পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের বুধবারের ভোটেও নিজ দলের বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কাছে ধরাশায়ী হয়েছেন নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ৪২টি ইউপির ফলাফলে চেয়ারম্যান পদে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা ১৯টিতে জয়ী হলেও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন ১২টিতে। এর বাইরে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জিতেছেন পাঁচটিতে।

নির্বাচন বর্জনকারী স্থানীয় বিএনপি নেতারা জিতেছেন চারটি ইউপিতে। এ ছাড়া সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর দল জাতীয় পার্টি (জেপি) ও চরমোনাইর পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জিতেছে একটি করে ইউপির চেয়ারম্যান পদে। এর আগে সাত ধাপে অনুষ্ঠিত চার হাজারেরও বেশি ইউপির ভোটে চেয়ারম্যান পদে প্রায় ২ হাজার স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হন।

বুধবার একই সঙ্গে পাঁচটি পৌরসভার মধ্যে দুটিতে আওয়ামী লীগ, দুটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। তবে গোপালগঞ্জ সদর পৌরসভায় কোনো প্রার্থীকে নৌকা প্রতীক দেওয়া হয়নি। এই পৌরসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচা শেখ রকিব হোসেন বিজয়ী হয়েছেন। এখানে অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা ভোটের আগেই শেখ রকিবকে সমর্থন জানিয়ে একে একে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর দুই সদস্য ফারুক খান এমপি ও আব্দুর রহমানের নির্বাচনী এলাকায়ও নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর পৌরসভায় ৬ হাজার ১৫৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান স্বতন্ত্র প্রার্থী আশরাফুল আলম শিমুল। এ পৌরসভায় পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে আওয়ামী লীগের আতিকুর রহমান মিয়া মাত্র ৬০৪ ভোট পেয়ে পঞ্চম স্থানে রয়েছেন। পৌরসভাটি ফারুক খান এমপির নির্বাচনী এলাকা।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য ও সাবেক এমপি আব্দুর রহমানের নির্বাচনী এলাকা মধুখালী উপজেলার কামালদিয়া ইউপিতেও নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হাবিবুল বাশার পরাজিত হয়েছেন।

সিলেটের বিয়ানীবাজার পৌরসভায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী জিএস ফারুকুল হকের চামচ প্রতীকের কাছে পরাজিত হয়েছেন নৌকা প্রতীকের প্রার্থী। এই পৌরসভায়ও নৌকা প্রতীকের প্রার্থী সদ্য সাবেক মেয়র আব্দুস শাকুর তৃতীয় স্থানে রয়েছেন।

বুধবারের ভোটে একমাত্র উপজেলায় সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। খাগড়াছড়ির গুইমারার এই উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে জয়ী হয়েছেন নৌকার মে মং মারমা।

কুমিল্লা সিটি নির্বাচনের পাশাপাশি বুধবার দেশের বিভিন্ন স্থানে ১৩২টি ইউনিয়ন পরিষদে সাধারণ ও ৪৪টিতে উপনির্বাচন, পাঁচটি পৌরসভা ও একটি উপজেলা পরিষদে সাধারণ এবং তিনটি উপজেলা পরিষদে উপনির্বাচন হয়।

এর আগে দিনভর বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ, জাল ভোট, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ভোট কেনাবেচার অভিযোগ ও ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) ধীরগতিসহ নানা ভোগান্তির মধ্য দিয়ে শেষ হয় স্থানীয় সরকারের শতাধিক নির্বাচন।

এসব নির্বাচনের বেশিরভাগেই ইভিএম মেশিনের পাশাপাশি কিছু স্থানে ব্যালট পেপারে ভোট গ্রহণ করা হয়। যদিও দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ইভিএম নিয়ে এখন চরম মতবিরোধ রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পরে কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের অধীনে এটাই ছিল সবচেয়ে বড় নির্বাচন। একই দিনে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনেরও নির্বাচন হয়। ওই নির্বাচনেও ইভিএম নিয়ে নানা বিড়ম্বনার খবর পাওয়া যায়।

