পড়ালেখার পাশাপাশি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন ২২ বছরের শান্তা। সম্প্রতি কাজের সময় খুব ক্লান্ত বোধ করেন। কিছু দিন আগে প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া, অস্বস্তি ও তলপেটে ব্যথায় ভুগছিলেন শান্তা। পরে চিকিৎসক একাধিক পরীক্ষা করে জানান, ঋতুস্রাবের সময় পরিচ্ছন্নতায় গাফিলতির কারণে তার জরায়ুমুখের ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরপর চিকিৎসায় অনেকটা সুস্থ হলেও ক্লান্তি বোধ আর যায়নি। শান্তা জানান, মাসিক শুরুর কয়েক বছর তিনি কাপড় ব্যবহার করেছেন। ব্যবহূত সেই কাপড় কোনো রকম পরিস্কার করলেও ঘরের মধ্যেই রেখে দিতেন। এক কাপড় বেশ কয়েকবার ব্যবহার করতেন। অনেকটা অবহেলায় মাসিকের দিনগুলো পার করতেন তিনি।

শুধু শান্তা নন, দেশের নারীদের বড় অংশই ঋতুস্রাবের সময়টি এভাবে অবহেলায় পার করেন। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও দেশের অধিকাংশ পরিবারে এখনও মেয়েদের মাসিকের প্রথম দিন শুরু হয় পুরোনো কাপড় ব্যবহারের মধ্য দিয়ে।

ন্যাশনাল হাইজিন সার্ভের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশের ৮৬ ভাগ কিশোরী এখনও মাসিকের সময় পুরোনো কাপড় বা ন্যাকড়া ব্যবহার করে। তাদের মধ্যে মাত্র ১১ ভাগ মেয়ে সঠিক নিয়ম মেনে কাপড় ব্যবহার করে। বাকিরা ঘরের কোনায় কাপড় রাখে, যা সম্পূর্ণভাবে জীবাণুমুক্ত করার আগেই পুনরায় ব্যবহার করে। এ ছাড়া ১০ ভাগ স্কুলপড়ূয়া কিশোরী তাদের মাসিকের সময় স্যানিটারি ন্যাপকিন বা প্যাড ব্যবহার করে। প্রাপ্তবয়স্ক নারী, যারা গৃহে থাকেন তাদের মধ্যে স্যানিটারি প্যাড ব্যবহারের প্রবণতা মাত্র ১২ ভাগ। মাসিক সংক্রান্ত কুসংস্কারের কারণে অনেক নারী ও কিশোরী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। ফার্মেসিতে যেতে লজ্জা পাওয়া, পরিবারের অসহযোগিতা ও স্যানিটারি প্যাডের উচ্চমূল্যের কারণে প্রায় ৯০ ভাগ স্কুলপড়ূয়া কিশোরীর মধ্যে মাসিক সুরক্ষা পণ্য ব্যবহারে অনীহা দেখা গেছে।

এমন পরিস্থিতিতেই বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব মাসিক স্বাস্থ্য দিবস। মাসিক সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানানো এবং এ সময় পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সংগঠন নানা আয়োজন করেছে। এ বছর দিবসটির স্লোগান- '২০৩০ সালের মধ্যে এমন একটি বিশ্ব, যেখানে কোনো নারী ঋতুস্রাবের কারণে বাধাপ্রাপ্ত হবেন না।' ২০১৩ সালে মাসিক স্বাস্থ্য দিবস উদযাপনের প্রথম উদ্যোগ নিয়েছিল ওয়াশ ইউনাইটেড। পরের বছর থেকে সারাবিশ্বে ২৮ মে দিবসটি পালন করা হচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম কাজল বলেন, দেশে প্রতি বছর ১৩ হাজার নারীর মৃত্যু হয় জরায়ুমুখের ক্যান্সারের কারণে। মাসিকের সময় অপরিস্কার কাপড় ব্যবহারের ফলে নারীদের জরায়ুমুখের ক্যান্সার, ইনফেকশন, যৌনাঙ্গে ঘা, চুলকানি ও অস্বাভাবিক সাদাস্রাবের মতো শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেই পর্যাপ্ত পানি, শৌচাগারের ব্যবস্থা

মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করে এমন একাধিক সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাসিকবান্ধব শৌচাগার, পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) সুবিধা নেই বললেই চলে। একই সঙ্গে এর জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট এবং সুবিধা নিশ্চিতে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনাও নেই। বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জন করতে হলে মাসিক ব্যবস্থাপনার চিহ্নিত সমস্যাগুলোর সমাধান করতে সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি। কারণ এর সঙ্গে এসডিজির সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ, মানসম্মত শিক্ষা, জেন্ডার সমতা, নিরাপদ পানি ও পয়ঃনিস্কাশন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং পরিমিত ভোগ ও উৎপাদনের মতো লক্ষ্য সম্পৃক্ত।

স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারে অজ্ঞতায়ও বাঁধে অসুখ

সঠিক পদ্ধতি না জানায় পরিস্কার কাপড় বা স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের পরও অনেক নারী বিভিন্ন চর্ম রোগে ভোগেন। এর কারণ নির্দিষ্ট সময় পর পর প্যাড পরবর্তন না করা। ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও উন্নয়ন কর্মী নাহিদ আখতার দীপা বলেন, বেশিরভাগ স্যানিটারি প্যাড যে প্লাস্টিকে তৈরি হয়, তা বিপিএযুক্ত এবং রয়েছে সিনথেটিক লাইনিং। এটি মাসিকের আর্দ্রতাকে কাজে লাগিয়ে ব্যাকটেরিয়া ও ইস্ট তৈরির প্রজননক্ষেত্র তৈরি করে। আর্দ্র পরিবেশ যে কোনো জীবাণুকে দ্রুত বংশবিস্তারে সাহায্য করে এবং যোনিতে সংক্রমণ ঘটায়। এ ছাড়া প্যাডে জমা হওয়া রক্তের গন্ধ দূর করতে নির্মাতা কোম্পানিগুলো এক ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করে, যা ত্বকের জন্য ক্ষতিকর।