বিদেশি প্রতিষ্ঠান। মাস গেলে মাইনে ১৮ হাজার টাকা। এখন দিন পনেরো গেলেই রামোস দাশের পকেট ফাঁকা। ৯ হাজার টাকায় দুই কক্ষের টিনশেডের ভাড়া বাসা রাজধানীর ফার্মগেটে, কষ্টের সংসারে সঙ্গী স্ত্রী আর ছেলে। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার গ্যাঁড়াকলে পড়ে সংসারে টানাপোড়েন। টিকতে না পেরে গত মাসে স্ত্রীকে পাঠিয়ে দেন পিরোজপুরের গ্রামের বাড়িতে। এরপর বাবা-ছেলে ওঠেন মেসে।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে গতকাল মঙ্গলবার সবজি কেনার সময় রামোস দাশের সঙ্গে দেখা। তাঁর চোখে বহ্নি, কণ্ঠে ক্রোধ। তিনি বলেন, 'বাজারে পণ্যের দামের আগুনে পুড়ছে সবাই। আমার মতো স্বল্প আয়ের মানুষ ঢাকায় থাকার অধিকার হারিয়েছে। বাধ্য হয়ে বউকে গ্রামে পাঠিয়ে বাসা ছেড়ে মেসে উঠেছি।'
রাজধানীর তেজকুনিপাড়ার দোকান থেকে ২৫ কেজি ওজনের এক বস্তা মিনিকেট চাল কিনছেন বেসরকারি চাকুরে মোস্তফা কামাল। তিনিও দারুণ হতাশ, ক্ষুব্ধ। বারুদকণ্ঠে বললেন, 'ঢাকায় এক যুগ ধরে পরিবার নিয়ে থাকি। কখনোই একসঙ্গে ৫০ কেজির বস্তা ছাড়া চাল কিনিনি।

দাম বাড়ার কারণে ২৫ কেজির বস্তা কিনতে বাধ্য হয়েছি। ৫৫ টাকা কেজির মিনিকেট চাল কিনতে হয়েছে ৭২ টাকায়। শুধু চাল নয়, গত এক বছরে সয়াবিন তেলের দামও হয়েছে দ্বিগুণ। আর পারছি না।'
শুধু রামোস দাশ কিংবা মোস্তফা কামালই নন, নিত্যপণ্যের দামের অনলের দগ্ধ ক্ষত সবার মনের ভাঁজে ভাঁজে। যেন কেউ দেখার নেই,

বলার নেই। আজ চাল তো কাল সবজি, পরশু ভোজ্যতেল কিংবা পেঁয়াজ- দাম বাড়ার গোলকধাঁধা থেকে কোনোভাবেই যেন বের হতে পারছে না স্বল্প ও নিম্ন আয়ের মানুষ। সংসার চালাতে গিয়ে বারবার হোঁচটই খাচ্ছেন তাঁরা।
এদিকে বাজারে দামের পাগলা ঘোড়া থামাতে শুল্ক্কছাড়, বাজার তদারকি, আমদানির উদ্যোগ- এসব কোনো কিছুই কাজে আসছে না। বন্যা, বিশ্ববাজার ও ডলারের দাম বেড়ে যাওয়া- এমন সব রকমারি ছুতোয় একের পর এক বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম। কেউ পণ্য কিনছেন আগের চেয়ে কম। কেউ কেউ খরচের চোটে পুরো পরিবারকে পাঠিয়ে দিচ্ছেন গ্রামে। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকে আরও কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ জানিয়েছেন সংশ্নিষ্টরা।

চালের বাজার :ভরা মৌসুমে অস্বাভাবিক দাম বেড়ে যাওয়ায় এক মাস ধরে চালের বাজারে চলছে যৌথ অভিযান। খাদ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের এই অভিযানের মধ্যেও ইতিবাচক ফল দেখা যায়নি বাজারে। দাম তো কমেইনি, উল্টো দফায় দফায় আরও বাড়ছে। এর মধ্যে শুল্ক্ক কমিয়ে বেসরকারিভাবে আমদানির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এর পরও গত এক মাসের ব্যবধানে সব ধরনের চালের দাম কেজিতে বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ টাকা।
বাজারে প্রতি কেজি মিনিকেট চালের কেজি ৬৮ থেকে ৭২ টাকা, বিআর-২৮ জাতীয় চালের কেজি ৫৫ থেকে ৫৮, নাজিরশাইল ৭০ থেকে ৭৫ টাকা। নিম্ন আয়ের মানুষ সাধারণত মোটা চাল খান বেশি। মোটা চালের মধ্যে স্বর্ণা জাতীয় চাল ৫০ থেকে ৫৫ এবং পাইজাম ৫৬ থেকে ৫৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যমতে, সরু চাল বিক্রি হচ্ছে (নাজিরশাইল-মিনিকেট) ৬৪ থেকে ৮০ টাকায়। এক মাস আগে ছিল ৫৮ থেকে ৬৮ টাকা। অর্থাৎ এক মাস না যেতেই সরু চালের দাম বেড়েছে ৬ থেকে ১২ টাকা। মাঝারি চালের (পাইজাম-লতা) দাম বেড়েছে ৪ থেকে ৬ টাকা। মোটা চালের (স্বর্ণা-চায়না ইরি) দামও বেড়েছে ৩ থেকে ৫ টাকা।
কারওয়ান বাজারের পাইকারি চাল ব্যবসায়ী জালাল আহমেদ বলেন, বন্যায় ক্ষতি ও সরবরাহে সমস্যা হওয়ার কারণে দাম বাড়ছে। গত সপ্তাহের চেয়ে প্রতি বস্তায় চালের দাম নতুন করে বেড়েছে ৫০ থেকে ১০০ টাকা। মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে বেশি। সিলেট অঞ্চলে বন্যার কারণে ত্রাণ দেওয়ার জন্য মানুষ মোটা চাল কিনছে বেশি। এ কারণে এই মানের চালের দাম বেড়েছে।

