ঢাকার আশুলিয়ার হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাষক উৎপল সরকারকে হত্যা এবং নড়াইলের মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজের অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে অপদস্থ করার ঘটনায় দেশজুড়ে নিন্দা ও প্রতিবাদ চলছে। গতকাল বুধবার রাজধানী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সমাবেশ হয়েছে। অনেক সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও শিক্ষকদের সংগঠন নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। এসব বিবৃতিতে দুটি ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়। স্থানীয় প্রশাসনের নির্বিকার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।

এদিকে প্রভাষক উৎপলকে হত্যার মূল অভিযুক্ত বখাটে ছাত্র আশরাফুল ইসলাম জিতুকে গতকাল সন্ধ্যায় গাজীপুর থেকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। এ ছাড়া জিতুর বাবা উজ্জ্বল হোসেনকে গতকাল ৫ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে শুনানি শেষে এই রিমান্ড মঞ্জুর করেন বিচারক শেখ মুজাহিদুল ইসলাম। এর আগে উজ্জ্বল হোসেনকে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠায় পুলিশ। হত্যা মামলার প্রধান আসামি জিতুকে পালাতে সহায়তাকারী উজ্জ্বল হোসেনকে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে গ্রেপ্তার করে আশুলিয়া থানা পুলিশ।

তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, যে স্থানে শিক্ষককে নির্দয়ভাবে পেটানো হয়, সেটি কলেজের সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় ছিল। তবে জিতু ও কয়েক বখাটে বন্ধু মিলে আগে থেকে ওই ক্যামেরার সুইচ বন্ধ করে দেয়। কলেজের এক ছাত্রীর সঙ্গে জিতুর প্রেমের সম্পর্ক অভিভাবকদের জানান উৎপল। এ কারণে তাঁকে টার্গেট করে জিতু ও তার সঙ্গীরা।

গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, 'নড়াইলে কলেজ অধ্যক্ষকে পুলিশের সামনে লাঞ্ছনার ঘটনায় কার কতখানি গাফিলতি রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অকস্মাৎ অনেক ঘটনা ঘটে, যেগুলো হঠাৎ করেই ঘটে যায়।'

ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন সর্দার বলেন, 'ঘটনার সময়ের ফুটেজ এখনও পাইনি। সুইচ বন্ধ ছিল কিনা, পরীক্ষা করা হচ্ছে। ঘটনার দিন দুপুরে শিক্ষককে পেটানো হলেও তা মধ্যরাতে পুলিশকে জানানো হয়। ৯৯৯-এ কেউ ফোন দেয়নি।'
হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সাইফুল হাসান বলেন, 'কলেজের সিসিটিভি ক্যামেরার সুইচ পরিকল্পিতভাবে বন্ধ করেই শিক্ষককে হত্যা করা হয়েছে।'

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, 'জিতু পালিয়ে গাজীপুরের শ্রীপুরের নগরহাওলা গ্রামে আশ্রয় নেয়। বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানানো হবে।'
আরেকটি সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা কমিটির প্রধান ছিলেন উৎপল। অনেক দিন ধরেই তাঁর কাছে জিতুর ব্যাপারে নানা অভিযোগ আসতে থাকে। তাঁকে কোনোভাবে সামলাতে না পারার বিষয়টি প্রধান শিক্ষককেও জানান উৎপল। তবে প্রধান শিক্ষক কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেননি। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও জানাননি।

নিন্দা ও ক্ষোভ :শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা, ধর্মীয় অবমাননার অজুহাতে নড়াইলে ডিসি ও পুলিশ সুপারের উপস্থিতিতে অধ্যক্ষ লাঞ্ছনা এবং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হেনস্তায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন দল ও সংগঠন। গতকাল আলাদা বিবৃতিতে প্রতিটি ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় এনে বিচার ও উপযুক্ত শাস্তি দেওয়ার দাবি তুলেছে বিভিন্ন সংগঠন।

জাসদের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া বিবৃতিতে বলেন, 'নড়াইলের মির্জাপুর কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে গলায় জুতার মালা পরিয়ে লাঞ্ছিত করা এবং শিক্ষকদের মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগসহ ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসনের ভূমিকা ছিল নমনীয়। সত্য উদ্ঘাটনের জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি করছি।'

