বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান ড. এম মোশাররফ হোসেনের স্বার্থসংশ্নিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ১৮ ব্যাংক হিসাবে ৪০ কোটি ৮১ লাখ টাকা জমার তথ্য মিলেছে। ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত চার বছরে এ পরিমাণ টাকা জমা হয় বলে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে নজরদারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তদন্তে বেরিয়ে এসেছে।

এ সংক্রান্ত গোয়েন্দা প্রতিবেদন গত ১৪ অক্টোবর দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়। একই সঙ্গে এ বিষয়ে মানি লন্ডারিং আইনের আওতায় তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিতেও অনুরোধ জানিয়েছিল বিএফআইইউ। গত বৃহস্পতিবার আইডিআরএর চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে করা এক রিট মামলায় নির্দেশ পেয়ে বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কাজি মো. এজহারুল হক আকন্দের দ্বৈত বেঞ্চে বিএফআইইউ প্রতিবেদনটি জমা দেওয়া হয়। বীমার নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ পদে থেকে বীমার শেয়ার কেনাসহ অবৈধ কর্মকাণ্ডের দায়ে সংশ্নিষ্ট সব সরকারি দপ্তরে অভিযোগ জানিয়ে প্রতিকার না পেয়ে আবু সালেহ মো. আমীন মেহেদি নামে এক ব্যক্তি হাইকোর্টে রিট করেছিলেন। ওই রিট আমলে নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়, দুদক এবং বিএফআইইউকে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিতে হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন।

বৃহস্পতিবার বিএফআইইউ প্রতিবেদন জমা দিলে অর্থ মন্ত্রণালয় আরও তিন সপ্তাহ সময় চাইলে আদালত তা অনুমোদন করেন। যদিও সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অর্থ মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটি এরই মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে।

হাইকোর্টে জমা করা প্রতিবেদনে বিএফআইইউ বলেছে, ড. এম মোশাররফ হোসেন ডেলটা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের কাছে ৫০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেছেন মর্মে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিএফআইইউ নিজস্ব ডাটাবেজ অনুসন্ধান করে ড. মোশাররফ ও তার স্বার্থ-সংশ্নিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে ৯টি ব্যাংকে মোট ৩০টি ব্যাংক হিসাব পরিচালনার তথ্য পায়। এর মধ্যে ১৮টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত ৪০ কোটি ৮১ লাখ টাকা জমার তথ্য পাওয়া গেছে। যেসব অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হয়েছে, হাইকোর্টের কাছে তার একটি তালিকাও জমা দিয়েছে বিএফআইইউ।

উল্লেখিত তালিকাসহ হাইকোর্টে দেওয়া প্রতিবেদনে বিএফআইইউ আরও বলেছে, ড. মোশাররফ হোসেনের স্ত্রী জান্নাতুল মাওয়া ২০২০ সালের ৭ ডিসেম্বর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অ্যান্ড কোম্পানির নামে ৫০ লাখ টাকার দুটি এফডিআর হিসাব খুলেছিলেন। এর সঙ্গে ড. মোশাররফের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগের যোগসূত্র থাকতে পারে।

প্রিমিয়ার ব্যাংকের দিলকুশা করপোরেট শাখায় অ্যাকাউন্ট দুটি খোলার সময় জান্নাতুল মাওয়ার অনুকূলে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অ্যান্ড কোম্পানি প্রদত্ত অথরাইজেশনের শর্ত লঙ্ঘন করা হয় এবং অ্যাকাউন্টের লেনদেন বিবরণীতে ২১ দিন পর নগদ জমা দেখানো হয়। এ টাকার উৎস আড়াল করতে শাখা ব্যবস্থাপকসহ সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা সহায়তা বা পরামর্শ দিয়েছেন বলে সন্দেহের অবকাশ আছে।

বিএফআইইউ আরও জানিয়েছে, ড. মোশাররফ ও মাওয়া দম্পতির মালিকানাধীন তিন প্রতিষ্ঠানের লাভস অ্যান্ড লাইভস অরগ্যান্স লিমিটেড (এলএলওএল), গুলশান ভ্যালি এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (জিভিএআইএল) ও কাশফুল ডেভেলপার্স লিমিটেডের (কেডিএল) কর্মচারীদের গ্র্যাচুইটি ও প্রভিডেন্ড ফান্ড পরিচালনার জন্য আলাদা ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়। সব বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. মোশাররফ নিজে, সম্পাদক জান্নাতুল মাওয়া এবং অন্যতম সদস্য ড. মোশাররফের শাশুড়ি লাভলি ইয়াসমিন।

মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানটি তার প্রতিবেদনে বলেছে, ড. মোশাররফের স্বার্থ-সংশ্নিষ্ট কোম্পানিগুলোর নিয়ম অনুযায়ী কর্মচারীদের প্রদেয় বেতনের সাড়ে ৭ শতাংশ প্রতি মাসের শেষে জমা করার বিধান আছে। তবে এ তিন প্রতিষ্ঠানের গ্র্যাচুইটি ও প্রভিডেন্ড ফান্ডের নামে জমা করা ৩২ কোটি ৯১ লাখ টাকার সঙ্গে কোম্পানিগুলোর মোট লেনদেনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ড. মোশাররফ ২০১৮ সালের মে মাসে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষে সদস্য পদে নিয়োগ পান। পরে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পেয়ে এখন পর্যন্ত দায়িত্বে আছেন।

এরই মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে বীমা কোম্পানিগুলোর কাছে ঘুষ দাবির অভিযোগ উঠেছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে বীমা খাতের অন্যতম প্রধান কোম্পানি ডেলটা লাইফের পরিচালনা পর্ষদ প্রথমে দুই কোটি টাকা, পরে ৫০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করার অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেন।

এ বিষয়ে জানতে গতকাল শুক্রবার আইডিআরএর চেয়ারম্যান ড. এম মোশাররফ হোসেনকে কয়েকবার ফোন করা হলেও তাতে তিনি সাড়া দেননি।