দক্ষিণখানের সোনারখোলার পিঙ্ক সিটি সংলগ্ন এলাকা। আশপাশে অনেক নির্মাণাধীন বাড়ি। রয়েছে সীমানা প্রাচীরে ঘেরা দেওয়া ছোট ছোট প্লটও। এখনও নগরায়ণের পুরোপুরি ছোঁয়া না লাগায় চারপাশ বেশ সুনসান। গত শুক্রবার দুপুরে ওই এলাকার বাসিন্দা বেল্লাল হোসেন গরু চরাতে সেখানে যান। হঠাৎ তিনি একটি প্লটের ঝোপের ভেতর থেকে শব্দ শুনতে পান। একটু এগিয়ে দেখতে পান এক বীভৎস দৃশ্য। তিন ব্যক্তি এক তরুণীর ওপর বর্বরতা চালাচ্ছে। বুঝতে পারেন, ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটছে। চিৎকার দেন বেল্লাল। এরপর আশপাশের অনেকে এগিয়ে আসেন।

লোকজন দেখে তিন ব্যক্তি পালানোর চেষ্টা করে। এর পরই দ্রুত জাতীয় জরুরি সেবা '৯৯৯'-এ কল করেন বেল্লাল। মিনিট দশেকের মধ্যে পুলিশের একটি টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে। স্থানীয়দের সহায়তায় ওই তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলো- মারুফ ইসলাম, বিল্লাল মিয়া ও মো. রাকিব। উদ্ধার করা হয় তরুণীকেও। এর পরই বাক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী ওই তরুণী ইশারা ও অভিব্যক্তিতে বুঝিয়ে দেন তাঁর ওপর তিনজনের পৈশাচিকতার ঘটনা। বাকপ্রতিবন্ধী হওয়ায় নিজের নাম-পরিচয় কিছু জানাতে পারেননি।

পুলিশ ওই তরুণীর শারীরিক পরীক্ষার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি করে। পরিবারের সদস্যদের হাসপাতালে নেওয়া হলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। প্রতিবন্ধী তরুণী প্রথমেই মায়ের গলা জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এরপর বাবাকে দেখেও একই অবস্থা হয় তাঁর। ওই তরুণীর বাবা সমকালকে বলেন, 'প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে মাইয়্যা আমার কেবল তিনটি শব্দ বলতে পারে- আব্বা, মা ও ভাইয়্যা। আমাদের দেখে চিক্কুর দিয়া গলা ধইর‌্যা কানদন দেয়। বিছানা থেকে ঠেইল্যা উঠাইয়া বাড়ি যাওয়ার ইশারা করে।'

তরুণীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। পেশায় তারা তিনজন রিকশাচালক। একই এলাকায় রিকশা চালানোর কারণে তিন-চার বছর ধরে মারুফ, বিল্লাল ও রাকিবের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। গতকাল আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় তারা। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ ও আদালতের জবানবন্দিতে উঠে আসে, মারুফ ও রাকিব ঘটনার দিন বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে ওই তরুণীকে নিয়ে আসে। অনেক দিন ধরে রেলস্টেশনে ঘোরাঘুরি করতেন প্রতিবন্ধী মেয়েটি। একই রেলস্টেশনে বহু বছর ধরে ভিক্ষা করেন আরেক শারীরিক প্রতিবন্ধী রাহাত। তার এক পা পঙ্গু। স্টেশনে থাকা ভবঘুরে কোনো নারীকে কেউ টার্গেট করলে রাহাতের শরণাপন্ন হয় তারা। ওই তরুণীকে দুইশ টাকার বিনিময়ে মারুফ ও রাকিবের হাতে তুলে দেন রাহাত। এরপর অটোরিকশা করে দক্ষিণখানের নির্জন এলাকায় নেয় তারা। সেখানে পৌঁছার পর ফোন করে তাদের বন্ধু বিল্লালকে। তিনজন একত্রিত হওয়ার পর দলবদ্ধ ধর্ষণে লিপ্ত হয়।
তদন্ত সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্যাতনের শিকার তরুণীর পরিচয় শুরুতে কোনোভাবে পাচ্ছিল না স্থানীয় পুলিশ। এরপর হঠাৎ ফেসবুকে একটি ভিডিওর সূত্র ধরে গত সোমবার তাঁর পরিচয় পাওয়া যায়। ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার তিন পাষণ্ড ও তরুণীকে উদ্ধারের ছবি ও ভিডিও ফেসবুকে দেন দক্ষিণখানের বাসিন্দা বেল্লাল হোসেন। এর পরই পটুয়াখালীর কলাপাড়া থেকে এক ব্যক্তি তাঁকে জানান, ওই তরুণী তাঁর বোন। বাসা থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর ১৭ মে কলাপাড়া থানায় জিডি করা হয়েছিল। তবে তাঁর কোনো খোঁজ মিলছিল। এরপর বিষয়টি পুলিশকে জানান বেল্লাল। পুলিশ ওই ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁদের ঢাকায় আসার পরামর্শ দেন। সোমবার ওই তরুণীর মা-বাবা, ভাই ও পরিবারের অন্য সদস্যরা দক্ষিণখান থানায় আসেন।

তরুণীর বাবার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক ছেলে, দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে বড় অভাবের সংসার তাঁর। তাঁর পেশা দিনমজুরি। কয়েক মাস আগে তাঁর প্রতিবন্ধী মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলেন। বিয়ের পর দু'বার স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় এসেছিলেন ওই তরুণী। মাসখানেক আগে স্বামী তাঁকে গ্রামের বাড়িতে রেখে যান। এরপর আর খোঁজখবর নিতেন না। কীভাবে তাঁর প্রতিবন্ধী মেয়ে একাকী ঢাকা পর্যন্ত এসে রেলস্টেশনে আশ্রয় নিয়েছেন, এটা তাঁদের অজানা।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উত্তরা বিভাগের ডিসি মোর্শেদ আলম সমকালকে বলেন, মেয়েটির জবানবন্দির জন্য আদালতের ধার্য তারিখে বধির স্কুল থেকে একজন বিশেষজ্ঞ আমরা নেব। যাতে প্রতিবন্ধী তরুণীর ভাষা তিনি আদালতকে বুঝিয়ে দিতে পারেন। এ ছাড়া নানা আলামতের প্রতিবেদন পাওয়ার পর তা আদালতে উপস্থাপন করা হবে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দক্ষিণখান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আজিজুল হক মিয়া বলেন, যার কাছ থেকে মেয়েটিকে ওরা এনেছিল তাকে গ্রেপ্তারে এরই মধ্যে একাধিক জায়গায় অভিযান চালানো হয়েছে।
দক্ষিণখান থানার ওসি মামুনুর রহমান বলেন, তরুণীর পরিবারটি এতটা হতদরিদ্র, তাদের পাশে কেউ না দাঁড়ালে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কঠিন। শুরুতে মেয়েটির পরিচয় নিশ্চিত হতে না পারায় পুলিশ বাদী হয়েই মামলা করেছে। পরিবারটি ঢাকায় আসার পর তাঁদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও আমরা করেছি।