এই ইউপি ভোটের বেশিরভাগ বিদায়ী কমিশন কে এম নূরুল হুদার মেয়াদে অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে ব্যাপক প্রাণহানির কারণে সমালোচনার মুখে পড়ে ইসি। দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১ হাজার ৭৮১টিতে জয়লাভ করেন। নির্বাচন বর্জনকারী দল বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা প্রায় ৭০০ ইউপিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয় পান। ওই ভোটে প্রাণহানির পাশাপাশি ও একক প্রার্থী হিসেবে বিনা ভোটে জয়ী হওয়ার রেকর্ড সৃষ্টি হয়। এবার ৩৬৯ জন চেয়ারম্যান ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হন।

লক্ষ্মীপুরের রামগতির চর আলেকজান্ডার ইউপিতে জাল ভোট ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মীদের ওপর হামলা এবং কেন্দ্রের বাইরে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এই ইউপিতে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেও আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রয়াত আনোয়ার হোসেনের ছেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী শামীম আব্বাছ সুমনের কর্মী-সমর্থকদের দখলে ছিল বেশিরভাগ কেন্দ্র। স্থানীয় প্রশাসনকে অনেকটাই নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে।

মেহেরপুরের একটি পৌরসভা ও চারটি ইউপিতে ভোট নেওয়া হয়। ভোট দিতে আসা লোকজনের প্রধান অভিযোগ ছিল ইভিএমের ধীরগতি। সিলেটের বিয়ানীবাজার পৌরভোটেও ইভিএমে আঙুলের ছাপ না মেলায় ভোট দিতে না পারার অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই ধরনের সমস্যায় পড়েছেন গোপালগঞ্জে দুই পৌরসভার ভোটাররাও।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে দুই ইউপির ভোট গ্রহণে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ, পুলিশের ফাঁকা গুলি, ধাওয়া ও পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে দুই ইউপি সদস্য প্রার্থীসহ ৮ জন আহত হয়েছেন।

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে ভোট গ্রহণ সুষ্ঠু হলেও বিকেলে সিনাবহ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে দুই সাধারণ সদস্য প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ দুই প্রার্থীর সমর্থকদের লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে। এ সময় সমর্থক, ভোটারসহ কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়েছে।

গোপন নেই গোপন কক্ষ: বুধবার বিকেল ৩টা। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর সরল ইউনিয়নের মিনজিরীতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র। এ কেন্দ্রের তিন নম্বর বুথের গোপন কক্ষে ভোটারের সঙ্গে প্রবেশ করেন নৌকার এজেন্ট পাশা মিয়া। নিজের পছন্দ অনুযায়ী ইভিএম মেশিনে বোতামও টিপে দেন তিনি। একই কেন্দ্রের ৭ নম্বর বুথে নারীদের গোপন কক্ষে ভোটাররা কাকে ভোট দিচ্ছেন, তা দেখছেন নৌকার আরেক এজেন্ট শাওন উল্লাহ। উঁকি দিয়ে কোন বোতাম টিপবেন, তা দেখিয়ে দিচ্ছেন তিনি। একই ধরনের অভিযোগ বাহারছড়া ইউনিয়নের পশ্চিম বাঁশখালী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে। এখানেও নৌকার এজেন্টরা ভোটারের সঙ্গে গোপন কক্ষে ঢুকে বোতাম টিপে দিয়েছেন।

বাঁশখালী উপজেলার ১৩ ইউনিয়নের ১২৭টি কেন্দ্রে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া প্রায় সবগুলো কেন্দ্রে সুষ্ঠু ভোট হলেও শুধু ব্যতিক্রম দেখা গেছে এই দুটি কেন্দ্রে। এর মধ্যে সরল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে নৌকা প্রতীক নিয়ে লড়ছেন রশিদ আহমদ চৌধুরী ও বাহারছড়া ইউনিয়নে তাজুল ইসলাম।

