ধস নেমেছে প্রবাসী বন্ডের বিনিয়োগে। যে পরিমাণ বিক্রি হচ্ছে, প্রবাসীরা ভাঙাচ্ছেন তার চেয়ে অনেক বেশি। সুদহার কমানো ও নানা শর্ত আরোপই এর মূল কারণ বলে মনে করেন সংশ্নিষ্টরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, গত মে মাস পর্যন্ত অর্থবছরের ১১ মাসে ৮৭৮ কোটি টাকার প্রবাসী বন্ড বিক্রি হয়েছে। অন্যদিকে প্রবাসীরা এ সময়ে ভাঙিয়েছেন এক হাজার ৯৫৯ কোটি টাকার বন্ড। তার মানে এ খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়া তো দূরে থাক, নিট কমেছে এক হাজার ৮০ কোটি টাকা। অথচ চলতি অর্থবছর এ ক্ষেত্রে নিট এক হাজার ২৯৮ কোটি টাকা বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছিল।

বর্তমানে ওয়েজ আর্নার্স ডেভেলপমেন্ট, ইউএস ডলার প্রিমিয়াম ও ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট- এই তিন ধরনের প্রবাসী বন্ড রয়েছে। ২০২০ সালের ডিসেম্বরের আগে প্রবাসীরা এসব বন্ডে যে কোনো পরিমাণ বিনিয়োগ করতে পারতেন। ওই বছরের ৩ ডিসেম্বর এক নির্দেশনার মাধ্যমে তিন ধরনের বন্ড মিলে সমন্বিত বিনিয়োগ সীমা নির্ধারণ করা হয় এক কোটি টাকা। বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের মধ্যে গত এপ্রিলে ইউএস ডলার প্রিমিয়াম ও ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ডে বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমা তুলে নেওয়া হয়েছে। ওয়েজ আর্নার্স ডেভেলপমেন্ট বন্ডে এক কোটি টাকার ঊর্ধ্বসীমা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তবে বিনিয়োগের বিপরীতে সুদহার কমানো হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাপের সময়ে সুদহারে পরিবর্তন আনায় বিস্ময় প্রকাশ করেন অর্থনীতিবিদরা।

সংশ্নিষ্টরা জানান, করোনা-পরবর্তী বৈশ্বিক চাহিদা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মুদ্রার মূল্যমানে বড় পরিবর্তন এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সারাবিশ্বে সুদহার বেড়েছে। বাংলাদেশের সুদহারও বাড়তির দিকে। এর মধ্যে গত এপ্রিলে প্রবাসী বন্ডে সুদহার কমানোর বিষয়টি ছিল বিস্ময়কর।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে ওয়েজ আর্নার্স ডেভেলপমেন্ট বন্ড মোট বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা। তবে ১১ মাসে বিক্রি হয়েছে মাত্র ৮১০ কোটি টাকা। একই সময়ে প্রবাসীরা এক হাজার ৭৪ কোটি টাকার বন্ড ভাঙানোয় নিট বিক্রি কমেছে ২৬৪ কোটি টাকা।

এই অর্থবছরে মোট ৪৯২ কোটি টাকার ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ড বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ছিল। তবে মে পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে মাত্র ৫৮ কোটি টাকা। একই সময়ে মূল পরিশোধ হয়েছে ৭৯৬ কোটি টাকা। নিট বিক্রি কমেছে ৭৩৮ কোটি টাকা। আর ৮২ কোটি টাকার ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ড বিক্রির লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১১ মাসে বিক্রি হয়েছে মাত্র ১০ কোটি টাকা। একই সময়ে ৮৮ কোটি টাকা ভাঙানোয় নিট বিক্রি কমেছে ৭৮ কোটি টাকা।

সুদহার কমানোর আগে যে কোনো অঙ্কের ওয়েজ আর্নার্স ডেভেলপমেন্ট বন্ডে পাঁচ বছরের জন্য ১২ শতাংশ সুদ পাওয়া যেত। বর্তমানে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে সুদহার অপরিবর্তিত থাকলেও ১৫ লাখের বেশি থেকে ৩০ লাখ ১১ শতাংশ, ৩০ লাখ টাকার বেশি থেকে ৫০ লাখ পর্যন্ত ১০ শতাংশ এবং ৫০ লাখ টাকার বেশি হলে ৯ শতাংশ সুদ নির্ধারণ করা হয়েছে। তিন বছর মেয়াদি ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ডে আগে ৬ শতাংশ সুদ পাওয়া যেত। বর্তমানে এক লাখ টাকা পর্যন্ত ৫ শতাংশ, এক লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ৪ শতাংশ এবং এর বেশি হলে ৩ শতাংশ সুদ দেওয়া হচ্ছে। তিন বছর মেয়াদি ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ডে আগে সাড়ে ৭ শতাংশ সুদ পাওয়া যেত। এখন ইনভেস্টমেন্ট বন্ডের তুলনায় প্রতি পর্যায়ে দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি সুদ মিলছে।