জাতীয় সংসদে ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর মঞ্জুরী দাবীর আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দলীয় সদস্যরা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নির্বাচন কমিশন ও জননিরাপত্তা বিভাগের সমালোচনা করেছেন। পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে বলেছেন, পুলিশ এখন আর জনকল্যাণে নয়, আওয়ামী লীগের নিরাপত্তায় নিয়োজিত। পুলিশের কিছু সদস্যের দুর্নীতির কারণে সরকারের বদনাম হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দলের সদস্যরা এ কথা বলেন। এর আগে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়।

জননিরাপত্তা বিভাগের আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির হারুনুর রশীদ বলেন, পুলিশ এখন জনকল্যাণে নয় আওয়ামী লীগের নিরাপত্তা কল্যাণে নিয়োজিত। দেশে একটি আতঙ্কজনক পরিবেশ বিরাজ করছে। গুম, বিচারবহির্ভুত হত্যা বন্ধ হয়নি। এক্ষেত্রে পুলিশ এগিয়ে, তারপর রয়েছে র‌্যাব।

বিএনপির আরেক সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, সরকার আগামী নির্বাচন নিয়েও নীল নকশা করছে। তার একটি আলামত হল বেসরকারি সংস্থা অধিকারের নিবন্ধন সরকার নবায়ন করেনি।

জাতীয় পার্টির সদস্য মুজিবুল হক বলেন, কিছু কিছু পুলিশ কর্মকর্তার দুর্নীতি নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। অনেক কর্মকর্তা গুলশান বনানীতে বিলাসী জীবনযাপন করেন। এদের কারণে সরকারের বদনাম হয়। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে সরকারের জন্য ভালো।

সংসদ সদস্যদের এ সমালোচনার জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, পুলিশ যারা দুস্কর্ম করে, তাদের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। একজন ডিআইজি থেকে শুরু করে অনেক সদস্য এখন জেলে। তিনি বলেন, বেসরকারি সংস্থা অধিকার হেফাজতের আন্দোলনের সময় বলেছিল হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। একটি আজব তথ্য প্রকাশ করেছিল। তাদের চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল। তারা একটি নামও দিতে পারেনি।

তিনি আরও বলেন, অধিকার নিবন্ধনের সময় শেষ হয়ে গেছে। নবায়নের আবেদন এনজিও ব্যুরো পায়, সেখান থেকে জননিরাপত্তা বিভাগে আসে। এখানে সেটি আসেনি।

স্বাস্থ্যখাতের সমালোচনা

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মঞ্জুরী দাবির আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির হারুনুর রশীদ অভিযোগ করেন, হাসপাতালে নিয়োগ ও ভর্তিতে এমনকি কেনাকাটায় ব্যাপক দুর্নীতি হচ্ছে।

জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য মুজিবুল হক বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অব্যবস্থাপনা দুর্নীতি অনেক বছর ধরেই চলে আসছে। চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর মানুষের ভরসা নেই। সবাই বিদেশে যাচ্ছে।

বিএনপির রুমিন ফারহানা বলেন, চিকিৎসার জন্য বিপুল সংখ্যক মানুষ বিদেশ যাচ্ছে। কারণ দেশে স্বাস্থ্যসেবার ওপর মানুষের অনাস্থা। এই খাত সরকারের চরম অমনোযোগ ও অব্যবস্থাপনার শিকার। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় থাকা উচিত। এগুলো বেসরকারি খাতে গেলে ব্যবসা হয়ে যায় মূল লক্ষ্য।

জাতীয় পার্টির রুস্তম আলী ফরাজী বলেন, ব্যাঙের ছাতার মতো দেশে ক্লিনিক হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। এগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেই, মান নেই। এতে জনগণ হয়রানির শিকার হচ্ছে। সংসদ ভবনের যে ক্লিনিক আছে, সেখানেও চিকিৎসার কিছুই নেই।

বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের বক্তব্যের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ১৭ কোটি মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থা দেশেই করা হয়েছে। কোভিডকালে সেটা দেখা গেছে, সবাই দেশেই চিকিৎসা নিয়েছে, কাউকে বাইরে যেতে হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে অনেকে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে আসে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হাসপাতালগুলোর জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী যন্ত্রপাতি কেনাকাটা হয়।

শিক্ষাখাত নিয়ে সমালোচনা

জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, আজকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কী হচ্ছে? ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকী বলেছেন, ডাক্তার, প্রকৌশলী বানাচ্ছি কিন্তু মানুষ বানাচ্ছি কতগুলো। দায়িত্ব তো উনিও এড়াতে পারেন না। উনি তো ঢাবির ভিসি ছিলেন, কিন্তু যার কোনো পাবলিকেশন, গবেষণা ছিলো না। ডক্টরেট ডিগ্রি নেই, শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ হয়েছে। সমস্যাটা ওইখানেই। যখন যে দল ক্ষমতায় আসবে, সেই দলের শিক্ষদের পদোন্নতি হবে। তাদের ছত্রছায়ায় এক শ্রেণির ছাত্রনেতারা মাস্তানন হয়ে যায়।

তিনি বলেন, নড়াইলে অধ্যক্ষ লাঞ্ছিত। জুতার মালা দিয়ে তাকে ঘুরানো হয়েছে। সাভারে একজন শিক্ষককে হত্যা করেছে। হত্যাকারী কিশোর গ্যাংয়ের কাছে দাদা বলে পরিচিত। পরিচালনা কমিটি তার আত্মীয়, আরেকজন শিক্ষক তাকে প্ররোচিত করেছেন, যে শিক্ষক ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি। শিক্ষার জায়গাটা নষ্ট হয়ে গেছে। শিক্ষার পরিবেশ দারুণভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক বলেন, বিবিএসের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতিবছর বাংলাদেশে প্রায় ১৮ থেকে ২০ লাখ নতুন চাকরিপ্রত্যাশী জব মার্কেটে প্রবেশ করে। তার মধ্যে দেশে-বিদেশে মিলিয়ে ৫ থেকে ৬ লাখের কর্মসংস্থান হয়। বাকি সবাই থাকে বেকার। এই বেকার শিক্ষিত বেকার। যে শিক্ষা ব্যবস্থায় বেকারত্ব তৈরি করে, কর্মবিমুখ যে শিক্ষা ব্যবস্থা, সেই শিক্ষা ব্যবস্থা আমরা কেন রাখব? কেন আমরা কর্মবিমুখ শিক্ষা ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করার চিন্তা করছি না।

বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিক্ষা র‌্যাংকিংয়ে আমরা কোন জায়গায় আছি? কল্পনা করা যায় পাঁচ হাজারের মধ্যেও নেই। ১৫ বছর একটানা ক্ষমতায়। যেভাবেই থাকেন না কেন। আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ের জন্য কোনো সরকারি বা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। এখানে গবেষণা ও প্রকাশনা নেই। বেসরকারি শিক্ষায় করারোপ প্রত্যাহারের দাবি জানান তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের দুর্নীতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মান নিচে নেমে গেছে। সব ক্ষেত্রে অবক্ষয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে আছি। এর কারণ জবাবদিহিতা ছাড়া কোনো দেশ এগিয়ে যেতে পারে না। মানসম্পন্ন শিক্ষা তৈরি করতে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর জন্য বলেন তিনি।

রুমিন ফারহানা বলেন, শিক্ষার ক্ষেত্রে মানটাই সমস্যা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার জরিপে দেখা যায়, শিক্ষার মানে ক্রমঅবনমন। র‌্যাংকিংয়ে ধস।