'এতদিন ধরে অপেক্ষায় ছিলাম- কবে পদ্মা সেতু চালু হবে। অবশেষে আজ সেই দিন এসেছে। তাই প্রথম দিনই স্বপ্নের সেতু দেখতে চলে আসছি। আর আসছি যখন, সেলফি না তুললে কি চলে!' এভাবেই নিজের উচ্ছ্বাস তুলে ধরলেন শিক্ষার্থী বৃষ্টি আক্তার। অবশ্য শুধু তিনিই নন, তাঁর মতো হাজারো মানুষ গতকাল রোববার পদ্মা সেতু দেখতে আসেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়াকড়ি থাকলেও তাঁরা বিভিন্ন যানবাহনে এসে টোল প্লাজা পেরিয়ে সেতুতে ওঠেন। এরপর সেতুর ওপর যান থামিয়ে নানা ভঙ্গিতে ছবি তোলেন, ভিডিও করেন। কেউ আবার ফেসবুকে লাইভ করেন।

পদ্মা সেতুতে যান চলাচল শুরু প্রথম দিন গতকাল ভোর থেকেই মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে ভিড় করেন বহু মানুষ। তাঁদের বড় অংশই মোটরসাইকেল নিয়ে এসেছিলেন। কেউ কেউ প্রাইভেটকার বা মাইক্রোবাস নিয়ে যান। আর যাঁরা কোনো যানবাহনে যাননি, তাঁদের জন্য ছিল ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেল। অবশ্য শুধু সেতু পারাপারের জন্য ২০০ টাকা ভাড়া খুবই বেশি বলেও আপত্তি জানাচ্ছিলেন অনেকে। এই সুযোগে কিছু মাইক্রোবাসও একই রকম ভাড়ায় যাত্রী পারাপার করেছে।

সেতু দেখতে নারায়ণগঞ্জের জালকুড়ি এলাকা থেকে এসেছিলেন মধ্যবয়সী শাহনাজ বেগম। মাওয়া প্রান্তের টোল প্লাজার আগে দাঁড়িয়ে তিনি ভাড়ায়চালিত যানবাহনের চালকদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। পরে তিনি সমকালকে বলেন, 'এত্ত বড় একটা ব্রিজ হইছে, তাই দেখতে আইছি। কিন্তু ওই পাড়ে যাইতে-আইতে ৪০০ টাকা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। আজকার দিনটা সরকার ফ্রি (টোল ছাড়া হেঁটে পার হওয়ার সুযোগ) দিলে ভালো হইত।'

টোল প্লাজা পার হয়ে মূল সেতুতে ওঠার পর দেখা যায়, বিভিন্ন বয়সের বহু নারী-পুরুষ মোবাইল ফোন বা ক্যামেরায় ছবি তোলায় ব্যস্ত। তাদের কেউ পরিবারের সঙ্গে, কেউ বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে এসেছিলেন। মোটরসাইকেলে প্রিয় মানুষটিকে সঙ্গে নিয়ে বেড়াতে এসেছিলেন অনেকে। আবার একাও ছিলেন কেউ কেউ। সেতুর দুই প্রান্তের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিলেন তাঁরা। কেউ কেউ আবার ঝুঁকিপূর্ণভাবে সেতুর সড়কের মাঝে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন। সেতু থেকে ফেসবুক লাইভ দেওয়া এবং নেচে-গেয়ে টিকটক ভিডিও তৈরি করতেও দেখা যায়। যদিও সেতুতে যান থেকে নামা ছিল নিষেধ। এ কারণে একটু পরপর পুলিশ ও সেতু কর্তৃপক্ষের টহল গাড়ি এসে সবাইকে সরিয়ে দিচ্ছিল। তবে তাতে ভাটা পড়ছিল না উল্লাস-উচ্ছ্বাসে। বরং টহল পুলিশের চোখ এড়িয়ে একটু সামনে গিয়ে আবারও যান থেকে নামছিলেন যাত্রীরা। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বাহনের যাত্রীরা তো বটেই, গণপরিবহন থামিয়েও নামছিল মানুষ।

সেতু দেখতে যাওয়া মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ীর ব্যবসায়ী পারভেজ মোল্লা সমকালকে বলেন, আমাদের এলাকায় দেশের সবচেয়ে বড় সেতু হয়েছে, এটা আমার জন্য খুবই গর্বের। তাই স্ত্রী ও দুই সন্তানকে সেতু দেখাতে নিয়ে এসেছি।

অনেকে আবার 'এক ঢিলে দুই পাখি মারা'র পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিলেন। তাঁদেরই একজন ফয়সাল দেওয়ান। তিনি জানান, মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর এলাকায় তাঁর বাড়ি। ব্যক্তিগত প্রয়োজনে মাদারীপুরে যাবেন। সেজন্য তিনি মাওয়া প্রান্তে এসেছেন, যাতে সেতুর ওপর দিয়ে চলাচল করা কোনো বাসে উঠতে পারেন। এতে সেতু দেখা হবে, আবার তাঁর কাজও হবে।

একই এলাকার শিক্ষার্থী মিজান হোসেনও এসেছিলেন মাদারীপুর যাওয়ার জন্য। তিনি জানালেন, অন্যদিন হলে মাওয়া ঘাট দিয়েই যেতেন, তবে সেতু চালু হওয়ায় এই পথে এসেছেন। এই সুযোগে সেতুতে নেমে কয়েকটি ছবিও তুলছেন।

সেতু দেখতে আশপাশের এলাকার মানুষ যেমন ভিড় করেছিলেন, তেমনি ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল বা খুলনা থেকেও এসেছিলেন উৎসাহীরা। অনেকে রীতিমতো বাস ভাড়া করে সামনে ব্যানার টানিয়ে সেতুতে বেড়াতে আসেন। এর মধ্যে একটি দল আসে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর থেকে। যাত্রীরা জানালেন, তাঁরা সবাই গোলাবাড়ী বটতলা বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সদস্য। সেতু দেখার উদ্দেশ্যেই এসেছেন তাঁরা।

টাঙ্গাইলের তোরাপগঞ্জ বাজার থেকে একইভাবে বাস ভাড়া করে এসেছিল আরেকটি দল। কেউ আবার পদ্মা সেতুর সঙ্গে আরও গন্তব্য যোগ করেছে। পদ্মা সেতু ও মোংলা বন্দর দেখার জন্য ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে এসেছিল তেমনই একটি দল।