সবজির বাজার :ঢাকায় যেসব সবজি বেচাকেনা হয়, এর বড় একটা অংশ আসে খুলনা, কুষ্টিয়া, যশোর ও ঝিনাইদহ থেকে। সবার প্রত্যাশা ছিল, পদ্মা সেতু হলে সেসব এলাকার সবজি দ্রুত ঢাকায় আসবে। দামও তুলনামূলক কমবে। সবজির বাজারে সেই আশায় গুড়েবালি। বরং বন্যার ছুতোয় আরেক দফা দাম বাড়ার খÿ নেমে এসেছে ভোক্তার ওপর। শুধু পেঁপে আর ঢ্যাঁড়শ ছাড়া কোনো সবজিই ৫০ টাকার কমে মিলছে না। অন্য সবজির মধ্যে কোনোটির দাম ২০০ টাকায় ঠেকেছে। বাজারে পেঁপের কেজি ৩৫ থেকে ৪৫ আর ঢ্যাঁড়শ ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতি কেজি বেগুন ৮০ থেকে ১০০, শসা ৭০ থেকে ৮০, করলা ৬০ থেকে ৭০, বরবটি ৭০ থেকে ৮০, পটোল ৫০ থেকে ৫৫, মরিচ ৭০ থেকে ৮০, গাজর ৮০ থেকে ১৪০, কাঁকরোল ৫৫ থেকে ৬০, চিচিঙ্গা ৫০ থেকে ৫৫ টাকা, ধুন্দুল ও ঝিঙে ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। টমেটো কিনতে হলে ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে কেজিতে ১৯০ থেকে ২০০ টাকা।

মহাখালী কাঁচাবাজারের সবজি বিক্রেতা মো. ইব্রাহীম বলেন, বন্যায় সবজি নষ্ট হওয়ায় বাজারে আগের চেয়ে কম আসছে। এ কারণে গত এক সপ্তাহে সব সবজি কেজিতে প্রায় ২০ টাকা করে বেড়েছে।
হঠাৎ চড়া আলু ও পেঁয়াজ :এক-দুই টাকা করে গত ৮ থেকে ১০ দিনে আলুর দাম কেজিতে বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ টাকা। বাজারে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকায়, যা এতদিন বিক্রি হয়েছে ২০ টাকার মধ্যে। আলুর দাম বাড়ার কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না খোদ খুচরা ব্যবসায়ীরাও।

সেগুনবাগিচা এলাকার আলু বিক্রেতা সজিব হোসেন বলেন, কোনো কারণ ছাড়াই কয়েক দিন ধরে পাইকারি বাজারে আলুর দাম বাড়ছে। পাইকারি কিনতে হয় ২৮ থেকে ৩০ টাকায়। ফলে খুচরা বাজারেও বেড়েছে।

এবার ভালো ফলন হয়েছে পেঁয়াজের। তাই কৃষকদের ভালো দাম নিশ্চিত করতে ভারত থেকে এখন পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রেখেছে সরকার। এ ছাড়া উত্তরাঞ্চলে বন্যায় অনেক এলাকা প্লাবিত। এসব কারণ দেখিয়ে হঠাৎ করে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে ১০ থেকে ১২ টাকা বেড়েছে পণ্যটির দাম। প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৪৫ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

সামর্থ্য কমে যাওয়ার কারণে মানুষ এসব পণ্য কম কিনতে বাধ্য হচ্ছে বলে মনে করেন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন। তিনি বলেন, করোনায় মানুষের আয় কমেছে, তবে অন্য সব খরচ বেড়ে গেছে। এতে মধ্য ও নিম্ন আয়ের মানুষের সংসার চালানো হয়ে পড়েছে আরও কঠিন। বাজেটে কর ও ভ্যাট নিয়ে যেসব প্রস্তাব রয়েছে, তাতে সামনে আরও সমস্যায় পড়বে মধ্য ও নিম্ন আয়ের মানুষ। ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে সরকারের আরও কার্যকর ভূমিকা নেওয়া উচিত।


বিষয় : দামের ঘোড়া

মন্তব্য করুন