ঠিক ২৫ বছর আগে, ১৯৯৭ সালে প্রাক-সমীক্ষার মাধ্যমে প্রমত্ত পদ্মায় সেতু নির্মাণে যে স্বপ্নের বীজ বপিত হয়েছিল, তা সিকি শতাব্দীর চড়াই-উতরাই শেষে আগামী ২৫ জুন পূরণ হতে যাচ্ছে। সেদিন স্বপ্নের পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর নামে সেতুর নামকরণের প্রস্তাব করা হলেও তা অনুমোদন করেননি সরকারপ্রধান। পদ্মা নদীর নামেই সেতু পাচ্ছে বাংলাদেশ।

গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে পদ্মা সেতু উদ্বোধনের সারসংক্ষেপ নিয়ে গণভবনে যান সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। দেড় ঘণ্টা পর বেরিয়ে সাংবাদিকদের তিনি জানান, যান চলাচলের জন্য ২৫ জুন শনিবার সকাল ১০টায় পদ্মা সেতু উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
কথিত দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি বাতিলের ঠিক ১০ বছর পর নিজের টাকায় নির্মাণ করা পদ্মা সেতু চালু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
পদ্মা সেতু প্রকল্পে ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি ২০১২ সালের ২৯ জুন বাতিল করে বিশ্বব্যাংক।

ওবায়দুল কাদের বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে দুটি সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করেছিলেন। একটি পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের দিনক্ষণ অনুমোদন। আরেকটি শেখ হাসিনার নামে সেতুর নামকরণ। প্রধানমন্ত্রী নামকরণ-সংক্রান্ত সারসংক্ষেপে সই করেননি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, 'পদ্মা সেতুর নাম হবে নদীর নামে। এটি কারও নামে করার দরকার নেই।' সেতুমন্ত্রী জানিয়েছেন, ২৫ জুনের আগেই সেতুর নিচতলায় (লোয়ার ডেক) রেললাইনের স্থাপন বাদে বাকি সব কাজ সম্পন্ন হয়ে যাবে।

প্রকল্প সূত্র জানিয়েছে, গতকাল পর্যন্ত মূল সেতুর ৯৮ দশমিক ৫ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। গত ২৯ এপ্রিল মূল সেতুতে পিচঢালাই (কার্পেটিং) কাজ শেষ হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে সেতুর মাওয়া প্রান্তের ভায়াডাক্টের (মাটির ওপর উড়াল অংশ) কার্পেটিংয়ের কাজ। জাজিরা প্রান্তেও কার্পেটিংয়ের কাজ শনিবার সম্পন্ন হয়েছে। মূল সেতুতে রোড মার্কিং ও রেলিং স্থাপনের কাজ চলছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রতীকে পরিণত হওয়া পদ্মা সেতুর ৪১৫টি ল্যাম্পপোস্টে বিদ্যুৎ সংযোগের কাজ চলছে। ১ জুন পল্লী বিদ্যুতের সংযোগে পদ্মা সেতু আলোকিত হবে। সেতুর দুই প্রান্তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার ৪০ ফুটের ম্যুরাল তৈরি করা হচ্ছে।

২০০১ সালের ৪ জুলাই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হলেও ২০০৩ সালে শুরু হয়ে ২০০৫ সালের মার্চে শেষ হয় পদ্মা সেতুর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা। ২০০৭ সালে প্রকল্পটি সরকারের অনুমোদন পায়। ২০০৯ সালে হয় সেতুর বিস্তারিত নকশা। তখন পরিকল্পনা ছিল, ২০১৩ সালেই চালু হবে সেতু।

ঋণ পেতে ২০১১ সালের এপ্রিলে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল। সেতুর পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির কথিত অভিযোগ করে বিশ্বব্যাংক সরে গেলে সহ-অর্থায়নকারী জাইকা, এডিবি ও আইডিবিও সরে যায়। ২০১৫ সালে নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে সেতু চালু করার লক্ষ্য থাকলেও প্রাকৃতিক ও কারিগরি বাধায় তা হয়নি।

অনুমোদনের সময় পদ্মা সেতুর নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ হাজার কোটি টাকা। ট্রেন চালাতে দ্বিতল সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্তে ব্যয় বেড়ে হয় ২২ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা। তবে শেষ পর্যন্ত ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা লাগছে। মূল সেতুর নির্মাণ ব্যয় ১২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। বাকি ১৮ হাজার ৬০ কোটি টাকা লাগছে নদীশাসন, সংযোগ সড়ক, সার্ভিস এরিয়া নির্মাণ এবং ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে।

পদ্মা সেতু দক্ষিণবঙ্গের ১৯ জেলাকে সড়কপথে ঢাকার সঙ্গে যুক্ত করবে। এই প্রকল্পে ২৯ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে অর্থ বিভাগ। টোলের টাকায় ঋণ শোধ ও সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে। গত ১৭ মে টোল হার নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সেতু বিভাগ। পদ্মা সেতুতে মোটরসাইকেলে ১০০ টাকা, প্রাইভেটকারে ৭৫০, ছোট বাসে ১ হাজার ৪০০, মাঝারি বাসে দুই হাজার ও বড় বাসে ২ হাজার ৪০০ টাকা টোল দিতে হবে। পণ্যবাহী গাড়িতে ১ হাজার ৬০০ থেকে ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত টোল লাগবে।