দীর্ঘদিনের অচলায়তন ভেঙে ২৮ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৯ সালের ১১ মার্চ। এক বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে আড়াই বছর। নতুন করে আর নির্বাচনের কোনো উদ্যোগ নেই। শিক্ষার্থী, ছাত্রনেতাসহ সংশ্নিষ্টদের প্রশ্ন, আবার কবে হবে ডাকসু নির্বাচন?

২০১৯ সালে ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল মূলত আদালতের নির্দেশ প্রতিপালন করতে গিয়ে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন তুলেছেন, নির্বাচনের জন্য কি আরও ২৮ বছর অপেক্ষা করতে হবে? কেবল ডাকসু নয়, অকার্যকর হয়ে রয়েছে 'জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু)', 'রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু)', 'চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু)'সহ দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোর ছাত্র সংসদ। এর সঙ্গে বন্ধ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হল সংসদের নির্বাচনও। ফলে নেতৃত্বের সূতিকাগার বলে পরিচিত ছাত্র সংসদের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়া পুরোপুরি বন্ধ।

বিশ্নেষকরা বলছেন, ছাত্র সংসদ না থাকার কারণে সংগঠনগুলোও পথ হারিয়েছে। ছাত্রদের দাবি-দাওয়াগুলো দিন দিন হয়ে উঠেছে গৌণ। এ সুযোগে ক্যাম্পাসগুলোতে গড়ে উঠেছে পেশিশক্তির রাজনীতি। মাস্তানতন্ত্র ও সন্ত্রাসের ওপর ভর করে চলেছেন অনেক ছাত্রনেতা। ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সহাবস্থানও নেই।

ছাত্র সংসদগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ডাকসু। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে ৬২'র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯'র গণঅভ্যুত্থান, ৭১'র জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম এবং পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশে স্বৈরাচার ও সামরিকতন্ত্রের বিপরীতে দাঁড়িয়ে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছে ডাকসু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের প্রতিনিধিত্বশীল একটি গণতান্ত্রিক সংগঠন ছিল এই ডাকসু। কিন্তু গণতান্ত্রিক শাসনে বিগত তিন দশকে নির্বাচন হয়েছে মাত্র একবার। স্বাধীন বাংলাদেশে গত ৪৭ বছরে এ নির্বাচন হয়েছে মাত্র আটবার।

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি বছর শিক্ষক সমিতির নির্বাচন হয়; তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের নির্বাচন হয়, হয় না শুধু ছাত্র সংসদ নির্বাচন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসনকে নিয়ে 'কটূক্তির' জেরে সংঘর্ষে জড়িয়েছে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল। এর পর থেকেই ক্যাম্পাসে ছাত্র সংগঠনগুলোর সহাবস্থান নিশ্চিতকরণে ডাকসুর প্রয়োজনীয়তা আবারও আলোচনায় এসেছে। ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে গত মঙ্গলবার উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানকে স্মারকলিপি দিয়েছেন ছাত্র অধিকার পরিষদের নেতৃবৃন্দ। অন্যদিকে, ডাকসু নির্বাচনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পক্ষে মত দিয়েছে সব ছাত্র সংগঠন। নির্বাচন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গড়িমসি করছে বলে অভিযোগ সংগঠনগুলোর। তাদের মতে, প্রশাসনের সদিচ্ছা থাকলে দ্রুত ডাকসু নির্বাচন দেওয়া সম্ভব।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক জানান, ডাকসু নির্বাচনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন সাবেক ডাকসু এজিএস এবং বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন। তিনি বলেন, ছাত্রলীগের গণতান্ত্রিক অবস্থানের কারণেই তিন দশকের অচলায়তন ভেঙে প্রশাসন ডাকসু নির্বাচন দিয়েছিল। আমরা সবসময়ই চাই এই নির্বাচন একটি 'ক্যালেন্ডার ইভেন্ট' হিসেবে অনুষ্ঠিত হোক। এ নির্বাচন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অংশ এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার। ডাকসু শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখে।
অবিলম্বে ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সদস্য সচিব আমান উল্লাহ আমান। তিনি বলেন, আমরা বরাবরই ডাকসুর পক্ষে। ডাকসু নিয়ে একাধিকবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছি। পরিবেশ পরিষদের সভায়ও এ বিষয়ে দাবি উত্থাপন করেছি। নির্বাচন হলে শুধু ছাত্র সংগঠনগুলোর উপকার হবে তা নয়, সাধারণ শিক্ষার্থীদেরও উপকার হবে। ডাকসু হলে ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ বজায় থাকবে এবং মেধাবী যোগ্য নেতৃত্বও বেরিয়ে আসবে। আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অতি দ্রুত যেন ডাকসুর তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচনের আয়োজন করে।

