জগন্নাথ কলেজকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঘোষণা করা হয় ২০০৫ সালে। আর ২০১৮ সালে দ্বিতীয় বা নতুন ক্যাম্পাসের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ৯২০ কোটি ৯৪ লাখ ৩৯ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। তবে টাকা হাতে পাওয়ার তিন বছর পেরিয়ে গেলেও ২০০ একর জমি অধিগ্রহণের কাজটি শেষ করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এখন পর্যন্ত অধিগ্রহণ করা হয়েছে ১৮৮.৬০ একর জমি।

দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজও চলছে ধীরগতিতে। পাশাপাশি সেখানে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার জন্য চলছে একটি অস্থায়ী মাঠ তৈরির কাজ। শুধু ক্যাম্পাসের সীমানা প্রাচীর নির্মাণেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চায় আরও এক বছর। তবে কর্মরত শ্রমিকদের দাবি, দুই বছর লেগে যাবে সীমানা প্রাচীর করতে। ক্যাম্পাসের ভূমি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা ছিল ২০২০ সালের অক্টোবরে। সেই কাজের মেয়াদও এরই মধ্যে তিন দফা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। কাজের গতি বলে দেয়, তিন দফা বাড়িয়েও এ কাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হবে প্রকল্পটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কিংডম বিল্ডার্স।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে আগামী এক দশকেও বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস নির্মাণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী সাইফুদ্দীন বলেন, দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের উন্নয়নে প্রশাসনের নজর নেই বললেই চলে। কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকলে এত বড় কাজ তিন বছর কেন, দশ বছরেও শেষ হবে না।

দ্বিতীয় ক্যাম্পাসে সীমানা প্রাচীরের কাজ শুরু হলেও এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত করা হয়নি মহাপরিকল্পনা। এর আগে অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে মহাপরিকল্পনা তৈরি ও ক্যাম্পাস নির্মাণের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান 'আরবানা'কে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাদের একটি মহাপরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রদর্শনও করা হয়েছিল। তবে উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক ইমদাদুল হক নিয়োগ পাওয়ার পর মহাপরিকল্পনায় অসংগতি দেখিয়ে তিনি মহাপরিকল্পনা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াই বাতিল করেন। তবে উপাচার্য ইমদাদুল হকের দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় এক বছর পূর্ণ হলেও অগ্রগতি নেই দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের।

দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজের এমন ধীরগতির পেছনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের স্বেচ্ছাচারিতাকে দায়ী করেছেন একাধিক শিক্ষার্থী।

তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তাঁরা শুধু শুনেই যাচ্ছেন, কাজ হচ্ছে। এটা সেটা বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা চলছে।
দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের মহাপরিকল্পনার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, মহাপরিকল্পনার কাজের জন্য পাঁচটি প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দাখিল করেছে। তাদের মধ্য থেকে মূল্যায়ন করা হবে। আশাকরি, খুব দ্রুতই এটা নিয়ে বৈঠক করা হবে।

এদিকে কেরানীগঞ্জে নতুন ক্যাম্পাস নির্মাণের দোহাই দিয়ে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের 'অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প'। ২০১৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের দশকপূর্তির অনুষ্ঠানে এসে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ও একাডেমিক ভবন নির্মাণের প্রকল্প অনুমোদনের কথা জানিয়েছিলেন। ওই 'অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের' অধীনে কেরানীগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে একটি দশতলা ছাত্র হল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ভবন ভেঙে ২০ তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ২০১৬ সালে কেরানীগঞ্জে ক্যাম্পাস নির্মাণের ঘোষণায় আর এগোয়নি এই প্রকল্প। অথচ এতদিনে না হয়েছে দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের দৃশ্যমান অগ্রগতি, না হয়েছে বর্তমান ক্যাম্পাসের সামান্যতম উন্নয়ন। এসব কারণে নানামুখী সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম।

তবে বর্তমান ক্যাম্পাসে ছাত্রীদের জন্য ১৬ তলা একটি আবাসিক হল নির্মাণ করা হয়েছে। এ হলে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন ১ হাজার ২০০ ছাত্রী। ২০২০ সালের ২০ অক্টোবর হলের কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই তড়িঘড়ি করে প্রথমবারের মতো উদ্বোধন করেন সাবেক উপাচার্য। নতুন উপাচার্য এসে অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করেন। পুনরায় উদ্বোধন শেষে গত ১৭ মার্চ ছাত্রী হল চালু হয়।

বিভিন্ন সময় নানা আন্দোলন-সংগ্রামের পরও বিশ্ববিদ্যালয়ে সংকটগুলো সমাধান না হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। মেসে থাকতে গিয়ে টিউশনি বা অন্য উপার্জনের পথ বেছে নিতে হচ্ছে তাঁদের। এতে নষ্ট হচ্ছে শিক্ষার্থীদের মূল্যবান সময়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রিয়াদ হোসেন বলেন, হল না থাকায় আমাদের বাসা ভাড়া করে থাকতে হয়। নিজে উপার্জন করে চলতে অনেক সময় নষ্ট হয়। হল থাকলে আমরা এই সময়টা পড়ার টেবিলে দিতে পারতাম।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক কামালউদ্দিন আহমদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীরের কাজ চলছে। আমরা চাচ্ছি, দ্রুতই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো তৈরির কাজে হাত দিতে। এজন্য মহাপরিকল্পনার কাজ চলছে। আশা করি, দ্রুতই তা হয়ে যাবে।

ভূমি অধিগ্রহণ অসম্পূর্ণ থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, সামান্য কিছু ভূমি অধিগ্রহণ করতে বাকি রয়েছে। এটার অধিগ্রহণও প্রক্রিয়াধীন। খুব শিগগিরই তা সম্পন্ন হয়ে যাবে।