চট্টগ্রাম নগরের প্রধান সড়কের ওপরে নির্মাণ করা হচ্ছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। এই এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে নগরের কেন্দ্র থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত টানেল হয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও পর্যটন নগরী কক্সবাজারে যাতায়াত সহজ হবে। কমবে সময়ও। তবে চট্টগ্রামের দীর্ঘতম এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করতে গুনতে হবে টাকা। এ জন্য ১২টি টোল প্লাজা নির্মাণ করা হবে। তবে টোল হার এখনও নির্ধারণ হয়নি। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠানামার জন্য র‌্যাম্প ও লুপ থাকবে ১৬টি। ফলে স্বল্প দূরত্বের গন্তব্যও রয়েছে কমপক্ষে আটটি। টোল আদায় করা হলে স্বল্প দূরত্বের এসব গন্তব্যের যানবাহন এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহারে উৎসাহী হবে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ছাড়া টোল আদায় করা হলে যানজট নিরসনের যে উদ্দেশ্যে হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে, সেটিও সফল হবে না বলে মনে করেন তাঁরা। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের একাংশ যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্নিষ্টরা।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মাহমুদ ওমর ইমাম বলেন, টোল দিয়ে স্বল্প দূরত্বের যানবাহন এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করবে না। এ কারণে একদিকে এতগুলো টোল প্লাজা নির্মাণ ব্যয় অপচয় হবে, অন্যদিকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ ব্যয় বাড়িয়ে ১৬টি ওঠানামার যে র‌্যাম্প ও লুপ তৈরি করা হবে, সেগুলোও অকার্যকর হবে। এ ছাড়া যানজট নিরসনের যে উদ্দেশ্যে এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে, তা সফল হবে না। নিচে যানজট থেকে যাবে। তখন পুরো এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে হয়তো বিমানবন্দরগামী কয়েক শতাংশ গাড়ি চলাচল করবে। এতে কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পুরো টাকাই জলে যাবে।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের ২ আগস্ট চট্টগ্রাম শহরের লালখানবাজার থেকে শাহ আমানত বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্প একনেকে অনুমোদন হয়। তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ২৫০ কোটি ৮৩ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। গত বছরের নভেম্বরে প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা সিডিএ ১ হাজার ৫১৩ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে ৪ হাজার ৭৬৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেন মন্ত্রণালয়ে। এক লাফে দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর যৌক্তিকতা নিরূপণে একজন অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে কমিটি গঠন করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। কমিটি ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে প্রকল্প ব্যয় ৪ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা প্রস্তাব করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে।

প্রস্তাবিত বর্ধিত ব্যয় অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে টোল আদায়ের জন্য ১২টি টোল প্লাজা স্থাপনে ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠানামার জন্য ১৬টি র‌্যাম্প ও লুপ থাকবে। এসব ওঠানামার মুখে টোল প্লাজাগুলো স্থাপন করা হবে।

প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাবিত বর্ধিত ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিরূপণে টোল প্লাজা স্থাপন নিয়ে বলা হয়, প্রকল্পটি অনুমোদনের পর পরিকল্পনা বিভাগের একনেক শাখা চিঠি দেয়। এর ৪ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছিল, 'এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েটিতে প্রিপেইড টোল আদায়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং তা প্রকল্পের ডিপিপিতে উল্লেখ থাকতে হবে।' একনেক সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতিসহ ১২টি প্রিপেইড টোল প্লাজা সংশোধিত ডিপিপিতে সংযুক্ত করা হয়েছে।

প্রকল্পটির পরিচালক ও সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান সমকালকে বলেন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েটি নির্মাণের পর বিদ্যুৎ বিলসহ রক্ষণাবেক্ষণে প্রতি মাসে কমপক্ষে ২০ লাখ টাকা খরচ হবে। টোল আদায় করা না হলে এ টাকা কোথা থেকে আসবে। এ জন্য প্রকল্প অনুমোদনের সময় একনেক সভায় টোল আদায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে এখনও টোল হার নির্ধারণ হয়নি। নির্মাণকাজ শেষ করে পুরোপুরি চালুর আগে কীভাবে, কার মাধ্যমে, কত টাকা টোল আদায় করা হবে, তা নির্ধারণ করা হবে।

ডিসেম্বরে একাংশ খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত : লালখানবাজার থেকে পতেঙ্গা সৈকত পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার নির্মাণাধীন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছিল ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত। পরে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। এখন ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এরই মধ্যে প্রকল্পটির কাজ ৬০ শতাংশ শেষ হয়েছে বলে দাবি করেছেন প্রকল্প সংশ্নিষ্টরা। তবে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের একাংশ যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিডিএ।

প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান বলেন, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বঙ্গবন্ধু টানেল যানবাহন চলাচলের জন্য চালু হলে পতেঙ্গা সমুদ্রপাড়ে নির্মিত আউটার রিংরোডের ওপর যানবাহনের চাপ বাড়বে। যানবাহন চলাচল নির্বিঘ্ন করতে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পতেঙ্গা থেকে নিমতলা পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার অংশ খুলে দেওয়া হবে। এই অংশের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এতে করে যানবাহনের একটি অংশ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে পোর্ট কানেকটিং সড়ক ব্যবহার করে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কে যাতায়াত করতে পারবে।