পরিবার থেকে শুরু করে সর্বত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ সীমিত। গত দুই বছর করোনা অতিমারিতে গৃহবন্দি থাকায় পুরুষের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে গিয়ে এ সময় অপ্রত্যাশিতভাবে গর্ভধারণ করেছেন অনেক নারী। আবার অনেককে পুরুষের সিদ্ধান্তে 'অনিরাপদ গর্ভপাত' করতে হয়েছে। সেই সঙ্গে করোনা-পরবর্তী গর্ভধারণে বহুমুখী জটিলতার ঝুঁকিতেও রয়েছেন নারীরা। বিষেশজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, করোনায় যাঁদের ফুসফুস, কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিংবা যাঁদের ডায়াবেটিস কিংবা উচ্চ রক্তচাপ হয়েছে বা বেড়ে গেছে এবং সঙ্গে মানসিক সমস্যা দেখা দিয়েছে- সেসব নারী চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গর্ভধারণ করলে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।

এমন এক পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস। দিবসটি উপলক্ষে সরকারিভাবে এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা নানা কর্মসূচি পালন করছে। সারাবিশ্বে আন্তর্জাতিক নারী স্বাস্থ্য দিবস হিসেবে ১৯৮৭ সাল থেকে 'নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস' পালন শুরু
হলেও মাতৃ স্বাস্থ্যের প্রতি গুরুত্ব ও এর কার্যকারিতা অনুধাবন করে ১৯৯৭ সাল থেকে বাংলাদেশে যথাযথভাবে নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস হিসেবে পালন করা শুরু হয়। দিবসটি অবস্ট্রেটিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি) পালন করে আসছে।

জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান-নিপসমের হিসাবে, করোনায় আক্রান্ত ৭৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বা প্রসবের নির্দিষ্ট সময়ের আগেই অপরিণত শিশুর জন্ম দেন। আর ৮৩ শতাংশেরই প্রসব অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে হয়। এ অবস্থাতেই সংস্থাটির আরেক জরিপে জানা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশের বিভিন্ন ইউনিয়ন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাভাবিকভাবে সন্তান প্রসব করেছেন ৫ লাখ ৩৪ হাজার ৪৬০ জন।

অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দিয়েছেন ৪ লাখ ৮২ হাজার ৮৩২ জন নারী। অর্থাৎ ওই বছর সরকারি হিসাবে দেশে ১০ লাখ ১৭ হাজার ২৯২ নারী সন্তান জন্ম দেন। তবে বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা দ্বিগুণ। ২০১৯-২০২০ বছরে সরকারি হাসপাতালগুলোতে স্বাভাবিকভাবে সন্তান জন্ম দেন ৫ লাখ ৬০ হাজার ৭৮১ নারী। সিজারিয়ানের মাধ্যমে জন্ম দেন ৪ লাখ ৯৬ হাজার ১৪ জন। অর্থাৎ, মোট ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৭৯৫ জন প্রসূতি সন্তান জন্ম দেন।

সাধারণ সময়েই নানা রকম শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যান একজন হবু মা। শারীরবৃত্তীয় নানা পরিবর্তন ঘটে এ সময়। যার মধ্যে রক্তচাপও আছে। তবে করোনাকাল থেকে বর্তমান সময়ে নানা রকম জটিলতা দেখা দিচ্ছে অন্তঃসত্ত্বার স্বাস্থ্যে। যাঁরা আগে করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই উচ্চ রক্তচাপ- এ সম্পর্কিত জটিলতা, প্রি-একলামশিয়া ও একলামশিয়া বা খিঁচুনি সমস্যায় ভুগছেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) অবস ও গাইনি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. ফারজানা শারমীন শুভ্রা বলেন, গর্ভধারণের আগে যাঁরা করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে আসছেন। এর মধ্যে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, রক্ত জমাটবাঁধাজনিত জটিলতা দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া অনেকে আবার শ্বাসকষ্টে ভোগেন।

অবস্ট্রেটিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ- ওজিএসবির সাবেক প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক সামিনা চৌধুরী বলেন, করোনায় আক্রান্ত নারী অন্তঃসত্ত্বা হলে তাঁকে শারীরিক ও মানসিক এই দুই প্রকারের চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। করোনায় সাধারণত স্টরয়েড জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা হয়। এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াই উচ্চ রক্তচাপের কারণ। তাই নারীর সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দেওয়া প্রয়োজন। অন্যের সিদ্ধান্তে বা আনএক্সপেক্টেড প্রেগনেন্সিতে অন্তঃসত্ত্বা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকবেন। গর্ভধারণের আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী ও পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।

'সিদ্ধান্ত গ্রহণ' প্রক্রিয়ায় নারীকে প্রাধান্য দেওয়ার দাবি জানিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আইনুন নাহার বলেন, 'আনএক্সপেক্টেড প্রেগনেন্সি'-তে নারীর স্বাস্থ্যঝুঁঁকি বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে মা মৃত্যুবরণও করেন। একই কথা বললেন মেরি স্টোপস বাংলাদেশের অ্যাডভান্স ফ্যামিলি প্ল্যানিং কার্যক্রমের সমন্বয়কারী মনজুন নাহার। তিনি বলেন, দেশে মাতৃমৃত্যুর অন্যতম কারণ রক্তক্ষরণ। কিন্তু করোনাকালে অনিরাপদ গর্ভপাতের কারণে অনেক মা মারা গেছেন। এ ক্ষেত্রে নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষমতা থাকলে এমনটা ঘটত না।