প্রাত্যহিক জীবন থেকে যদি হারিয়েও যায়, টিকে থাকবে ধর্মগ্রন্থে- এমন ভাবনা থেকে বাংলাদেশের লেঙামরা নিজেদের ভাষায় বাইবেল অনুবাদের কাজে হাত দিয়েছেন। মাত্র হাজার পাঁচেক মানুষের এই ভাষাটার কথা আছে মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের ভাষা জরিপে। তবে এই ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী নেই সরকারের ৫০টি 'ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী'র তালিকায়।

গারো পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী এই আদিবাসীদের মান্দি বা গারো বলে চেনে। খাসি বলেও সংশয় করে কেউ কেউ। কোটা সুবিধা পাওয়ার জন্য সরকারি কাগজপত্রে তারা নিজেরাও গারো বলে পরিচয় দিয়ে থাকে বলে জানালেন প্রভাত নংউরা। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর এই লেঙাম তরুণ জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য তিনিও নিজেকে গারো বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে আরও অনেকে লেঙামের মতো নিজের জাতিসত্তার স্বীকৃতি চান তিনি।

আদিতে মান্দিদের মতো লেঙামরাও সর্বপ্রাণবাদী সাংসারেক ধর্মের অনুসারী ছিল। তবে কিছু পার্থক্য ছিল বলে জানালেন কপসিং নংব্রিং। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার জন্ম ১৯১৭ সালে। তবে তিনি নিজের বয়স ১২৫ বছর বলে দাবি করেন। বাংলাদেশে বসবাসকারী লেঙামদের মধ্যে সবচেয়ে প্রবীণ এই ব্যক্তিটি জানালেন, লেঙামরা মনে করে ব্লি এই দুনিয়া সৃষ্টি করেছেন। অন্তত ৯০ বছর আগে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষা নেওয়া এই প্রবীণ এর বেশি কিছু মনে করতে পারেননি। তবে তিনি জানালেন, সাংসারেক মান্দিদের সঙ্গে সাংসারেক লেঙামদের বেশ কিছু পার্থক্য ছিল। সাংসারেক মান্দিরা মনে করে তাতারা রাবুগা দুনিয়ার সৃষ্টিকর্তা।

প্রায় এক শতক ধরে ধর্মান্তরের মধ্য দিয়ে শতভাগের মতো খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী হয়ে পড়া এ দুটি মাতৃতান্ত্রিক জনজাতি বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে একাকার হয়ে যাচ্ছে। মান্দি ও লেঙামদের মধ্যে মূল পার্থক্য ভাষায়। তুলনামূলকভাবে লেঙামদের সঙ্গে খাসিদের অনেক বেশি মিল রয়েছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কোষাধ্যক্ষ, সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী রাজাই গ্রামের বাসিন্দা এন্ড্রু জুয়েল সলমার। তিনি বলেন, 'আমি একজন লেঙাম। আমার জানা মতে লেঙামরা খাসিদের একটি গোত্র।'

কলমাকান্দার সন্ন্যাসীপাড়া গ্রামের অশীতিপর ক্লেমেন দারিং বলেন, 'লেঙামদের সঙ্গে খাসিদের ভাষার কিছু মিল আছে। তবে বহু বছর ধরে নিয়মিত মেঘালয়ের খাসি হিলসের রেডিও শুনে শুনেও ভাষাটা পুরোপুরি বুঝতে পারি না আমি। খাসি এবং মান্দিরাও আমাদের ভাষা বোঝে না।' বরুয়াকোনা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ক্লেমেন দারিং বলেন, 'ছোটবেলায় দেখেছি মান্দি কিংবা খাসি বিয়ে করার অপরাধে সমাজ থেকে লেঙাম ছেলেমেয়েদের বের করে দেওয়া হতো। মান্দিরা আমাদের মেগাম, মেগান বলে ডাকে।'

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের 'আমার বাংলা' বইয়ের 'গারো পাহাড়ের নীচে' অধ্যায়ে মার্গান বলে একটি জাতির উল্লেখ আছে। ১৯৫২ সালে প্রকাশিত বইটির ওই অধ্যায়ে বলা হয়েছে, গারো পাহাড়ের পাদদেশে 'হাজং-গারো-কোচ-বানাই-ডালু-মার্গান জাতির পাহাড়ি মানুষেরা' বাস করে। মান্দি তরুণ গুঞ্জন রেমার কাছে মার্গান কারা জানতে চাওয়া হলে বোঝা গেল শব্দটি তিনি বুঝতেই পারছেন না। পাল্টা জানতে চাইলেন, মেগামদের কথা বলা হচ্ছে কিনা। তারপর নিজেই বললেন, 'আমরা মান্দিরা লেঙামদের মেগাম, মিগাম, মেগান ইত্যাদি বলে ডাকি।' মেগানকে সুভাষ মুখোপাধ্যায় মার্গান লিখেছিলেন কিনা এমন প্রশ্নে সংশয় জানালেন গুঞ্জন। তবে তিনি মনে করিয়ে দিলেন, কোচদের মধ্যে মার্গান বলে একটি গোত্র রয়েছে। বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ (বারসিক) নামে একটি উন্নয়ন সংস্থার কর্মসূচি সংগঠক এই তরুণই সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন লেঙামদের গ্রাম নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার সন্ন্যাসীপাড়া ও পাঁচগাঁওয়ে। কলমাকান্দায় ১২টি এবং তাহিরপুরে একটি গ্রামে লেঙামদের পাওয়া যায়। গারো পাহাড়ের পাদদেশের পাঁচগাঁও গ্রামটিতে বিয়ে হয়েছে তার স্ত্রীর বড় বোন বাসনা জেংচামের। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার ঘোষবেড় গ্রামের বাসনা লেঙাম বাড়িতে বউ হয়ে এসে ভাষা নিয়ে গভীর সংকটে পড়েছিলেন বলে জানালেন।