কালীপুর ইউনিয়নের নাসেরা খাতুন রাজকুমারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের সাত নম্বর বুথের গোপন কক্ষে উঁকি দিয়ে ভোটারকে সহায়তা করেছেন পোলিং অফিসার সংগীতা দে। এই বুথের সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার খুররুম মোবারক বলেন, 'নারী ভোটাররা ভোট দিতে পারছেন না। তাই পোলিং অফিসার শুধু কোন বোতাম টিপবেন, তা দেখিয়ে দিচ্ছেন।' একই কেন্দ্রের ৬ নম্বর নারী বুথে ভোটারের সঙ্গে পোলিং অফিসার সিরাজুল ইসলামকে ভোট কেন্দ্রে ঢুকতে দেখা গেছে। তিনি বলেন, 'নারী ভোটাররা ইভিএমে ভোট দিতে পারছেন না। তাই তাদের সহযোগিতা করছি।'

গোপন কক্ষে পোলিং অফিসারের প্রবেশ প্রসঙ্গে কেন্দ্রটির প্রিসাইডিং অফিসার জসীম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, 'ভোটাররা ইভিএম সিস্টেমে অভ্যস্ত নয়। তাই কাউকে কাউকে দেখিয়ে দিতে হচ্ছে।'

একই চিত্র দেখা গেছে, সাধনপুর ইউনিয়নের ১২ নম্বর পূর্ব বৈলগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৫ নম্বর বাণীগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ সাধনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে, কালিপুর ইউনিয়নের পূর্বগুনাগরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র ও সরল ইউনিয়নের মিনজিরীতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে।

ইভিএমে ধীরগতি, দীর্ঘ সারি: দুপুর ১২টায় কালিপুর ইউনিয়নের পূর্ব কোকদণ্ডী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় নারী ভোটারদের দীর্ঘ সারি। তাদের কেউ কেউ চার ঘণ্টায়ও ভোট দিতে পারেননি।

কেন্দ্রটির প্রিসাইডিং অফিসার বাবুল দাশগুপ্ত বলেন, 'একজন নারীর ভোট দিতে প্রায় পাঁচ মিনিট লাগছে। তারা বুঝতে পারছেন না। তাই ভোট নিতে দেরি হচ্ছে।'

সাধনপুর ইউনিয়নের ১২ নম্বর পূর্ব বৈলগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের ৭ নম্বর কক্ষে ভোটার রয়েছেন ৩৬৯ জন। সকালে দেড় ঘণ্টায় ভোট গ্রহণ হয়েছে মাত্র ২৯ জনের। এই কেন্দ্রের সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার খলিকা নূর বলেন, 'নারী ভোটাররা বুঝতে পারছেন না। কেউ কেউ বোতামে চাপ না দিয়ে প্রতীকের ওপর চাপ দিচ্ছেন। এ জন্য দেরি হচ্ছে।'

এই কেন্দ্রের ভোটার সবিতা দে বলেন, 'নতুন পদ্ধতিতে ভোট নিচ্ছে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়নি কেন।'

এ ছাড়া সরল ইউনিয়নের মিনজিরীতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সংরক্ষিত ওয়ার্ডের দুই প্রার্থী রাশেদা বেগম ও আবিদা সোলতানার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন আহত হন। পালেগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুই সদস্য প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। ছনুয়া ইউনিয়নের ছেলবন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের পাশে লবণমাঠ থেকে একনলা বন্দুকসহ লাঠিসোটা উদ্ধার করে র‌্যাব। বৈলছড়ি ইউনিয়নের পশ্চিম চেচুরিয়া ঘোনাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশ থেকে দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ।

সোনারগাঁয়ে প্রার্থীসহ আটক ২: নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়া ইউনিয়নের পাঁচপীর দরগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের টিনশেড ভবন কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসার ফখরুল ইসলামের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর জেরে হামলায় অভিযুক্ত সদস্য প্রার্থী আল মাহবুবের লোকজনের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এতে ১০ জন আহত হয়েছেন। ঘটনাস্থল থেকে প্রার্থী মাহবুব ও তার ভাতিজা রাজুকে আটক করেছে পুলিশ।