টানা তিন দিন ধরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর বাড়ির নিচতলায় জমে আছে হাঁটুপানি। পুরো নগরীর অবস্থা বুঝতে এ তথ্যই যথেষ্ট। অথচ ২০১৪ সাল থেকে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে চসিক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তিন দফা সংশোধন করে ২৮৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। এরই মধ্যে ৯১৪ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। বিপরীতে প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ১০ শতাংশও হয়নি। জমি অধিগ্রহণও শেষ করতে পারেনি তারা। এ বিষয়ে চসিকের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, প্রকল্পের অধিকাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে জমি অধিগ্রহণে।
সংশ্নিষ্টরা বলছেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) দুটি এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তিন সংস্থার মোট চার প্রকল্পের ব্যয় ১০ হাজার ৯২১ কোটি টাকা। ইতোমধ্যে ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা। তবুও সুফল মিলছে না। উল্টো জলাবদ্ধতা বেড়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে কচ্ছপগতির কারণেই চট্টগ্রাম ডুবে খবরের শিরোনাম হচ্ছে। সহসা পরিস্থিতি থেকে মুক্তি মিলবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের (আইইবি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, এত বরাদ্দের পরও জলাবদ্ধতা দুর্ভাগ্যজনক। প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে ভালোভাবে সমীক্ষা করলে এ ধরনের সমস্যা হতো না।

অবশ্য প্রকল্পসংশ্নিষ্টরা আশ্বস্ত করছেন, পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে জলাবদ্ধতা থেকে নগরবাসী মুক্তি পাবেন। জলাবদ্ধতা নিরসনে সবচেয়ে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সিডিএ। এই প্রকল্পের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. শাহ আলী বলেন, প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ না হলে সুফল মিলবে না। জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় কিছু খাল প্রশস্ত করা যায়নি। খালের সরু অংশে পানি আটকে উপচে পড়ে রাস্তাঘাট ডুবে যাচ্ছে।

সূত্র জানায়, জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএর দুটির মধ্যে 'চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনর্খনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন' প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। ২০১৭ সালে তিন বছর মেয়াদে ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি অনুমোদন হয়। জুন পর্যন্ত ২ হাজার ২৭০ কোটি টাকা ব্যয় হলেও কাজের অগ্রগতি মাত্র ৬৫ শতাংশ। প্রকল্পের মেয়াদের সঙ্গে আরও ৪ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ২০১৭ সালে সিডিএর 'কর্ণফুলী নদীর তীর বরাবর কালুরঘাট সেতু থেকে চাক্তাই খাল পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ' প্রকল্প অনুমোদন দেয় একনেক। জলাবদ্ধতা নিরসনে ৮ দশমিক ৫৫ কিলোমিটার সড়কসহ বেড়িবাঁধের পাশাপাশি ১২টি খালের মুখে রেগুলেটর ও পাম্প হাউস নির্মাণের কথা ছিল। চলতি মাসেই শেষ হচ্ছে ২ হাজার ৩১০ কোটি টাকার এই প্রকল্পের মেয়াদ। ইতোমধ্যে ব্যয় করা হয়েছে ১ হাজার ৭০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে দুটি প্রকল্পে সিডিএ এখন পর্যন্ত ব্যয় করেছে ৩৩৪০ কোটি টাকা। অথচ খালের দুই পাশে রিটেইনিং ওয়াল, খালের মুখে স্লুইস গেট, ব্রিজ-কালভার্ট, নতুন নালা নির্মাণ এবং খালের ময়লা-আবর্জনা পরিস্কার কাজের কোনোটিই শেষ হয়নি। ১৭টি স্লুইস গেট নির্মাণের কথা থাকলেও তা শেষ হয়নি।

এ ছাড়া ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ৬২০ কোটি টাকা ব্যয়ে 'চট্টগ্রাম মহানগরীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলমগ্নতা/জলাবদ্ধতা নিরসন ও নিস্কাশন উন্নয়ন' প্রকল্প একনেকে অনুমোদন পায়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই প্রকল্পও বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনী। প্রকল্পের আওতায় ২৩টি খালের মুখে রেগুলেটর বসানোর কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত একটিও বসেনি। কর্ণফুলীর তীরে ১৯ কিলোমিটার দীর্ঘ বন্যা প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ নিয়েও রয়েছে আপত্তি। প্রকল্পটিতে ৮৪ কোটি টাকা ব্যয় করার পর এখন সংশোধনের কাজ চলছে। বরাদ্দ সংকটে কাজে ধীরগতি এসেছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্নিষ্টরা।




বিষয় : ডুবছে চট্টগ্রাম প্রকল্পের কচ্ছপগতি

মন্তব্য করুন