ভারতের চেরাপুঞ্জিসহ মেঘালয় ও আসামে অতিবৃষ্টি, বাংলাদেশের অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং নদীর নাব্য কমে যাওয়া- এই তিনের মিলিত প্রভাবে সিলেট ও সুনামগঞ্জ এ বছর ইতিহাসের ভয়াবহতম বন্যার কবলে পড়েছে। জেলা দুটিতে এখন পর্যন্ত ৩৫ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে রয়েছেন। এই অতিবৃষ্টি গত ১২২ বছরের মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ বলে ভারতীয় আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে। এই অতি ভারি বৃষ্টিপাতের পেছনে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বৃষ্টির ধরনে পরিবর্তন এবং সার্বিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই বিপর্যয় চলাকালে আমরা দেখতে পাচ্ছি বাংলাদেশ সরকার, বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি পর্যায় থেকে সাধ্যমতো ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশে এ ধরনের দুর্যোগের প্রাথমিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার নিবিড় অভিজ্ঞতা রয়েছে এ দেশের সরকার ও জনগণের। ফলে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পানিবন্দি এলাকায় প্রাণঘাতী খাদ্যাভাব দেখা দেবে না বলে আমরা প্রত্যাশা করি। তবে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় আমাদের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রাখতে হবে। স্বল্পতম সময়ে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, কলকারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা অব্যাহত রাখাও জরুরি।
এবারের বন্যায় আক্রান্ত এলাকার সব শ্রেণির মানুষ- নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত, দিনমজুর থেকে চাকরিজীবী সবাই ভয়াবহ সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। কৃষকের ক্ষতি বর্ণনাতীত। ফসল-গবাদি পশু-পুকুরের মাছ হারিয়ে তারা দিশেহারা। এসব এলাকায় বসবাসরত চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীরা হয়তো কিছুদিনের মধ্যে আর্থিক-মানসিক ক্ষতি কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবেন, কিন্তু শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে পুরোপুরি নিঃস্ব যাঁরা, আয়ের উৎস হারানো সেসব অতিদরিদ্র মানুষের পক্ষে আগের জীবনে ফিরে আসা অত্যন্ত কঠিন হবে। আমরা অতীতেও দেখেছি, বানভাসি নিঃস্ব মানুষ শেষ পর্যন্ত শহরের বস্তিগুলোতে মাথা গোঁজার চেষ্টা করেন, যা মোটেও কাম্য নয়। এ পরিস্থিতি থেকে তাঁদের রক্ষা করতে হলে রাস্তাঘাট নির্মাণ, কলকারখানা চালুর পাশাপাশি এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হতদরিদ্র মানুষের জন্য জীবিকার আশু ব্যবস্থা করাও নীতিগত অগ্রাধিকারের মধ্যে পড়ে। একমাত্র জীবিকার দ্রুত সমাধান করার মধ্য দিয়েই অতিদরিদ্র পরিবারগুলোকে দীর্ঘস্থায়ী আর্থসামাজিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
বারবার বন্যা-জলোচ্ছ্বাস-ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বাসস্থান ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা করার লক্ষ্যে টেকসই পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ একটি কৌশল। গ্রাম বা শহরে তাঁদের বাসস্থানগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তন মাথায় রেখে দুর্যোগসহিষুষ্ণ করে পুনর্নির্মাণ করা জরুরি, যা প্রাকৃতিক দুর্যোগের দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক-মানসিক ক্ষতি হ্রাসে সহায়তা করবে। এটি সম্পন্ন করতে হলে সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রয়োজন; পাশাপাশি আর্থিক সহায়তা এবং উপযুক্ত প্রযুক্তি ও কারিগরি সহযোগিতাও দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগ কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। ব্র্যাকসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যাদের দুর্যোগ-সহনশীল বাড়ি নির্মাণ বা দারিদ্র্য বিমোচনের বিভিন্ন ফলপ্রসূ কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতা আছে, সেসব সংস্থা সরকারের সহযোগী হিসেবে সমন্বিত ভূমিকা পালন করতে সক্ষম।
দুর্যোগের শিকার শহরমুখী বানভাসি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক খাদ্য-বাসস্থান-চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদের পাশাপাশি পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনগুলোরও দায়িত্ব আছে। প্রাথমিকভাবে শহরে আশ্রয় নেওয়া মানুষের তালিকা তৈরি, সে অনুযায়ী তাঁদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান; পানি নেমে যাওয়ার পর তাঁরা যাতে নিজ এলাকায় ফিরে যেতে পারেন সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ এসব দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। নারী-শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
শহরের বস্তিগুলো সাধারণত গড়ে ওঠে নিচু, বন্যাপ্রবণ এলাকায়। বস্তিতে বসবাসরত মানুষ শহরের ভেতরে থাকলেও এ ধরনের দুর্যোগে প্রথম বাস্তুচ্যুত হন তাঁরাই। এ ক্ষেত্রে এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের বিশেষ ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রাথমিক জীবন রক্ষাকারী সেবার পাশাপাশি বস্তির ভেতরে নিরাপদ পানি ও পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে কাজ করতে হবে। উন্নয়ন সংস্থাসহ অন্যান্য বেসরকারি এবং ব্যক্তি উদ্যোগ যাতে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে, সে জন্য তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদানের মানসিকতা নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের এগিয়ে আসতে হবে।
এ ধরনের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ আগামী দিনগুলোতে আরও বেশি মাত্রায় হবে। এখনই যদি আমাদের শহর এবং গ্রামগুলোতে জলবায়ুসহিষুষ্ণ অবকাঠামো ও ঘরবাড়ি বানানোর দিকে খেয়াল না দিই তাহলে মানুষের দুর্ভোগ দিন দিন বেড়েই চলবে। আরও বেশি দরিদ্র মানুষ শহরমুখী হবেন জীবন-জীবিকার জন্য। বস্তির অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেড়ে উঠতে বাধ্য হবে শিশুরা।
ড. মো. লিয়াকত আলী :পরিচালক, জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচি, ব্র্যাক