আগে যা ছিল শুধু কল্পনা, এখন তা সত্যি হয়েছে পদ্মা সেতুর কারণে। সেতু চালুর প্রথম দিনেই সুফল মিলতে শুরু করেছে। রাজধানীর সঙ্গে দূরত্ব কমেছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর। রোববার সকাল ৬টায় বিআরটিসির রাজধানীর মতিঝিল ডিপো থেকে যাত্রা করা বাস সাড়ে চার ঘণ্টায় খুলনায় পৌঁছেছে। আগে লাগত ছয় থেকে আট ঘণ্টা। বরিশাল থেকে ছেড়ে আসা বাস ঢাকায় আসে তিন ঘণ্টা ২০ মিনিটে। ঢাকা-শরীয়তপুরের দূরত্ব এখন মাত্র এক ঘণ্টা ২০ মিনিট। আগের দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করলেও গতকাল সকাল ৬টা থেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চার কোটি মানুষের জীবনকে সহজ করা পদ্মা সেতুতে যান চলাচল শুরু হয়। পদ্মা সেতু কতটা প্রতীক্ষার ছিল, আকাঙ্ক্ষার ছিল, তা প্রথম দিনেই বোঝা গেছে সাধারণ মানুষের উন্মাদনায়। সেতু পার হয়ে তাঁদের আনন্দ আর ধরে না।

বিআরটিসির মতিঝিল ডিপোর ম্যানেজার মাসুদ তালুকদার সমকালকে বলেন, প্রথম দিনে টোল প্লাজায় কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তার পরও সাড়ে চার ঘণ্টায় ঢাকা থেকে বাস চলে গেছে খুলনায়। আগে প্রথমে মাওয়া ঘাটে নেওয়া হতো যাত্রীদের। সেখানে লঞ্চে পার হয়ে পদ্মার ওপার থেকে বিআরটিসির খুলনার বাস ধরতেন। পদ্মা সেতু সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেছে।

শুধু সুফল ভোগ নয়, ইতিহাসের সাক্ষী হতে শনিবার মধ্যরাত থেকেই পদ্মা সেতুর দুই পাড়ে হাজারো মানুষ ও যানবাহনের ভিড় জমে। কে আগে পার হবে- তার প্রতিযোগিতা চলে। ভোর ৫টা ৫০ মিনিটে যখন সেতুর টোল প্লাজা উন্মুক্ত করা হয়, তখন মাওয়ায় হাজারখানেক মোটরসাইকেলের সারি। দীর্ঘ যানজটও ছিল। মোটরসাইকেলের এমন বিপজ্জনক হুড়োহুড়ির কারণে গতকাল রাতে সরকার তথ্য বিবরণীতে জানায়, আজ সোমবার সকাল ৬টা থেকে পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত পদ্মা সেতুতে মোটরসাইকেল পারাপার বন্ধ থাকবে।

তবে সুখকর অভিজ্ঞতাই বেশি। বরিশাল থেকে তিন ঘণ্টা ২০ মিনিটে ঢাকায় আসা বাসের যাত্রী কাজল হোসেন জানালেন, পদ্মা সেতু অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। এসি বাসে ৫০০ টাকায় এসেছেন। লঞ্চে সারারাত লাগে। আগে বাসেও পাঁচ ঘণ্টা লাগত, যদি কপাল ভালো হতো। ঝড়-বৃষ্টি হলে সারাদিন ঘাটে বসে থাকতে হতো। তা থেকে রেহাই দিয়েছে পদ্মা সেতু।

সকাল ৬টা থেকে আট ঘণ্টায় পদ্মা সেতুতে ১৫ হাজার ২০০ যানবাহন পারাপার হয়েছে বলে সমকালকে জানিয়েছেন সেতুর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল হোসেন। তিনি জানান, এর মধ্যে ৯ হাজার ২৭২টি ছিল মোটরসাইকেল। মোট ৮২ লাখ ১৯ হাজার ৫০ টাকা টোল আদায় হয়েছে। আট ঘণ্টা করে হিসাব রাখা হয়েছে। রোববারে টোলের হিসাব আজ সোমবার জানা যাবে।

বিআরটিসির বরিশাল ডিপোর ব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর আলম সমকালকে জানান, রোববার ১৩টি বাস ঢাকায় যায়। এর ১০টি গতকালই ফিরেছে। তিনটি বরিশাল ফিরে আবার যাত্রী নিয়ে ঢাকায় গেছে।

দুপুর ২টার দিকে পদ্মা সেতুতে ঘুরে দেখা যায়, হাজারো মানুষ গাড়ি থামিয়ে নিষেধাজ্ঞা ভেঙে সেতুতে নেমে শুয়ে-বসে ছবি তুলছেন। পদ্মা সেতু জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, এখানে হেঁটে চলাচল করা যাবে না, ময়লা ফেলা যাবে না- সেতু বিভাগের গণবিজ্ঞপ্তির এসব শর্ত কাউকে মানতে দেখা যায়নি। সহকারী প্রকৌশলী ইলিয়াস রিটুর সঙ্গে কথা হয় টোল প্লাজায়। তিনি জানালেন, মানুষের ভিড়ই এখন প্রধান সমস্যা।

পদ্মা সেতুতে দেখা যায়, বাস থামিয়ে ৪০-৫০ জন যাত্রীও নামছেন! রেলিং ধরে পদ্মা নদী দেখছেন। পুলিশ ও সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) টহল চললেও উৎসুক জনতার তাতে থোড়াই কেয়ার। দ্রুতগতিতে চলা গাড়ির পাশে ছোটাছুটি, দৌড়ে সেতুর এক পাশ থেকে আরেক পাশে যাওয়ার মতো বিপজ্জনক কাজও করছেন। বিত্তবানের বাস হিসেবে পরিচিত গ্রিনলাইন ডাবল ডেকার স্লিপার কোচকেও দেখা গেল সেতুতে থেমে রয়েছে। যাত্রীরা নেমে ছবি তুলছেন।

সকাল ১০টায় মাওয়া টোল প্লাজার আধা কিলোমিটার আগে পদ্মা সেতু (উত্তর থানার) সামনে দেখা যায় হাজারখানেক মানুষের জটলা। সেতুতে হাঁটা বারণ ও যানবাহনও নেই। তাই তারা যেতে পারছেন না। যান সংকটের সুযোগে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু পাড়ি দিতে মোটরসাইকেলে দু'জন করে যাত্রী নিচ্ছে জনপ্রতি ২০০ টাকায়!

১১ আসনের মাইক্রেবাস (ঢাকা মেট্রো-চ-৫১৯০৪০) জনপ্রতি ২০০ টাকা ভাড়ায় ১৬ জন যাত্রী তোলে। আনন্দ পরিবহনের বাস (ঢাকা মেট্রো ব-১১-৫৯৪৭) গাদাগাদি করে যাত্রী তুলে জনপ্রতি ২৫০ টাকা ভাড়ায় পদ্মা সেতু 'ভ্রমণের' ঠিকাদারি নেয়। পিকআপেও জনপ্রতি ১০০-১৫০ টাকা নিয়ে সেতু পারাপার করা হয়।

হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেলে চালকসহ তিনজন যাচ্ছিলেন সেতু ভ্রমণে। মুন্সীগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তানভীর হাসান শাওনের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, প্রথম দিন বলে উন্মাদনা বেশি। ট্রাফিক নিয়ম ভঙ্গের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সোমবার থেকে আর ছাড় দেওয়া হবে না।

প্রথম দিনেই সেতুতে উঠতে হবে- যাত্রীদের এমন মরিয়া ভাব ছিল। গাড়িতে উঠে বসা ঢাকার জুরাইন থেকে আসা দিলারা বেগম জানালেন, পদ্মা সেতু বাংলাদেশের অহংকার, গর্ব। কত বছর ধরে অপেক্ষা করে আছেন সেতুর জন্য। দুই ঘণ্টা দাঁড়িয়ে বাস পেয়েছেন। ভাড়াও বেশি। তবু যাচ্ছেন শখ পূরণে।

