আশুলিয়ায় শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে পিটিয়ে হত্যা, নড়াইলের মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজের অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরানো, কয়েক মাস আগে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার বিনোদপুর রাম কুমার উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও গণিতের শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলের নিগৃহীত ও জেল খাটার ঘটনা দেশের বিবেকবান প্রত্যেক মানুষের হৃদয়কে ব্যথিত করেছে। এসব ঘটনা সমাজের জন্য

বড় ধরনের অশনিসংকেত। ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন করে দেখলে চলবে না। আমাদের সমাজের সাংস্কৃতিক ও নৈতিক নিম্নগমন ঘটছে। আমাদের সময়ে এ রকম ঘটনা ছিল অকল্পনীয়।
কোনো শিক্ষককে পেটানো, খুন করা, মামলা দেওয়ার ঘটনা- আমাদের ছাত্রজীবনে আমরা কখনও শুনিনি। আগে আমরা হয়তো এত উন্নত ছিলাম না। এখন উন্নয়ন হয়েছে কেবলই কাঠামোগত, বস্তুগত তথা অবকাঠামোগত। সাংস্কৃতিক ও নৈতিক উন্নয়ন ঘটেনি বলেই শিক্ষকের গায়ে ছাত্রের হাত দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। এ থেকে বের হতে গেলে একটা সামাজিক বিপ্লব দরকার। আর তার জন্য প্রয়োজন সাংস্কৃতিক জাগরণ।

একটা কথা খুব পরিস্কার, টাকাপয়সা ও ক্ষমতা সবকিছুকে গ্রাস করছে। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যা ঘটার তাই ঘটছে। সেখানে পুঁজির প্রসার ও বিস্তার ঘটে, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার নয়। দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার চলছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিক্ষকরাও নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। তরুণ সমাজের মনে হতাশা, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা ও কর্মহীনতা ভর করেছে। বর্তমান ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থার অভাব। নারীকে দুর্বল পেয়ে যেমন একশ্রেণির দুর্বৃত্ত ধর্ষণ করে, তেমনি সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের শিক্ষকদের ওপর সহিংসতা ঘটানো হচ্ছে। কারণ, তাঁরাও দুর্বল। সবলের ওপরে দুর্বলের এই অত্যাচার আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক কারণেই ঘটে।

আমাদের সমাজে সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার আজ বড় বেশি অভাব। মানুষ ঘরের মধ্যে আটকে থাকছে, মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকছে, খেলাধুলা নেই, সিনেমাও দেখছে ঘরে বসে। সামাজিকতার কোনো জায়গা এই ব্যবস্থায় নেই, সামাজিক কোনো অনুশীলনও নেই। আবদ্ধ থাকা মানুষ আক্রোশ অনুভব করে। সমাজের ওপর তার ক্ষোভ তৈরি হয়।

শিক্ষকদের নিপীড়ন ও খুনের ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা। আগের ঘটনাগুলোর কোনো বিচার না হওয়ায় এমন সন্ত্রাস, সহিংসতা বারবার ঘটে। তাই বিচারের দৃষ্টান্ত রাখা দরকার। এর পরের কথা হলো, রাজনৈতিক অবস্থা বদলাতে হবে। গণতন্ত্রের অনুশীলন ও চর্চা না বাড়ালে সহনশীলতা আরও কমে যাবে। দেশে গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দরকার। এগুলো অতীব প্রয়োজনীয়।
আমরা দেখছি, দেশে উন্নয়ন হচ্ছে। তবে সে উন্নয়ন বৈষম্যমূলক। কিছু সংখ্যক মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন হচ্ছে, তাঁরা বিপুল টাকা আয় করছেন, বিদেশে টাকা পাচার হচ্ছে। যে ধরনের উন্নয়ন হচ্ছে তাতে কর্মের কোনো সংস্থান হচ্ছে না। বিনিয়োগ হচ্ছে না। বৈষম্যমূলক এই উন্নয়ন সাধারণ মানুষের কোনো উপকারে লাগছে না। এতে দেশে এই ধরনের দুর্গতি মাঝেমধ্যেই দেখা দেবে।

আর সাংস্কৃতিক চর্চা হওয়া দরকার সুস্থ, কোনো উদ্দেশ্যমূলক কারণে নয়। পুঁজিবাদী এই সমাজব্যবস্থা বদলে সমষ্টিগত সম্পদের মালিকানা দরকার। কেন তরুণ-কিশোররা সহিংস হবে, তারাই তো একাত্তরের রণাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছে। সেই তারাই এখন কাজ না পেয়ে বেকার, অলস সময় কাটিয়ে নানা ঘটনার কারণ হচ্ছে। আমি মনে করি, সারাদেশে আমাদের যে পাঠাগারগুলো আছে, সেগুলোকেই সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। সেখানে কিশোর-তরুণরা বই পড়বে, লিখবে, খেলবে, কুচকাওয়াজ করবে, ছবি আঁকবে, রাস্তাঘাট-পুল-সাঁকো তৈরিতে শ্রম দেবে, সমাজের বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াবে।

এখন কথা হলো, এই কাজটা করবে কারা? যারা মনে করেন এই অসুস্থ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। সেই সাহসী হৃদয়বান ও বুদ্ধিমান মানুষরাই তরুণ-কিশোরদের প্রস্তুত করাবেন। সাংস্কৃতিক জাগরণের একটি বড় আন্দোলন দেশে দরকার। আমরা অন্ধকারের দিকে ধেয়ে চলেছি। এ থেকে সমাজকে ফেরাতে হবে। এ কাজ না করে কেবল শাস্তি দিয়ে এই ভয়াবহ প্রবণতা রোধ করার চেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য।