রাজধানীর সদরঘাট থেকে সোনারতরী লঞ্চে যাত্রা শুরু সকাল ৭টা ২০ মিনিটে। চাঁদপুর নদীবন্দরে গিয়ে নামতে নামতে সকাল পৌনে ১১টা। দুপুরে ইলিশের একটি নৌকায় গভীর নদীর পথে রওনা। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই ইলিশের আশায় নৌকাটি পৌঁছে যায় গন্তব্যে। কিন্তু জাল পেতে এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও মেলেনি একটি ইলিশও। আশপাশে দেখা গেল আরও বেশ কয়েকজন জেলেকে। নদী থেকে জাল উঠাচ্ছিলেন জেলে ইমাম হোসেন। ১০ বছর ধরে ইলিশ ধরেই তাঁর জীবন চলছে। গত বৃহস্পতিবার সারাদিন ঘুরে দুটি ছোট ইলিশ পেয়েছেন তিনি। দীর্ঘশ্বাস নিয়ে এ জেলে বললেন, বালু উত্তোলনসহ দূষণ বন্ধ না হলে চাঁদপুর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে রুপালি ইলিশ। শুধু জেলে ইমাম হোসেন নন, এমন আশঙ্কা গবেষকদেরও। তাঁরা বলছেন, যতই প্রকল্প নেওয়া হোক, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন বন্ধ না থাকলে চাঁদপুরের ইলিশের খ্যাতি আর থাকবে না। আশার কথা দীর্ঘদিনের সেই 'বালু সন্ত্রাস' এখন বন্ধ। চাঁদপুরের আশপাশের নদীতে এখন আর নেই কোনো বাল্ক্কহেড বা ড্রেজার। সরকারের এমন সিদ্ধান্তে নতুন করে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে রয়েছে শঙ্কাও। স্থানীয়রা বলছেন, সরকারের সাহসী পদক্ষেপে বালুখেকোরা তল্পিতল্পা গুটিয়ে নিলেও, আবার তৎপরতা শুরু করতে পারে। ইতোমধ্যে অপরিকল্পিতভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন বন্ধে ব্যবস্থা নিতে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দেওয়ায় বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের চাঁদপুর নদী কেন্দ্রের প্রধানকে বদলি করা হয়েছে। প্রভাবশালীদের চাপে এ ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বালু উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে হাইকোর্টে রিটও করেছেন সংশ্নিষ্টরা। ইলিশ বাঁচাতে কঠোর অবস্থানে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন স্থানীয়রা।

যা ছিল সেই চিঠিতে: গত মার্চে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. হারুনর রশিদ জেলা প্রশাসকের কাছে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে ব্যবস্থা নিতে একটি চিঠি দেন। ওই চিঠিতে বলা হয়, চাঁদপুরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত মেঘনা নদীতে ড্রেজারের মাধ্যমে গত কয়েক বছর ধরে অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। ফলে ইলিশের বৃহত্তম বিচরণ ক্ষেত্র ও অভয়াশ্রম (ষাটনল থেকে চর আলেকজান্ডার) নষ্টসহ নদীর জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, মেঘনা নদীতে অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলনের কারণে প্রধান প্রজনন মৌসুমে চাঁদপুর অংশে ইলিশের প্রজনন ও বিচরণ সাম্প্রতিক সময়ে মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে শত শত ড্রেজারের প্রপেলারের আঘাতে, নির্গত পোড়া মবিল ও তেলের কারণে মাছের প্রধান প্রাকৃতিক খাদ্য নদীর প্লাংটন আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। এ ছাড়া বালু উত্তোলনে নদী দূষণসহ নদীর গঠন প্রক্রিয়া পাল্টে যাওয়ার ফলে বাসস্থানের বাস্তুতন্ত্রও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলের এ ধরনের পরিবর্তনের ফলে তাদের আবাসস্থল যেমন ধ্বংস হচ্ছে, তেমনি ইলিশসহ অন্যান্য মাছের খাদ্যের উৎস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে মাছের বিচরণ ও প্রজনন পাল্টে যাওয়াসহ ইলিশের উৎপাদন মেঘনা নদীতে ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। এ অবস্থায় জাতীয় মাছ ইলিশকে রক্ষা এবং ইলিশের আবাসস্থল নিরাপদ করতে প্রধান প্রজনন ও বিচরণ মৌসুমে মেঘনা নদীতে বালু উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধসহ ড্রেজারগুলো স্থায়ীভাবে উচ্ছেদ করতে প্রয়োজনীয় কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চায় মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ও জেলা প্রশাসনসহ সরকারের বিভিন্ন বিভাগের তৎপরতায় অবশেষে ৭০০ বাল্ক্কহেড ও ড্রেজার বন্ধ হয়েছে।

হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী জনস্বার্থে নির্দিষ্ট মৌজা থেকে ডুবোচর কেটে বালু উত্তোলনের অনুমতি আছে। অন্য কোনো জায়গা থেকে বালু উত্তোলন এবং বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়নি। এ কারণে নদী রক্ষা কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী ২১ মার্চ অভিযান চালিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা হয়।

তবুও শঙ্কা:  ড. মো. হারুনর রশিদ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে চাঁদপুর নদী কেন্দ্রে আছেন দেড় বছর ধরে। ৪-৫ মাস ধরে তিনি কেন্দ্র প্রধানের দায়িত্ব পালন করছিলেন। ইলিশ নিয়ে পিএইচডি করলেও গত ১৮ মে হঠাৎ তাঁকে বাগেরহাটে চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্রে বদলির আদেশ আসে। এ আদেশের পরপরই চাঁদপুরের সচেতন মহলে শুরু হয় গুঞ্জন। সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, বালুখেকোদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেওয়ায় মো. হারুনর রশিদকে বদলি করা হয়েছে। এটি প্রভাবশালীদের প্রথম ধাক্কা। আবারও তারা মাথাছাড়া দিয়ে উঠতে পারে। যদিও এ নিয়ে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের কেউ সাংবাদিকদের সঙ্গে মুখ খুলতে চাননি। তবে ড. মো. হারুনর রশিদ বলেন, সরকারি চাকরিতে বদলি স্বাভাবিক বিষয়।

এ দিকে ড. মো. হারুনর রশিদকে বদলির পর থেকে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের চাঁদপুর নদী কেন্দ্রে কর্মকর্তাদের মধ্যে চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকেই বলছেন, ইলিশ বাঁচাতে মো. হারুনর রশিদ সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছেন। কিন্তু তাঁর এমন পরিণতিতে অন্যরা শক্ত অবস্থান নিতে চাইবেন না। এতে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে বালুখেকোরা।

অবশ্য জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী সমকালকে বলেন, ১৯ বছর পর চাঁদপুরের ইলিশের অভয়াশ্রম বালুসন্ত্রাস মুক্ত হলো। এটিই আমাদের কাছে বাস্তবতা। সরকারি চাকরি বদলিযোগ্য। তবে ড. হারুনসহ যে কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা ইলিশ রক্ষায় শক্ত পদক্ষেপ নিয়েছেন, তাঁরা জাতির সার্থক সন্তান। তাঁরা জাতীয় সম্পদ রক্ষায় মেধা, সাহস ও সততার সঙ্গে কাজ করেছেন। তাঁদের অভিনন্দন জানানো উচিত। তিনি বলেন, কেউ এসে আবার এখানে বালু উত্তোলন করতে পারবে না। এটি আমরা হতে দেব না। গত ২৩ মে বালু ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা হাইকোর্টে রিট করেও বিফল হয়েছেন। তাঁদের পেছনে যে শক্তি আছে, সেই শক্তিরও শুভবুদ্ধির উদয় হবে বলে আশা করি।

ড. মো. আনিছুর রহমান দীর্ঘদিন চাঁদপুর নদী কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ছিলেন। বর্তমানে তিনি ময়মনসিংহে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালকের (প্রশাসন ও অর্থ) দায়িত্বে রয়েছেন। দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেন, পরিভ্রমণশীল স্বভাবের ইলিশ মাছ সাগর মোহনা হয়ে মেঘনা দিয়ে পদ্মায় চলাচল করছে। এ জায়গাগুলোয় ইলিশ ডিম ছাড়ে, বাচ্চা লালিত-পালিত হয়। সেখানে বালু উত্তোলনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের ইকো সিস্টেম বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। বর্তমানে বালু উত্তোলন বন্ধ থাকায় নদীতে জেলেরা আবারও কাঙ্ক্ষিত ইলিশ পাবেন।