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ও নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল আলাদা বিবৃতিতে বলেন, নড়াইলে শিক্ষক নির্যাতন এবং সাভারে শিক্ষক হত্যার ঘটনায় সরকার ও প্রশাসনের ব্যর্থতা আর ইন্ধনই প্রধান ভূমিকা রেখেছে। প্রশাসন ও পুলিশ ঘটনা সামাল দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। প্রতিটি ঘটনায় যারা জড়িত ও দোষী তাদের গ্রেপ্তার, আইনের আওতায় আনা এবং উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এসব ঘটনার নিন্দা জানিয়ে আরও বিবৃতি দিয়েছেন সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম-মুক্তিযুদ্ধ ৭১, প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সমাজের সভাপতি শাহিনুর আল-আমীন ও সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াছ হোসেন, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি অধ্যাপক বদিউর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে।
বাম জোটের নেতারা নড়াইল যাচ্ছেন আজ :ধর্মীয় অবমাননার অজুহাতে অধ্যক্ষ লাঞ্ছনার ঘটনার বিস্তারিত জানতে এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে আজ বৃহস্পতিবার নড়াইল যাচ্ছে বাম গণতান্ত্রিক জোটের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি দল। এই পরিদর্শনকালে শিক্ষক নির্যাতনের বিষয়ে নড়াইল জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলবেন তাঁরা।

বিচার চাইলেন বৃদ্ধ মা :উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, ছেলে উৎপল সরকারকে হারিয়ে শোকে পাথর মা গীতা রানী সরকার। প্রধানমন্ত্রীর কাছে ছেলে হত্যার বিচার চাইলেন তিনি। বুধবার তাদের গ্রামের বাড়ি উল্লাপাড়ার এলংজানীতে গিয়ে দেখা যায়, ৮৫ বছর বয়সী গীতা রানী মূর্ছা যাচ্ছিলেন। মাঝে মাঝে জ্ঞান ফিরলে ছেলের ছবি বুকে নিয়ে তিনি প্রলাপ বকছেন। এদিকে স্বামীর অকাল ও মর্মান্তিক মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না উৎপলের স্ত্রী বিউটি সরকার। ঘটনা জানার পর থেকেই তার মুখে কথা নেই। কেউ কিছু জানতে চাইলে নির্বাক মুখে তাকিয়ে থাকছেন।

মোহনপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ মক্কা জানান, এলংজানী গ্রামের মৃত অজিত সরকারের আট ছেলেমেয়ের মধ্যে উৎপল সবার ছোট। এই পরিবারের সবাই ভদ্র ও বিনয়ী। বখাটে শিক্ষার্থীদের সুপথে আনতে গিয়ে এভাবে জীবন দিল উৎপল।

প্রেমের কথা ফাঁস করায় টার্গেট :সাভার থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, আশুলিয়ার হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক ছাত্রীর সঙ্গে জিতুর প্রেমের সম্পর্ক হয়। অপরিণত বয়সের ওই সম্পর্কের কথা ছাত্রীর অভিভাবককে জানিয়ে দিয়েছিলেন উৎপল কুমার সরকার। এই ঘটনা জিতু জেনে যান। এই ক্ষোভ থেকে জিতু ক্রিকেট স্টাম্প দিয়ে পিটিয়ে শিক্ষক উৎপলকে হত্যা করেন।

হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সাইম ইসলাম বলেন, 'জিতুর সঙ্গে একটি মেয়ের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। উৎপল স্যার সেই মেয়ের বাসায় ফোন করে শক্তভাবে বিচার দিয়েছিলেন, যেন মেয়েটা জিতুর সঙ্গে না মেশে। এটার ক্ষোভ থেকেই জিতু স্যারকে খেলার দিন পিটিয়েছে।'

কলেজের হিসাবরক্ষক পারুল আক্তার বলেন, 'যে মেয়ের সঙ্গে জিতুর প্রেমের সম্পর্ক ছিল সে আমাদের কলেজের এক শিক্ষকের ছোট বোন। এর বেশি আর কিছু জানি না।'
কলেজের আইসিটি বিভাগের শিক্ষক মনির হোসেন বলেন, 'জিতু দশম শ্রেণিতে পড়লেও তার বয়স ১৯। সে ক্লাস নাইনে আমাদের এখানে ভর্তি হয়েছিল। এর আগে সাভারের রাজফুলবাড়িয়া এলাকার একটি মাদ্রাসায় পড়ত। মামলার এজাহারে তার বয়স কমিয়ে ১৬ দেখানো হয়েছে।'

ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন সর্দার বলেন, 'এই হত্যার পেছনে কী কারণ ছিল, তা সরেজমিন জানার জন্য ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। মামলায় বয়স কী দেখানো হলো, এটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। প্রয়োজনে ডাক্তারি পরীক্ষা করা হবে।'
এ হত্যার প্রতিবাদে গতকাল সকালে তৃতীয় দিনের মতো আশুলিয়ার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী।

ঢাবি শিক্ষার্থীদের অনশন :প্রভাষক উৎপল কুমার সরকার হত্যার নিন্দা জানিয়ে অপরাধীদের বিচার দাবিতে আমরণ অনশন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী। গতকাল দুপুর ২টার দিকে টিএসসি সংলগ্ন রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে অনশন শুরু করেন তারা। পরে রাতে অনশনরত ১৭ শিক্ষার্থী অনশন ভাঙেন।


বিষয় : শিক্ষক হত্যা ও লাঞ্ছনা

মন্তব্য করুন