প্রশাসনের সদিচ্ছা থাকলে অতি দ্রুত ডাকসু নির্বাচন হওয়া সম্ভব বলে মনে করেন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ। তিনি বলেন, প্রশাসনের সদিচ্ছা থাকলে ডাকসু নির্বাচন দেওয়া খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্ভব। কিন্তু গত প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পর যে ডাকসু গঠিত হয়েছিল, তাতে শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া পূরণ হয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান সমকালকে বলেন, ঠিক সময় বুঝে ডাকসু নির্বাচন দেওয়া হবে।

জাকসু বন্ধ ৩০ বছর : জাবি প্রতিনিধি জানান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচন গত তিন দশক বন্ধ। নির্বাচন না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটে কোনো ছাত্র প্রতিনিধিও নেই। ফলে নিজেদের অধিকার ও দাবি আদায় করতে পারছেন না শিক্ষার্থীরা। তাদের নেই কোনো প্ল্যাটফর্ম। যে কোনো দাবিতে নামতে হয় রাস্তায়। দ্রুত সময়ের মধ্যে জাকসু নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের নেতারা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৫০ বছরে মাত্র ৯ বার জাকসু নির্বাচন হয়েছে। যেখানে প্রতি বছর নির্বাচন হওয়ার কথা, সেখানে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে অচল জাকসু। ১৯৯২ সালে শেষবারের মতো জাকসু নির্বাচন হয়। এতে ভিপি-জিএস ছিলেন মাসুদ হাসান তালুকদার ও সামসুল তাবরীজ মিঠু। কিন্তু ১৯৯৩ সালের ২৯ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ক্লাবে ছাত্র সংঘর্ষের কারণে জাকসু ও হল সংসদ বাতিল করে দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এর পর গত ৩০ বছরে বিভিন্ন সময় আলোচনায় থাকলেও আলোর মুখ দেখেনি জাকসু নির্বাচন।
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি আকতারুজ্জামান সোহেল বলেন, জাকসু শিক্ষার্থীদের অধিকার। দীর্ঘদিন ধরে এ অধিকার থেকে শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছে। আমরা ছাত্রলীগ থেকে নতুন উপাচার্যকে জাকসু নির্বাচনের বিষয়ে জানিয়েছি। আমরা সব সংগঠনের সঙ্গে বসব, যাতে সব সংগঠন একটি প্ল্যাটফর্মে এসে জাকসু নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম সৈকত বলেন, জাকসু শিক্ষার্থীদের অধিকার। যেহেতু আমরা ছাত্রদল শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে কাজ করি, সেহেতু এই দাবি আদায়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করতেও আমরা প্রস্তুত। আমরা ক্ষমতাসীনদের মতো শুধু মুখে নয়, বাস্তবেও জাকসু নির্বাচন চাই। কিন্তু বিষয় হচ্ছে আমরা মুখে ফেনা তুললেও নির্বাচন হবে না, যদি প্রশাসনের সদিচ্ছা না থাকে। ছাত্র ইউনিয়ন বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সভাপতি রাকিবুল রনি বলেন, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ঘোরতর অনীহা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। কেননা, তারা জানেন যে, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চেয়ে শিক্ষার্থীদের আজ্ঞাবহ রাখা অনেক বেশি কঠিন। জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি সৌমিক বাগচী বলেন, সাংস্কৃতিক জোট ২০১৮ সাল থেকেই একক ও যৌথভাবে ক্রমাগত এই দাবি পেশ করে এসেছে। বাস্তবতা হলো এই যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সংকটে শিক্ষার্থীদের এই দাবি বরাবরই নানা কারণে উপেক্ষিত হয়েছে প্রশাসনের সদিচ্ছার অভাবে।

জানা গেছে, দীর্ঘদিন জাকসু না থাকলেও সচল রয়েছে এ খাতের আয়। প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ও চূড়ান্ত পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ছাত্র সংসদ ও হল সংসদের ফি আদায় করা হচ্ছে। সর্বশেষ ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তির সময় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ফি বাবদ ১৫ টাকা ও হল ছাত্র সংসদ ফি বাবদ ১৫ টাকা করে মোট ৩০ টাকা নেওয়া হয়। এসব টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন খাতে ব্যয় করা হচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর দিতে পারেননি সংশ্নিষ্টরা।

উপাচার্য অধ্যাপক নুরুল আলম বলেন, জাকসু হোক আমিও চাই। এতে আমাদের প্রশাসনিক কোনো বাধা নেই। আমাদের একটু সময় দিতে হবে। আমরাও চাই শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের এই ইচ্ছা বাস্তবে রূপান্তর হোক। তবে এ ক্ষেত্রে ওপর মহলের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তারপর জাকসু নিয়ে আগাতে হবে।