বিকেল ৩টায় জাজিরা প্রান্তে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে টোল প্লাজায় হাটের মতো ভিড়। দূরদূরান্ত থেকে 'পর্যটকরা' এসেছেন সেতু ভ্রমণে। মাদারীপুরের শিবচর থেকে তিন কিশোরী সোহানা, মায়শা ও নুসরাতের সঙ্গে কথা হয়। তারা সবাই নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। পদ্মা সেতুতে ছবি তুলতে এসেছে। বাড়ি থেকে ১০ কিলোমিটার দূরের জাজিরা পর্যন্ত এসেছে অটোরিকশায়। বাসে জায়গা পাচ্ছে না বলে উঠতে পারছে না। মায়শা বলল, বাড়ির দুয়ারে পদ্মা সেতু হয়েছে। সারা দুনিয়ার লোক আসছে দেখতে। তারা কেন বসে থাকবে? তাই বান্ধবীরা মিলে চলে এসেছে।

ফিরতি পথে মাওয়া প্রান্তে সেই একই রকম ভিড় দেখা যায়। সন্ধ্যায় তৈরি হয় জনস্রোত। ৭৬ কিলোমিটার মাদারীপুর সদর থেকে সকল্প পরিবহনের বাসে ৫৫ মিনিটে মাওয়ায় চলে আসা নুরুস ছফা উচ্ছ্বসিত-উদ্বেলিত। তিনি বলেন, জীবনে ভাবিনি এক ঘণ্টায় বাড়ি থেকে পদ্মা পাড়ি দেওয়া সম্ভব। ঢাকা যাবেন পৌনে দুই ঘণ্টায়। এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ হওয়ার আগে চার-পাঁচ ঘণ্টা লাগত। আর দুই যুগ আগে ঢাকা-মাদারীপুরের পথে তিন-তিনটি ফেরি পার হতে হতো। আট-দশ ঘণ্টা বা সারাদিন লাগত। তাদের পথের কষ্ট থেকে মুক্তি দিয়েছে পদ্মা সেতু।

বিআরটিসির মতিঝিল ডিপোর ব্যবস্থাপক মাসুদ তালুকদার জানান, গতকাল ঢাকা-শরীয়তপুর রুটে বিআরটিসির দুটি বাস চলেছে। সেগুলোতে লেগেছে এক ঘণ্টা ২০ মিনিট করে। পদ্মা সেতুতে ভিড় কমে এলে আরও ১০-১২ মিনিট কম সময় লাগবে আগামী দিনগুলোতে।

সেতুতে ভিড় ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে ব্যবস্থা নিতে গতকালই সেনাবাহিনীকে চিঠিতে অনুরোধ জানিয়েছেন পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম। চিঠিতে বলা হয়েছে, পদ্মা সেতুর ক্ষতিসাধন ও মালপত্র চুরির ঘটনা ঘটেছে। তিনি সমকালকে বলেন, 'পদ্মা সেতু জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এর রক্ষণাবেক্ষণে হেঁটে চলা, গাড়ি থামিয়ে ছবি তোলার সুযোগ নেই। সেতুতে হেঁটে চললে প্রাণহানিরও শঙ্কা রয়েছে।' গণবিজ্ঞপ্তিতে গতকাল আবারও বিধিনিষেধের কথা জানিয়েছে সেতু কর্তৃপক্ষ।

এক যুবক গতকাল সেতুর রেলিংয়ে বোল্ট খুলে ভিডিও ধারণ করে গ্রেপ্তার হন। এ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক বলেন, তিনি শুনেছেন, ওই যুবক রেঞ্চ নিয়ে ঢুকেছিলেন। সিসিটিভি ফুটেজে তা দেখা গেছে। টোল প্লাজার ব্যারিয়ার বাসের ধাক্কায় ভেঙেছে- এমন খবেরর সত্যতা নাকচ করে দেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী তোফাজ্জল হোসেন।