যমুনার দুর্গম চরে সকাল ৯টার দিকে প্রসব বেদনা ওঠে হেলেনা খাতুনের। জলচৌকিতে করে বয়ে তাঁকে যখন গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়, তখন দুপুর ১টা। তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে হেলেনাকে পাড়ি দিতে হয়েছে প্রায় ৪০ কিলোমিটার পথ। হাসপাতাল চত্বরে পৌঁছতে পৌঁছতেই প্রাণ চলে যায় তাঁর। একই পরিণতি হয় গর্ভজাত তৃতীয় সন্তানেরও। মর্মান্তিক এ ঘটনা চলতি বছরের ৩০ মার্চের।

প্রসূতি হেলেনা উপজেলার ফুলছড়ি ইউনিয়নের চরকালুরপাড়া গ্রামের সুজা মণ্ডলের স্ত্রী। দিনমজুর স্বামী ও স্বজনরা তাঁর নিথর দেহ ঘোড়ার গাড়িতে করে নিয়ে যান বাড়িতে। যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের চরের হেলেনার মতো হাজার হাজার নারীর জীবনে প্রসব ব্যথা আসে জীবননাশের শঙ্কা নিয়ে। প্রত্যন্ত এ চরাঞ্চলের অন্তঃসত্ত্বা নারী ও নবজাতকদের জীবনে আশার আলো নিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে ভেসেছে 'মমতার তরী'। ইঞ্জিনচালিত নৌকায় বিশেষ এ ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সে ২৪ ঘণ্টা থাকবে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। থাকবে ওষুধ, শয্যা, বেসিক লাইফ সাপোর্টের ব্যবস্থা।

জেলার ৭টি উপজেলা ও ৮২টি ইউনিয়নে ৯টি সরকারি এবং প্রায় ২০টি বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে। এর পরও জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় নৌযানের অভাবে পানিবেষ্টিত এ জনপদে সঠিক সময়ে সেবা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে প্রসূতিদের সেবা ও নিরাপদ প্রসব এখানে ঝুঁকিপূর্ণ। অন্তঃসত্ত্বা নারী ও নবজাতকদের জটিল সমস্যা এবং চিকিৎসায় বিলম্বজনিত কারণে মৃত্যুরোধে গত সোমবার চালু হয়েছে এ নৌযান। যৌথভাবে এটি চালু করেছে এসকেএস ফাউন্ডেশন, সেভ দ্য চিলড্রেন এবং সরকারের স্থাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর। বন্যার সময় সরকার নির্ধারিত স্থানে স্যাটেলাইট ক্লিনিক পরিচালনায় ব্যবহূত হবে 'মমতার তরী', যা প্রথম দিন থেকেই সেবা দেওয়া শুরু করেছে।

কোরিয়া আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা (কোইকা) বাংলাদেশ এবং সেভ দ্য চিলড্রেন কোরিয়ার সহায়তায় চালু মমতা প্রকল্পের আওতায় ২৪ ঘণ্টা ফুলছড়ির উড়িয়া, এরেন্ডাবাড়ী ও পাশের সাঘাটার হলদিয়া ইউনিয়নে দেওয়া হবে সেবা। এর ফলে এ তিন ইউনিয়নের দুর্গম চরের মা ও শিশুদের মৃত্যু কমে আসবে বলে সংশ্নিষ্টদের আশা।

সোমবার বিকেলে ফুলছড়ির কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের বালাসীঘাটে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে 'মমতার তরী'র উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মো. অলিউর রহমান। ফুলছড়ি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জিএম সেলিম পারভেজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন সিভিল সার্জন এএম আখতারুজ্জামান, পুলিশ সুপার মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম, ইউএনও মুহাম্মদ আলাউদ্দিন, সেভ দ্য চিলড্রেনের কান্ট্রি ডিরেক্টর গুনো ভ্যান ম্যানেন, এসকেএস ফাউন্ডেশনের উপনির্বাহী প্রধান ড. ইমরুল কায়েস মনিরুজ্জামান, কোইকা বাংলাদেশের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর হন সাং ক্যাং ও সেভ দ্য চিলড্রেন কোরিয়ার ডিরেক্টর মিনজি ক্যাং।

এসকেএস ফাউন্ডেশনের উপনির্বাহী প্রধান ড. ইমরুল কায়েস মনিরুজ্জামান বলেন, দেশে যে উন্নয়ন হয়েছে তার তুলনায় পিছিয়ে আছে প্রত্যন্ত এলাকাগুলো। এসব এলাকার অন্যতম গাইবান্ধা জেলার চরাঞ্চলগুলো অন্যতম। এসব এলাকার নারীদের জরুরি ভিত্তিতে নিরাপদে উন্নত প্রসূতি কেন্দ্রে স্থানান্তর করা প্রয়োজন। এতে মা ও শিশু মৃত্যু রোধ সম্ভব।

সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশের পরিচালক গুনো ভ্যান ম্যানেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও ভৌগোলিক কারণে এই অঞ্চলসহ নদীবেষ্টিত এলাকাগুলো বন্যার ঝুঁকিতে থাকে। এ পরিস্থিতিতে মানুষের কাছে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে মমতার তরী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ উদ্যোগ টিকিয়ে রাখতে সবার অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে কোইকা বাংলাদেশের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর হন সাং ক্যাং বলেন, তবেই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।

ইউএনও মুহাম্মদ আলাউদ্দিন মনে করেন, যোগাযোগ জটিলতায় চরের নারী ও নবজাতকের মৃত্যুর শঙ্কা দূর করবে এ নৌকা। একই রকম মন্তব্য করে উপজেলা চেয়ারম্যান জিএম সেলিম পারভেজ বলেন, এ সেবাটি আরও প্রসারিত করা প্রয়োজন। এই নৌকার সুবিধার বিষয়ে চরাঞ্চলের মানুষকে জানাতে শিক্ষিত ও সচেতন যুব সমাজকে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান পুলিশ সুপার মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।

সিভিল সার্জন এএম আখতারুজ্জামান বলেন, এই ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সে জরুরি চিকিৎসাসেবার জন্য রোগীর জন্য বিছানা ছাড়াও থাকছে জরুরি অক্সিজেন ও মেডিকেল সাপোর্ট টিম। ২৪ ঘণ্টা দুটি নম্বরে কল দিলে নৌকাটি দ্রুত নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছে যাবে।

বিষয় : মমতার তরী ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স

মন্তব্য করুন