বাসনাদের বাড়িতে বসেই আলাপ হলো সন্ন্যাসীপাড়ার প্রবীণ ব্যক্তি লুয়ের নংমিন ও পাঁচগাঁওয়ের সদ্য স্নাতকোত্তর রোজমেরী কুবির সঙ্গে। বয়সে তরুণ রোজমেরী লেঙাম ভাষায় বাইবেল অনুবাদের কাজে যুক্ত হয়েছেন। প্রবীণ লুয়ের অনুবাদ কাজটির উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন। লুয়ের নংমিন বলেন, 'নতুন প্রজন্ম আমাদের ভাষাটা ভুলতে বসেছে। মেঘালয় এলাকার খাসিদের ভাষার সঙ্গে লেঙাম ভাষার মিল পাওয়া যায়। বাংলাদেশের লেঙামদের ভাষায় অনেক মান্দি ও বাংলা শব্দ ঢুকে পড়েছে। ব্যবহারিক জীবনে কাজে লাগে না বলেও অনেক শব্দ হারিয়ে গেছে। যেমন, ইনসিয়েম বললে অনেক লেঙাম বাচ্চাকাচ্চা কিছুই বুঝতে পারবে না। জুম পাহারার জন্য যে ঘর বানানো হতো লেঙাম ভাষায় তাই ইনসিয়েম। জুমচাষ বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শব্দটির মৃত্যু ঘটেছে।'

লুয়ের নংমিন আশা করছেন বাইবেলের অনুবাদের মধ্য দিয়ে ভাষাটি বেঁচে থাকবে। লেঙাম ভাষায় অনূদিত বাইবেলটি লেখা হচ্ছে বাংলা বর্ণমালায়। অবশ্য এরই মধ্যে কলমাকান্দার মনগড়া গ্রামের সুরেশ নংমিন অক্ষরহীনতার কারণে যেন তাদের ভাষার মৃত্যু না হয় সেই জন্য ৩১টি অক্ষর বানিয়ে একটি বর্ণমালার প্রস্তাব হাজির করেছেন। গির্জাভিত্তিক পাঠশালার অবসরপ্রাপ্ত এই শিক্ষক লেঙাম শিশুদের এই বর্ণমালা শেখাচ্ছেন। সুরেশ মনে করেন, শুধু ভাষা জরিপে নয়, নৃগোষ্ঠীর তালিকায় লেঙামদের স্বীকৃতি মিলবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সৌরভ সিকদার বলেন, 'লিঙ্গাম ভাষাটির কথা মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের ভাষা জরিপে আছে। তবে মান্দি ও খাসিদের সঙ্গে এই ভাষাটির মিল-অমিল নিয়ে তেমন কোনো গবেষণা নেই।'

'নৃভাষা বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা' নামক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের ভাষা জরিপে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন অধ্যাপক সৌরভ সিকদার। জরিপে উল্লেখিত ৪০টি ভাষার একটি লেঙামকে 'লিঙ্গাম' বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাণ-প্রকৃতি গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, 'লেঙামরা স্থানীয় এলাকায় আপন পরিচয়ের সংকটে আছে বহুকাল ধরে। লিঙ্গাম, লিঙাম, লেঙাম, লিংগ্যাম, লেঙ্গাম এই সব উচ্চারণের ভেতর লেঙামদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে আমার কাছে লেঙাম শব্দটিই তাদের নিজেদের উচ্চারণের কাছাকাছি মনে হয়েছে। লেঙামদের হয়তো পুস্তকি গবেষকরা মঙ্গোলয়েড মহাজাতির অংশ হিসেবে হাজির করবেন। কেননা, রাষ্ট্রের এযাবৎকালের কোনো দলিল দস্তাবেজ, আদমশুমারিতে লেঙামদের অস্তিত্ব নেই। ভোটার তালিকা ঠিক রাখার জন্য কোটি কোটি মানুষের রাষ্ট্র থেকে হাজার পাঁচেক লেঙাম উধাও হয়ে গেলেও কেউ বিচলিত হবেন না।'