করোনার সংক্রমণ ও রোগী শনাক্তের হার দ্রুত গতিতে বাড়ছে। চার সপ্তাহ ধরে সংক্রমণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। সংক্রমণের হার টানা ১২ দিন ৫ শতাংশের ওপর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাপ্তাহিক হিসাব বিশ্নেষণে দেখা যায়, অন্যান্য দেশের তুলনায় বর্তমানে বাংলাদেশে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি। তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা ৩৫০ শতাংশ বেড়েছে। তবে এমন পরিস্থিতিতে এখনই বিধিনিষেধের কথা ভাবছে না সরকার।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণ পরিস্থিতির লাগাম টানতে এখনই স্বাস্থ্যবিধি মানতে কঠোর নির্দেশনা প্রয়োজন। তা না হলে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, সংক্রমণ পরিস্থিতি তাদের পর্যবেক্ষণে রয়েছে। পরিস্থিতি দেখে আগামী সপ্তাহে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৩ হাজার ৮২০টি নমুনা পরীক্ষায় নতুন করে ২ হাজার ১০১ জনের করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে, যা চার মাসের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি এর চেয়ে বেশি রোগী শনাক্তের সংবাদ দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সেদিন ২ হাজার ১৫০ রোগী শনাক্ত হয়েছিলেন।
সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষার বিবেচনায় রোগী শনাক্তের হার ১৫ দশমিক ২০ শতাংশ। আর গত তিন দিন শনাক্তের হার ১৫ শতাংশের ওপর রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুযায়ী, করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকা অবস্থায় শনাক্তের হার পরপর দুই সপ্তাহ ৫ শতাংশের বেশি হলে পরবর্তী ঢেউ ছড়িয়েছে বলে ধরা হয়।
নতুন শনাক্তের মধ্যে ১ হাজার ৮০৬ জন ঢাকা জেলার। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত দেশে মোট রোগী শনাক্ত হয়েছে ১৯ লাখ ৬৭ হাজার ২৭৪ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা আক্রান্তদের মধ্যে দু'জনের মৃত্যুর সংবাদ দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সরকারি হিসাবে ভাইরাসটিতে মোট মৃত্যু দাঁড়াল ২৯ হাজার ১৪২ জনে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাস ক্রমাগত রূপ পরিবর্তন করছে, দুটি ওমিক্রন সাব-ভ্যারিয়েন্ট এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি দেশকে বিপর্যস্ত করেছে। দেশে সাম্প্রতিক সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে এই সাব-ভ্যারিয়েন্ট দায়ী। ভাইরাসের এ নতুন সাব-ভ্যারিয়েন্ট খুব মারাত্মক না হলেও এগুলো অত্যন্ত সংক্রামক। টিকার প্রভাবে বা কেউ একবার সংক্রমিত হলে শরীরে যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, তা নির্দিষ্ট সময়ের পর অকার্যকর হয়ে যায়। তাই এখনই সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ তাঁদের।
দেশে ক্রমাগত সংক্রমণ বাড়লেও মৃত্যুর হার স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রয়েছে। এতে বড় ভূমিকা পালন করছে করোনা প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে মোট জনগোষ্ঠীর ৭৫ শতাংশকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। ৬৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ মানুষের টিকার দ্বিতীয় ডোজ সম্পূর্ণ হয়েছে। তবে বুস্টার ডোজ টিকা প্রয়োগে অনেক পিছিয়ে রয়েছে দেশ। মোট জনসংখ্যার মাত্র ২৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ মানুষ পেয়েছেন বুস্টার ডোজ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বুস্টার ডোজের গতি বাড়াতে প্রয়োজন ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা। তবে সেটা করতে পারেনি অধিদপ্তর।
শুধু সরকারি কর্মসূচি নয়, সবার জন্যই মাস্ক ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার পরামর্শ দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। সংক্রমণ বাড়লেও মৃত্যু এড়ানো যাচ্ছে কিনা- এমন প্রশ্নে এই ভাইরাস বিশেষজ্ঞ বলেন, করোনা প্রতিরোধে দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠীই টিকার আওতায় চলে এসেছে। এ কারণে টিকা নেওয়ার পর যারা করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন তাঁদের শরীরে খুব বেশি জটিলতা তৈরি হচ্ছে না। ফলে মৃত্যুও কম হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজরি কমিটির সদস্য আবু জামিল ফয়সাল বলেন, শুধু সরকারি কর্মকর্তা নয়, সবারই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা দরকার। সংক্রমণ সবারই হচ্ছে। অল্প কিছু মানুষ মাস্ক পরছেন। এরচেয়ে বড় বিষয়, যাঁরা আক্রান্ত হচ্ছেন তাঁদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। এখন জ্বর সর্দি কাশিতে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকেই।
কিছুদিনের মধ্যে দেশে করোনায় মৃত্যু হার বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোশতাক হোসেন বলেন, ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় এনে আমরা যদি আত্মতুষ্টিতে ভুগি তাহলে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে।
করোনাভাইরাসের চতুর্থ ঢেউ মোকাবিলায় বড় বিধিনিষেধের মতো পদক্ষেপের প্রয়োজন পড়বে না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, 'বেপরোয়াভাবে চলাচল বা স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করা যাবে না। যারা এখনও টিকা নেয়নি তাদের খুঁজে বের করে টিকার আওতায় আনতে হবে।'
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, করোনা পরিস্থিতি আমাদের পর্যবেক্ষণে রয়েছে। আগামী সপ্তাহের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।