রাকসু অচল ৩২ বছর : রাবি প্রতিনিধি জানান, সবশেষ ১৯৮৯-৯০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে ভিপি নির্বাচিত হন ছাত্রদলের প্যানেল থেকে রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। আর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) নির্বাচিত হন জাসদ ছাত্রলীগের রুহুল কুদ্দুস বাবু। এরপর আর রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ২০১৯ সালে শিক্ষার্থী ও ছাত্র সংগঠনগুলোর চাপে রাকসু নির্বাচনের উদ্যোগ নেয় তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। লোক দেখানো ওই উদ্যোগের নামে সময়ক্ষেপণ করা হয়। ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনার জন্য গঠন করা হয় রাকসু সংলাপ কমিটি। কমিটি ছাত্র সংগঠনগুলোর কাছ থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী সংগঠনগুলোর কাছ থেকে সংখ্যা সংগ্রহ করে। সংলাপের নামে সে সময় প্রশাসন কয়েক মাস সময় নেয়। পরে দেশে করোনা সংক্রমণ শুরু হলে সব আন্দোলন বন্ধ হয়ে যায়।
রাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনু বলেন, এতদিন রাকসু নির্বাচন না হওয়া দুঃখজনক। আমরা বিভিন্ন সময় রাকসুর দাবিতে উপাচার্যসহ প্রশাসনের ঊধ্বর্তন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। স্মারকলিপি দিয়েছি। রাকসু নির্বাচন করার মতো পরিবেশ ক্যাম্পাসে রয়েছে। দ্রুতই রাকসু নির্বাচনের দাবি জানাই।

ছাত্রদলের আহ্বায়ক সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, প্রশাসন চায় না রাকসু সচল হোক। কারণ রাকসু চালু হলে প্রশাসন ও ছাত্রলীগের একচ্ছত্র ক্ষমতা আর থাকবে না। তাই তারা এটি বন্ধ করে রেখেছে। বন্ধ থাকার ফলে প্রশাসন যা খুশি তা করছে। ছাত্রলীগও একচ্ছত্র ক্ষমতা দেখাচ্ছে। সিট দখল, সিট বাণিজ্য, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের ওপর দমনপীড়ন, সাংবাদিক মারধরের মতো একের পর এক ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের অধিকার নিশ্চিতে রাকসুর বিকল্প নেই।

রাকসু আন্দোলন মঞ্চের আহ্বায়ক আব্দুল মজিদ অন্তর বলেন, শিক্ষার্থীদের মুক্ত চিন্তা প্রকাশে রাকসু অগ্রণী ভূমিকা রাখে। শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক চর্চা, অধিকার সচেতনতা তৈরিতে এর গুরুত্ব অধিক। রাকসু নির্বাচন প্রশাসন বন্ধ করে রেখেছে। ক্ষতি হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের। তারা হলে সিট পাচ্ছে না, নিজেদের দাবিগুলো আদায় করতে পারছে না। ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মহব্বত হোসেন মিলন বলেন, তিন দশক ধরে রাকসু নির্বাচন হয় না। রাকসুর জন্য আন্দোলন করেও রাকসু হচ্ছে না। অথচ এটা প্রশাসনের স্বপ্রণোদিত হয়ে করার কথা ছিল। আমাদের জাতি হিসেবে মেরুদণ্ডহীন করতেই রাজনৈতিক চর্চা বন্ধ করে রেখেছে। ফলে সহাবস্থান নেই ক্যাম্পাসে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সুলতান উল ইসলাম বলেন, ছাত্র সংসদ না থাকলে শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক চর্চা কম হয়, এটা আমরাও জানি। ক্যাম্পাসে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সম্প্রীতি নেই, নির্বাচনের মতো উপযুক্ত পরিবেশও নেই। ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রতি আহ্বান থাকবে, তারা পরিবেশটা ভালো করুক। আমরাও নির্বাচনের আয়োজন করব।

চাকসু স্থবির ৩২ বছর : চবি প্রতিনিধি জানান, ৩২ বছর ধরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকসু স্থবির। সর্বশেষ ১৯৯০ সালে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ গঠন হলেও গত ৩২ বছরে নতুন করে সংসদ গঠন করার উদ্যোগ নেয়নি প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনগুলো এ ব্যাপারে বারবার আন্দোলন ও দাবি জানালেও প্রশাসনের নানা অজুহাতে থেমে আছে চাকসু নির্বাচন। ডাকসু নির্বাচনের পর সর্বশেষ ২০১৯ সালের মার্চ মাসে উদ্যোগ নেওয়া হলেও উপাচার্য পরিবর্তনের পর আর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর প্রথম চাকসু নির্বাচন হয় ১৯৭০ সালে। প্রতি শিক্ষাবর্ষে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ছয়বার নির্বাচন হয়েছে। ১৯৯০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ চাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে সহসভাপতি (ভিপি) হিসেবে নাজিম উদ্দিন এবং সাধারণ সম্পাদক (জিএস) হিসেবে আজিজ উদ্দিন নির্বাচিত হন। ১৯৯০ সালের সেই ছাত্র সংসদ এখনও বাতিল না করায় তারা এখনও বহন করছেন চবির কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের পদবি।

