসংগীত। প্রায় ৩ হাজার গান রচনা ও সুর করেছেন তিনি। ইসলামী সংগীত বা গজল রচনা করে তিনি নতুন এক ধারার সূচনা করেন। একই সঙ্গে সমানতালে রচনা করেন শ্যামাসংগীত। মধ্যবয়সে তিনি পিকস ডিজিজে আক্রান্ত হন। এর ফলে আমৃত্যু তাঁকে সাহিত্যকর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। এক সময় তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। ১৯৭২ সালের ২৪ মে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবি নজরুলকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। এ সময় বঙ্গবন্ধু তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেন। ১৯৭৬ সালে কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব এবং 'একুশে পদক' দেওয়া হয়। একই বছরের ২৯ আগস্ট মারা যান তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
নজরুলের প্রেম, বিয়ে বিচ্ছেদ, গ্রেপ্তার, সমাবেশ এবং কাব্য ও সংস্কৃতি চর্চাসহ বহু ঘটনার নীরব সাক্ষী কুমিল্লা শহর। সেই হিসেবে এবার কুমিল্লায় কবির জন্মবার্ষিকীর মূল অনুষ্ঠান করা এবং প্রতিপাদ্য 'বিদ্রোহীর শতবর্ষ' বিশেষ তাৎপর্যময়।
কর্মসূচি :জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। জাতীয় পর্যায়ে কবির জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার। সকাল সাড়ে ৬টায় কবির সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের শ্রদ্ধা জানিয়ে মাধ্যমে জন্মবার্ষিকীর কর্মসূচি শুরু হবে। সকাল ১১টায় কুমিল্লার বীরচন্দ্র গণপাঠাগার ও নগর মিলনায়তন প্রাঙ্গণে (টাউন হল) কাজী নজরুলের জন্মদিনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ এমপির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি থাকবেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সিমিন হোসেন রিমি এমপি, কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার ও কবি পৌত্রী খিলখিল কাজী। স্বাগত বক্তব্য দেবেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবুল মনসুর। স্মারক বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রাক্তন অধ্যাপক ও নজরুল-গবেষক শান্তিরঞ্জন ভৌমিক। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরিবেশনায় নৃত্যনাট্যসহ ৩০ মিনিটের সাংস্কৃতিক পর্ব থাকবে।

ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। উদ্বোধন করবেন কবি কামাল চৌধুরী। সভাপতিত্ব করবেন ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জাকির হোসেন। জাতীয় শিল্পকলার নাট্যশালা মিলনায়তনে সন্ধ্যা ৭টায় আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়াও জাতীয় কবির স্মৃতিবিজড়িত ময়মনসিংহের ত্রিশাল, কুমিল্লার দৌলতপুর, মানিকগঞ্জের তেওতা, চুয়াডাঙ্গার কার্পাসডাঙ্গা এবং চট্টগ্রামে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ও স্থানীয় প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় যথাযোগ্য মর্যাদায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী উদযাপন করা হবে। দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জেলা পর্যায়ে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিবসটি পালন করা হবে। এদিকে কাজী নজরুলের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আইডিইবি ভবনের মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি মিলনায়তনে জাতীয় নজরুল ইনস্টিটিউটের আয়োজনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। দুপুরে জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছে 'বিদ্রোহী : শতবর্ষে শতদৃষ্টি' শীর্ষক সাত শতাধিক পৃষ্ঠার স্মারকগ্রন্থ। 'বিদ্রোহী : শতবর্ষে শতদৃষ্টি' গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা। গ্রন্থটি উৎসর্গিত হয়েছে বাংলা একাডেমির প্রয়াত সভাপতি, নজরুল-সাধক জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের স্মৃতিতে।

ত্রিশাল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি জানান, কাজী নজরুল ইসলামের জয়ন্তী উপলক্ষে ময়মনসিংহের ত্রিশালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আজ বুধবার বিকেলে তিন দিনব্যাপী উৎসবের উদ্বোধন হবে। এ উৎসবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নজরুল গ্রামীণ মেলা ও বইমেলা উপভোগ করবেন সবাই। এদিকে জাতীয় কবির জয়ন্তী উপলক্ষে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধনী দিনের প্রথমপর্বে গতকাল মঙ্গলবার আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। 'বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগে নজরুলের বাংলাদেশে আগমনের সুবর্ণজয়ন্তী (৫০ বছর)' শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখর এতে সভাপতিত্ব করেন।
আলোচনা সভার আগে সাহিত্যে অধ্যাপক ড. প্রীতিকুমার মিত্র (মরণোত্তর) ও সংগীতে শিল্পী সুজিত মোস্তফাকে নজরুল পদক দেওয়া হয়। দ্বিতীয় পর্বে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক সেমিনার। এতে প্রবন্ধকার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লেখক, গবেষক ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি মফিদুল হক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ার সাঈদ ও পশ্চিমবঙ্গের ডায়মন্ড হারবাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটির কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. তপন মণ্ডল।