চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের মিলিটারি একাডেমির অদূরে মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রেললাইন পার হচ্ছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান নামে এক তরুণ। এ সময় একটি দ্রুতগতির ট্রেনে কাটা পড়ে তাঁর দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। গত ২ জানুয়ারি ঘটে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। এরপর গত ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রাম নগরীর ষোলশহর রেলস্টেশন এলাকায় ট্রেনে কাটা পড়েন অজ্ঞাতপরিচয় এক যুবক। পুলিশ লাশ উদ্ধার করার সময় দেখতে পায়, তাঁর কানে হেডফোন লাগানো।

সমকালের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সম্প্রতি ট্রেনে কাটা পড়ে কিংবা ট্রেনের ধাক্কায় হতাহত বেশিরভাগই তরুণ-যুবক। মূলত রেললাইনে বেপরোয়া চলাফেরার কারণে তাঁদের মৃত্যু ঘটেছে। অবশ্য আরও কয়েকটি কারণে রেললাইনে মানুষ মারা যাচ্ছে। কিছু কিশোর-তরুণ আড্ডা দেওয়ার জন্য রেল সড়ককে বেছে নেয়। অনেকে হাঁটাচলাও করেন রেললাইন দিয়ে। রেললাইনে দাঁড়িয়ে চলন্ত ট্রেনকে সামনে-পেছনে রেখে করা হয় টিকটক ভিডিও। আবার কেউবা কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শোনেন, মোবাইল ফোনে কথা বলেন। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, এমন ঝুঁকি ও অসচেতনতা তাঁদের মৃত্যু ডেকে আনছে। ট্রেনে কাটা পড়ে কিংবা ধাক্কা লেগে নিহতদের মধ্যে কত শতাংশ তরুণ, তার কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই রেলওয়ের কাছে। তবে সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নিহতদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ কিশোর, তরুণ ও যুবক বয়সী।

আবার ট্রেন ছুটে আসতে দেখেও অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের গাড়ি ঝুঁকি নিয়ে রেললাইন পার হতে চায়। তাতে ট্রেনের ধাক্কা খেয়ে গাড়ি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ট্রেনে কাটা পড়ে মানুষ। ধাক্কা লেগেও মারা যান। তবুও পথচারী কিংবা যানবাহন চালকদের মধ্যে কোনো ভয়ডর কাজ করে না।

১৮৬১ সালের রেলওয়ের পুরোনো একটি আইন অনুযায়ী, রেল লাইনের দুই পাশে ২০ ফুটের মধ্যে কারও চলাচল করার সুযোগ নেই। এমনকি গবাদি পশুরও এই সীমারেখার মধ্যে প্রবেশ নিষিদ্ধ। এই সীমানার মধ্যে কাউকে পাওয়া গেলে গ্রেপ্তার করার পাশাপাশি আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিধানও রয়েছে। কিন্তু আইন থাকলেও তার প্রয়োগ নেই। মানুষ ইচ্ছেমতো রেললাইন দিয়ে হাঁটাচলা করছে। ফলে প্রায়ই প্রাণহানি ঘটছে।

রেলওয়ের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে রেললাইনের নিচে কাটা পড়ে কিংবা ধাক্কা খেয়ে যে হারে মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে, অন্য দেশগুলোতে তেমনটা দেখা যায় না। রেলের তথ্যানুযায়ী, শুধু চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৫ মে পর্যন্ত ট্রেনে কাটা পড়ে কিংবা ধাক্কা খেয়ে অন্তত ৩৭৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২০ সালে ৩৯৫ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। ২০২১ সালে প্রাণ হারান ৩২২ জন। ২০১৯ সালে ৯৮০ জন নিহত হন।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজার আবুল কালাম সমকালকে বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে রেললাইন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। দীর্ঘ এই রেললাইন বেড়া দিয়ে রাখার সুযোগ নেই। তাই তাঁরা নানাভাবে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করেন। কিন্তু মানুষ ঝুঁকি আছে জেনেও রেললাইন দিয়ে হাঁটাচলা করে। কেউ যদি নিজেই জীবনের ঝুঁকি নেয়, তাহলে কী করার আছে।

রেলওয়ে পুলিশের ওসি (চট্টগ্রাম) নাজিম উদ্দিন সমকালকে বলেন, রেললাইন দিয়ে হাঁটাচলা কিংবা পারাপার বেআইনি। তাই রেললাইন দিয়ে চলাচলের সময় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে রেলওয়ে দায়ী থাকে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উল্টো রেলওয়েকেই ক্ষতিপূরণ দিতে হয় দায়ী ব্যক্তিদের। তারপরও অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রেললাইন ব্যবহার করায় দুর্ঘটনা ঘটছে।

চট্টগ্রামের মৃত্যুফাঁদ: রেলের যেসব পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ, তার দুটি হচ্ছে চট্টগ্রাম নগরীর দেওয়ানহাট এলাকায়। একটি পয়েন্ট একেবারে দেওয়ানহাট মোড়ে এবং আরেকটি পয়েন্ট দেওয়ানহাট পোস্তারপাড় রেলক্রসিং এলাকা। এ দুটি পয়েন্ট কার্যত মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। আধা কিলোমিটারেরও কম ব্যবধানে এই দুটি পয়েন্টে কিছুদিন পর পরই ট্রেনে কাটা পড়ে কিংবা রেলের ধাক্কায় মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটছে।

চট্টগ্রাম নগরীর দেওয়ানহাট মোড় ও পোস্তারপাড় রেলক্রসিং দিয়ে গেছে চট্টগ্রামের সবচেয়ে ব্যস্ততম রেললাইন। চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন থেকে কয়েক মিনিটের হাঁটাপথের দূরত্বে এ দুটি পয়েন্ট। চট্টগ্রাম স্টেশন থেকে ঢাকা, চাঁদপুর, সিলেটসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব রুটের ট্রেনগুলো এ স্টেশন থেকেই ছেড়ে যায়। তবে দেওয়ানহাট ব্রিজের নিচে রেল ক্রসিংয়ের ওপর দিয়েই মানুষের যাতায়াত। দেওয়ানহাট ব্রিজের নিচে থাকা রেললাইনের ওপর দিয়ে সড়কের এক পাশ থেকে আরেক পাশে যাওয়া যায়। ফলে হাজার হাজার মানুষ ব্রিজ এড়িয়ে রেললাইনের ওপর দিয়ে চলাচল করে।

জনসমাগমের কারণে রেললাইনের ওপরই গড়ে উঠেছে বাজার। গড়ে উঠেছে বস্তিও। আর এর অদূরেই রয়েছে পোস্তারপাড় রেল ক্রসিং। নগরীর ব্যস্ততম সড়কগুলোর একটি হচ্ছে ফুলবাড়িয়া স্টেশন সংলগ্ন এই সড়কটি। দেওয়ানহাট মোড়ের মতো পোস্তারপাড় এলাকা দিয়েও হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করে। ফলে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে।