উদ্বোধন হয়ে গেল বহু আকাঙ্ক্ষিত পদ্মা সেতু। গতকাল শনিবার দুপুরে উদ্বোধনের সময় তেঁতুলিয়া থেকে কুয়াকাটা- সর্বত্রই উত্তাল পদ্মার মতোই আছড়ে পড়েছিল আনন্দ-উচ্ছ্বাসের ঢেউ। সারাদেশের মানুষের অনুভূতি যেন এক সুতায় বাঁধা পড়েছিল। প্রাণে প্রাণ মিলেছিল দেশাত্মবোধে। আবেগে দুলে উঠেছিল প্রতিটি হৃদয়। শত শত মাইল দূরে থেকেও দেশের মানুষ পরস্পরের সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করেছে, রোমাঞ্চিত-উদ্বেলিত হয়েছে। সারাদেশই ছিল উৎসবমুখর। সবার চোখেই যেন ফুটে উঠেছিল এমন অভিব্যক্তি- এ অর্জন আমাদের, দেশের প্রতিটি মানুষের।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থেকে পদ্মার দূরত্ব প্রায় ৫০০ কিলোমিটার। এমন দূরত্বে থেকেও স্বপ্ন ও গর্বের পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের আনন্দ ঢেউ দোলা দেয় কর্ণফুলী পাড়েও। বড় পর্দায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখানো, পদ্মা সেতুর রেপ্লিকা প্রদর্শন, নাচ, গান-বাজনা, বর্ণিল শোভাযাত্রা, আনন্দ সমাবেশসহ উৎসবের কোনো অনুষঙ্গের কমতি ছিল না বন্দরনগরী চট্টগ্রামে।

নগরীর জামালখান এলাকায় শনিবারের সকালটি ছিল কিছুটা অন্যরকম। পথচারী ও গাড়ির যাত্রীর চোখ আটকে যায় সড়কের পাশে থাকা একটি রেপ্লিকায়। চট্টগ্রামের মানুষ চোখের সামনে পদ্মা সেতু দেখতে পারছেন না- এ নিয়ে অনেকের আক্ষেপের শেষ নেই। তবে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন সেতুর রেপ্লিকা বানিয়ে মানুষের সেই আক্ষেপ কিছুটা হলেও ঘুচিয়েছেন। জামালখানের রাস্তায় গেলেই দেখা যাবে সেই রেপ্লিকা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করছিলেন, তখন বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে ভেসেছেন বন্দরনগরীর মানুষও। সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান নগরবাসী যাতে সরাসরি উপভোগ করতে পারেন, সেজন্য আটটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বড় পর্দায় দেখানোর ব্যবস্থা করে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ। পয়েন্টগুলোতে ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। সাজিয়ে তোলা হয় গোটা নগরীকে। ব্যানার, ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ডে ভরে যায় নগরী।

নিজেদের দুর্দিন ভুলে এ উৎসবে শামিল হন সিলেটবাসীও। বন্যাকবলিত সিলেট অঞ্চলে জাঁকজমক অনুষ্ঠান না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও আওয়ামী লীগের উদ্যোগে নগরীর বিভিন্ন স্থানে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বড় পর্দায় সরাসরি দেখানো হয়। বিপুলসংখ্যক মানুষ এই অনুষ্ঠান দেখতে জড়ো হন। এ ছাড়া জেলা ও মহানগর পুলিশের উদ্যোগে শোভাযাত্রাও বের করা হয়। লেখক ও গবেষক হাসান মোরশেদ ফেসবুকে তাঁর স্ট্যাটাসে লিখেছেন, শেখ হাসিনার পর এই পদ্মা সেতু বিনির্মাণে যে দু'জন মানুষের অবস্থান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাঁরাও সিলেটি। একজন সাবেক অর্থমন্ত্রী এ এম এ মুহিত, আরেকজন ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী। সিলেটের বালু-পাথরও বিপুল পরিমাণে ব্যবহূত হয়েছে এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে।

সিলেট জেলা পরিষদ মিলনায়তনে বড় পর্দায় সেতুর উদ্বোধন সরাসরি দেখানো হয়। মিলনায়তনে ওড়ানো হয় বেলুন। পরে জেলা ও মহানগর পুলিশ বের করে আনন্দ র‌্যালি।

উৎসবের আমেজে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান রাজশাহীর তিনটি স্থানে বড় পর্দায় দেখানো হয়। এসব স্থানে কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেন। উপস্থিত জনতাকে মিষ্টি খাওয়ানো হয়। সকালে জেলা মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি স্টেডিয়ামে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে সমাবেশ হয়।

এর আগে শোভাযাত্রা নিয়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা স্টেডিয়ামে প্রবেশ করেন। সেতু উদ্বোধনের পর এখানে অতিথিরা বেলুন ও পায়রা ওড়ান।
নগরীর সাহেববাজার বড় মসজিদের সামনে সমাবেশে মিষ্টি বিতরণ করে মহানগর আওয়ামী লীগ। রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা শোভাযাত্রা বের করেন।

উৎসবে মাতেন বগুড়াবাসীও। জেলা প্রশাসনের আয়োজনে আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বড় পর্দায় দেখানো হয়। সেতুর উদ্বোধন ঘোষণার পরপরই বগুড়ায় বেলুন, ফেস্টুন, শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে উদযাপন করা হয়। জেলা প্রশাসন ও জেলা আওয়ামী লীগ শহরের আনন্দ শোভাযাত্রা বের করে।
বর্ণিল সাজে সেজেছিল রংপুরও। নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নানা রঙের পতাকা, তোরণ আর ফেস্টুন দিয়ে সজ্জিত করা হয়। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে টাউন হল থেকে একটি বর্ণাঢ্য র‌্যালি বের করা হয়। জিলা স্কুল মাঠে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সরাসরি সম্প্রচার বড় পর্দায় প্রদর্শন করা হয়। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আতশবাজির আয়োজন করে জেলা প্রশাসন।

দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ফরিদপুরে নানা কর্মসূচি পালিত হয়েছে। জেলা প্রশাসনের আয়োজনে একটি বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রা বের করা হয়। সেখানে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীসহ শহরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার হাজারো মানুষ অংশ নেন। পরে শেখ জামাল স্টেডিয়ামে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে ২ দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক অতুল সরকার। এ ছাড়া ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস থেকে বিশাল আনন্দ র‌্যালি বের করে
শহর প্রদক্ষিণ করে।

আনন্দের ঢেউ লেগেছে কিশোরগঞ্জেও। জেলা প্রশাসন আয়োজন করে দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য উৎসব ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। অনুষ্ঠিত হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। কালেক্টরেট প্রাঙ্গণ থেকে শোভাযাত্রাটি শুরু হয়ে পুরাতন স্টেডিয়ামে গিয়ে শেষ হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান পুরাতন স্টেডিয়ামে বড় পর্দায় প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়। পুরাতন স্টেডিয়ামে ওপেন কনসার্ট, আলোকসজ্জা, আতশবাজি, পদ্মা সেতুর রেপ্লিকা স্থাপনসহ ছিল নানা আয়োজন।

পঞ্চগড়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম স্টেডিয়ামের উদ্বোধন উৎসব উদযাপনে জেলা প্রশাসনের তৈরি করা পদ্মা সেতুর রেপ্লিকা দৃষ্টি কেড়েছে স্থানীয়দের। উৎসুক জনতা সকাল থেকেই টিভির পর্দায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আর রেপ্লিকা দেখতে ভিড় করেন। এর আগে জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে একটি আনন্দ শোভাযাত্রা বের হয়। এতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ বিভাগসহ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, বীর মুক্তিযোদ্ধা, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ ১০ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নেন। সেতু উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে বেলুন ও পায়রা ওড়ানো হয়। ছিল আতশবাজি, আলোকসজ্জা ও সংগীতানুষ্ঠান।

বর্ণিল সাজে সেজেছিল কুয়াকাটা সৈকত। আদিবাসী রাখাইন সম্প্রদায় শোভাযাত্রাসহ পিঠাপুলি উৎসব করে। একই সঙ্গে ট্যুরিস্ট পুলিশের আয়োজনে কুয়াকাটার বিভিন্ন সংগঠন ও ট্যুরিস্ট পুলিশ আনন্দ শোভাযাত্রা ও মিষ্টি বিতরণ করে। ওড়ানো হয় পায়রা।

পদ্মা সেতু চালুর ফলে কুয়াকাটার মানুষ সামাজিক, অর্থনৈতিকসহ সব ক্ষেত্রে এগিয়ে যাবে বলে মনে করেন পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র আবদুল বারেক মোল্লা।

পৌর মেয়র আনোয়ার হাওলাদারের ভাষ্য, পদ্মা সেতু দিয়ে কুয়াকাটায় আগত পর্যটকদের বরণে সব প্রস্তুতি নিয়েছেন। পৌরসভার উদ্যোগে মহাসড়কে আলোকসজ্জাসহ বিভিন্ন সংগঠন তোরণ, ফেস্টুন ও ব্যানার টাঙিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়েছে।

'পদ্মা সেতুর উদ্বোধন দেশবাসীর স্বপ্নপূরণ' স্লোগানে ময়মনসিংহে বিভিন্ন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। জেলা প্রশাসনের আয়োজনে সকালে নগরীর টাউন হল চত্বর থেকে রফিক উদ্দীন ভূঁইয়া স্টেডিয়াম পর্যন্ত বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। পরে স্টেডিয়ামে এক আড়ম্বরপূর্ণ পরিবেশে উদ্বোধন অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করা হয় এবং বেলুন উড়িয়ে উদযাপন করা হয়।