কথায় বলে- 'হাতি বাঁচলেও লাখ টাকা, মরলেও লাখ টাকা'। অর্থাৎ যার বাঁচা-মরা দুটোই লাভ। কিন্তু কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে এই লাভজনক সমীকরণটি নেতিবাচক দিক দেখিয়েছে। গত সপ্তাহে রৌমারী সীমান্তে আচমকা ঢুকে পড়ে অন্তত ৩০ সদস্যবিশিষ্ট এক বিশাল হাতির পাল। গ্রামে ঢুকেই তারা অবাধে খেতে থাকে পাকা ধান। একদিকে পাহাড়ি ঢলে জলমগ্নতা, অন্যদিকে সেই পাকা ধানে হাতির তাণ্ডব নিঃস্ব করে তোলে কৃষকদের। কেউ কেউ কষ্টার্জিত ফসলের এ দুরবস্থা দেখে ধানের গোছা জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন। শুধু ধান নয়; প্রতি বছর হাতির পাল আখ, ভুট্টা, গমসহ অনেক ফসল নষ্ট করে। ভেঙে ফেলে ঘর-বাড়ি, সেচ পাম্প, গাছ-গাছালি। কৃষক তখন কাঁদেন।

২০১৬ সালের ২৮ জুন ভারতের আসামের শিশুমারা পাহাড়ি এলাকা থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ হয়ে একটি বন্য হাতি রৌমারীতে ঢুকে পড়ে। সেটি রৌমারী, রাজিবপুর ও চিলমারী চরাঞ্চলে সপ্তাহখানেক অবস্থানের পর চলে যায় যমুনায়। হাতিটি শত শত মাইল ক্লান্তিহীন যাত্রা শেষে আবার জামালপুরের সরিষাবাড়ীর কাছাকাছি এলে বন বিভাগের কর্মকর্তারা হাতিকে বাগে আনতে চেষ্টা করেন। কিন্তু ভেটেরিনারি চিকিৎসকদের অনভিজ্ঞতার কারণে মৃত্যুর মুখে নিপতিত হয় সেটি। হাতির এ দীর্ঘ পথ-পরিক্রমার খবর বেশকিছু পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল সে সময় ফলাও করে প্রতিবেদন করলে রৌমারী অঞ্চলের শত শত মানুষ হাতিটিকে দেখতে যান। তাঁরা হাতিটির মৃত্যুযন্ত্রণা স্বচক্ষে অবলোকন করেন এবং অজান্তেই ঝরে পড়ে দু'ফোঁটা চোখের জল। সেদিন হাতির মৃত্যু দেখে যাঁরা কেঁদেছিলেন সবাই কৃষক।

একটি বেসরকারি সংস্থার তথ্যমতে, ১৯৯৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত বন্যহাতির আক্রমণে রৌমারী-রাজিবপুর লাগোয়া শেরপুরের শ্রীবরদী, নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতী সীমান্তে প্রায় ৯০ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন শতাধিক ব্যক্তি। অন্যদিকে জনরোষে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৩০টি বন্যহাতির।

২০১০ সালে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের একটি সমীক্ষা মতে, ভারতবর্ষে হাতি হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনক। এখানে বছরে প্রায় ১০০ হাতি মেরে ফেলা হয়। হাতির আক্রমণে মানুষ মারা যায় চার শতাধিক। দক্ষিণাঞ্চলের চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, নাইক্ষ্যংছড়িসহ সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ি অঞ্চলে হাতি হত্যার ঘটনা নেহাত কম নয়। গত দুই দশকে ইলেকট্রিক শক, খাদ্যের সঙ্গে বিষ প্রয়োগ, গুলি করে হত্যাসহ নানাভাবে মেরে ফেলা হয়েছে ১৮টি হাতি।

লোকালয়ে হাতির বিচরণ ঠেকাতে সরকার 'সুফল' নামে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ৫০২ কোটি টাকা বরাদ্দে প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ১ জুলাই শুরু হয়ে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত চলবে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশের ২৮টি জেলার ৫টি বনাঞ্চল ও ১৬৫টি উপজেলার ৬০০ গ্রামকে এতে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। যুগের পর যুগ 'হাতির সঙ্গে মানুষের যুদ্ধ' যেন আর না ঘটে, সে জন্য বননির্ভর ৪০ হাজার মানুষ থাকবে এর সুবিধাভোগী। তাদের আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলা হবে। প্রায় ৭৭ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে বনায়ন, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল, নির্বিঘ্ন চলাচলে করিডোর উন্নয়ন, বিপন্ন বন্যপ্রাণী (হাতি, শকুন, চামচঠুঁটো বাটান, শার্ক রে, ঘড়িয়াল, ডলফিন ও বাঘ) সংরক্ষণ, বিপন্ন প্রজাতির গাছপালার লাল তালিকাকরণসহ কিছু স্থাপনা নির্মাণে এ প্রকল্প এগিয়ে যাচ্ছে। এতে ১ দশমিক ৫ শতাংশ বনাঞ্চল বর্ধিত হবে বলে তাদের দাবি।

প্রশ্ন হচ্ছে, সুফলের কতটুকু 'সুফল' আসবে? ইতোমধ্যে প্রকল্পটির বিরুদ্ধে তোলা হয়েছে অনিয়মের অভিযোগ। খোদ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি 'সুফল' প্রকল্পের অগ্রগতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। রৌমারীতে একটি আঞ্চলিক প্রবাদ আছে- 'মুই করোম মাঁই মাঁই, মাঁই কয় মোর কাঁইয়ো নাই' (অর্থাৎ আমি যাকে ভরসা করি সে আমাকে এড়িয়ে চলে।)

রৌমারী তথা বাংলাদেশের বনাঞ্চলীয় ও এর পার্শ্ববর্তী অন্তত সোয়া কোটি মানুষ তাকিয়ে আছে 'সুফল' প্রকল্পের দিকে।

রফিকুল সাজু: সংবাদকর্মী