নাজিম উদ্দিন বলেন, চাকসু নির্বাচন হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। ছাত্রদের অধিকার তো ক্ষুণ্ণ হচ্ছেই, পাশাপাশি নতুন নেতা পাচ্ছে না দেশ।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন টিপু বলেন, নির্বাচন না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের অনেক মৌলিক বিষয় নিয়ে কথা বলার সুযোগ নেই। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে বারবার দাবি জানাচ্ছি, শিগগির চাকসু নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হোক।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সেক্রেটারি শহিদুল বলেন, আমরা করোনা পরিস্থিতির আগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টরকে চাকসু নির্বাচনের জন্য স্মারকলিপি দিয়েছিলাম। আমরা আগামী সপ্তাহ থেকে আবার আন্দোলন করব। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি প্রত্যয় নাফাক বলেন, ২০১৯ সালে বেশ জোরালো আন্দোলন হয়েছিল। এরপর আর সম্ভব হয়নি। আসলে প্রশাসন চায় না চাকসু নির্বাচন হোক।

জবির আইনেই নেই ছাত্র সংসদ : কলেজ আমলে ছাত্র সংসদের ১৪টি নির্বাচন হলেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে নেই ছাত্র সংসদ। কিন্তু ছাত্র সংসদের নামে বরাদ্দ আছে কক্ষ। কক্ষ সংস্কার, চেয়ার, টেবিল ও টেলিভিশন কেনার জন্য বরাদ্দও দেওয়া হয়। তবে অবকাশ ভবনের ছাত্র সংসদের কক্ষটি ব্যবহার করে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের আলাদা দুটি চেয়ারও আছে। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কমিটি থাকলে কক্ষটি খুলে দেওয়া হয়। কমিটি না থাকলে কক্ষটি বন্ধ থাকে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা ব্যবহার করতে পারেন না।

জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের আগে জকসুর ১৪টি নির্বাচন হয়েছে। ১৯৫৪ সালে জগন্নাথ কলেজ ছাত্র সংসদের (জকসু) প্রথম নির্বাচন হয়। এর পর স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত ছাত্র সংসদের ১০টি কমিটি নির্বাচিত হয়। স্বাধীনতার পরে ১৯৭২, ১৯৭৯, ১৯৮৬, ১৯৮৭ সালে জকসুর আরও চারটি নির্বাচন হয়। তবে ২০০৫ সালে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইনে ছাত্র সংসদের বিধান যুক্ত করা হয়নি। ২০১৯ সালে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ আইন প্রণয়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. আলী আক্কাসকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের একটি কমিটি করে। কিন্তু তিন বছর পার হয়ে গেলেও ছাত্র সংসদ আইন প্রণয়ন ও নির্বাচন আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো আগ্রহ নেই।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইব্রাহিম ফরাজি বলেন, ছাত্র নেতৃত্ব তৈরি করতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের গুরুত্ব আছে। প্রশাসন চাইলে আইন করবে। কিন্তু আমাদের পক্ষ থেকে নির্বাচন আয়োজনে কোনো ধরনের চাপ নেই। পরিবেশ ও সময় হলে আমরা নির্বাচন আয়োজনে প্রশাসনকে বলব। তবে ছাত্র সংসদের নির্বাচিত কমিটি ছাড়া ছাত্র সংসদের কক্ষ ব্যবহার ও সুবিধা গ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা ছাত্র সংসদের কক্ষটি ব্যবহার করছি।

বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইমদাদুল হক সমকালকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের আইন প্রণয়নে কমিটি গঠন ও কমিটির প্রতিবেদন জমা দিয়েছে কিনা, এ বিষয়ে তার জানা নেই। তিনি যোগদানের পরে এ বিষয়ে তাকেও জানানো হয়নি। ছাত্র সংসদের বিষয়ে তিনি খোঁজ নেবেন। আর ছাত্র সংসদের কক্ষ ও বরাদ্দ ছাত্রলীগকে দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ কক্ষ আর বরাদ্দ তাদের কাছে কীভাবে গেল তাও খতিয়ে দেখা হবে।