ঈদ এলেই পরিবহনের, বিশেষ করে রেল ও বাসের টিকিটপ্রত্যাশীদের ভোগান্তি যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেখা যায়, বিশেষ করে যাঁরা ঈদের আগের শেষ কর্মদিবসে রাজধানী ছেড়ে দেশের বিভিন্ন শহর বা গ্রামে প্রিয়জনের সঙ্গে উৎসব পালন করতে চান, তাঁদের কাছে পরিবহনের টিকিট হয়ে পড়ে সোনার হরিণ। তখন অনেককেই কালোবাজারে স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ দাম দিয়ে টিকিট সংগ্রহ করতে হয়। অনেকে কালোবাজারে টিকিট সংগ্রহ করতে না পেরে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই বাস, ট্রেন বা লঞ্চে গাদাগাদি করে বাড়ি ফেরার চেষ্টা চালান। এবারও অন্তত বাসের ক্ষেত্রে একই পরিস্থিতি হতে পারে বলে একটা শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আমাদের মধ্যে এ শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে শনিবার সমকালের এক প্রতিবেদন দেখে। সেখানে বলা হয়েছে, ঈদুল আজহা উপলক্ষে বাসের অগ্রিম টিকিট বিক্রির প্রথম দিনেই শেষ হয়ে গেছে ৭ জুলাইয়ের টিকিট। এমনকি অনলাইনেও ওই দিনের কোনো টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না। আরও দুঃখজনক বিষয় হলো, বিভিন্ন বাস কোম্পানির কাছ থেকে এ বিষয়ে কোনো সদুত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। ধারণা করা হচ্ছে, এবারের ঈদুল আজহা অনুষ্ঠিত হবে ১০ জুলাই। এর আগের দু'দিন শুক্র ও শনিবার। সে হিসাবে শেষ কর্মদিবস হবে ৭ জুলাই। সাধারণত রাজধানীসহ বড় বড় শহরের চাকরিজীবীরা এ শেষ কর্মদিবসেই অফিস শেষে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী তাঁদের স্বজনের সঙ্গে উৎসব পালনের জন্য ছুটে যান।

গত ঈদুল ফিতরের সময়েও রেলের টিকিট নিয়ে এ রকম একটি সংকট সৃষ্টি হয়েছিল। তখন রেল কর্তৃপক্ষ মোট আসনের অর্ধেক সংখ্যক টিকিট অনলাইনে বিক্রির ঘোষণা দিয়েছিল। এ ঘোষণার উদ্দেশ্য ছিল, স্টেশনে টিকিটপ্রত্যাশীদের ভিড় কমিয়ে টিকিট বিক্রির একটা সুস্থ-স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করা। কিন্তু যথারীতি নানা জটিলতার কারণে অনলাইনে টিকিট কাটতে না পেরে মানুষ কমলাপুর স্টেশনে এসে ভিড় করে। এতে টিকিটপ্রত্যাশীদের অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়। তখনও রেল কর্তৃপক্ষ অনলাইন টিকিট নিয়ে জটিলতার গ্রহণযোগ্য কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। অবশ্য তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুসন্ধানে অনলাইনে রেলের টিকিট বিক্রির দায়িত্বপ্রাপ্ত কোম্পানিটির কারসাজি ধরা পড়ে এবং এর দায়ে কোম্পানিটির ইঞ্জিনিয়ারসহ কয়েকজন কর্মী গ্রেপ্তারও হন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ওই ঘটনা থেকে পরিবহনের টিকিট বিক্রির বিষয়টি নজরদারির দায়িত্বে নিয়োজিত কর্তৃপক্ষ কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেছে বলে মনে হয় না। যদি তা না হতো, মাত্র দু'মাসের ব্যবধানে আরেকটি বড় উৎসবে বাসের টিকিট নিয়ে যাত্রীদের এমন দুর্ভোগে পড়তে হতো না। বলা বাহুল্য, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা মুসলমানদের সবচেয়ে বড় দুটি ধর্মীয় উৎসব। এ সময় সাধারণত ছুটিও একটু বেশি পায় মানুষ। তাই নগরের যান্ত্রিক জীবনে হাঁপিয়ে ওঠা কর্মজীবী মানুষ অন্তত উৎসবের সময়টা স্বস্তিতে ও প্রিয়জনের সান্নিধ্যে কাটানোর আশায় গ্রামাঞ্চলের দিকে ছুটে যায়। একসঙ্গে অনেক মানুষ নগর ছাড়তে চাওয়ায় ওই সময়ে স্বাভাবিকভাবেই টিকিট পেতে যাত্রীদের মধ্যে একটা হুড়োহুড়ি পড়ে। এরই সুযোগ নেয় টিকিট বিক্রির সঙ্গে যুক্ত রাতারাতি ধনী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর সংশ্নিষ্ট পরিবহন কর্মীরা। টিকিট কালোবাজারিদের সঙ্গে মিলে এরা টিকিটকে রীতিমতো এক দুর্লভ বস্তুতে পরিণত করে। বেসরকারি পরিবহনের ক্ষেত্রে অনেক মালিকও যে এ অনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তা-ও নতুন করে বলার কিছু নেই।

গত দু'বছর করোনা অতিমারির কারণে মানুষ এমনকি উৎসবের সময়ও একভাবে ঘরবন্দি ছিল। তাই এবারের ঈদুল ফিতরের সময় যেমনটা দেখা গেছে, তেমনি আসন্ন ঈদুল আজহাতেও ব্যাপক হারে ঘরমুখো হবে প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটাতে। মানুষের এ যাতায়াত যাতে মসৃণ হয়, তার জন্য ঈদুল ফিতরের সময়, বিশেষ করে সংশ্নিষ্ট পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর থাকার ঘোষণা দিয়েছিল। এবারও নিশ্চয় তাদের তৎপরতা দেখা যাবে। আমাদের প্রত্যাশা, ৭ জুলাইয়ের বাসের টিকিট নিয়ে জালিয়াতির যে অভিযোগ উঠেছে, তা নিরসনের মধ্য দিয়েই তাদের ওই তৎপরতা দৃশ্যমান হয়ে উঠবে। মানুষের স্বতঃস্ম্ফূর্ত উৎসবের পথে এমন কাঁটা থাকতে দেওয়া যায় না।

বিষয় : কালোবাজার সম্পাদকীয়

মন্তব্য করুন