দীর্ঘদিন থেকে বাংলালিংক নম্বর ব্যবহার করেন বেসরকারি চাকরিজীবী মকবুল হোসেন। ইন্টারনেটের গতি কম ও ঘন ঘন কলড্রপ হওয়ায় তিনি গ্রামীণফোনের সিম কেনেন। কিন্তু এতেও সেবার মানে তেমন উন্নতি ঘটেনি বলে জানান তিনি। একই ধরনের অভিযোগ আনসার উদ্দীনের। তিনি রবির একটি নম্বর ব্যবহার করেন। আনসার বলেন, অফিস হোক বা বাসা, কথা বলতে হলেই বারান্দায় যেতে হয়। মোবাইল ফোনের সেবা নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগের অন্ত নেই। খোদ বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) পর্যবেক্ষণেও অপারেটরগুলোর সেবার নিম্নমানের বিষয়টি বারবার ধরা পড়েছে। মান অনুযায়ী সেবা দিতে না পারায় গত বুধবার দেশের সবচেয়ে বড় মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোনের সিম বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। সেবার মানে উন্নতি না এলে অন্য অপারেটরদেরও শাস্তির আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছে বিটিআরসি।

দেশে মোবাইল ফোন অপারেটর চারটি। গ্রামীণফোন, রবি আজিয়াটা, বাংলালিংক ও রাষ্ট্রীয় কোম্পানি টেলিটক।

অভিযোগের শেষ নেই :তথ্য বলছে, বিটিআরসিতে গ্রাহকদের যেসব অভিযোগ জমা পড়ে তার ৯০ শতাংশই অপারেটরদের সেবার মান নিয়ে। বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরের ১২ মাসে গ্রাহকের ৫২ কোটি ৫৯ লাখ মিনিট কল ড্রপ হয়েছে। অপারেটরগুলো ক্ষতিপূরণ দিয়েছে মাত্র ১১ কোটি ৪৫ লাখ মিনিট। ব্যাংক কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন বলেন, তাঁর গ্রামীণ নম্বরে একবারে একজনের সঙ্গে কথা শেষ করা যায় না। দু-তিন মিনিটের আলাপের জন্য কমপক্ষে দু'বার কল দিতে হয়। রাজিয়া সেতু তাঁর বুটিক ব্যবসার জন্য একটি ফেসবুক পেজ চালান। তিনি বাংলালিংকের ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। তিনি জানান, তাঁর বাসায় ইন্টারনেটের স্পিড খুবই কম। কাস্টমারের সঙ্গে চ্যাট করতে প্রায় সময়ই বারান্দায় যেতে হয়।
পিছিয়ে বাংলাদেশ :মোবাইল ইন্টারনেটে গতির দিক দিয়ে ভারত কিংবা নেপালের থেকে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক এবং প্রযুক্তি বিশ্নেষণকারী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ওকলার ২০২১ সালের ডিসেম্বরের প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বের ১৩৮টি বাংলাদেশের মধ্যে অবস্থান ১২৮তম।

বিটিআরসির পরীক্ষাতেও ফেল :দেশের মোবাইল অপারেটরদের সেবা নিয়ে গত বছর থেকে দেশজুড়ে পরীক্ষা শুরু করে বিটিআরসি। বিভিন্ন সময় প্রকাশিত এসব পরীক্ষার ফল থেকেও মোবাইল অপারেটরদের নিম্নমানের সেবার একটা চিত্র পাওয়া যায়।

গত ডিসেম্বরে ঢাকা বিভাগের ১৩ জেলার ৩৯টি উপজেলায় বিটিআরসি পরিচালিত ড্রাইভ টেস্টে গ্রামীণফোন, রবি ও টেলিটকে ফোর-জি সেবার নির্ধারিত নূ্যনতম ডাউনলোড গতি আসেনি। বিটিআরসি নির্ধারিত থ্রি-জির গতি সেকেন্ডে ২ মেগাবাইটের মধ্যে টেলিটকের পাওয়া গেছে সেকেন্ডে ১ দশমিক ৭৬ মেগাবাইট। ঢাকায় কলড্রপে এগিয়ে আছে টেলিটক। টেলিটকের গড় কল সাফল্যের হার ৯৬ দশমিক ৮ শতাংশ এবং কল ড্রপ রেট ২ দশমিক ৫৯ শতাংশ। বিটিআরসির নীতিমালা অনুযায়ী, টেলিকম অপারেটরদের কল সফলতার হার ৯৮ শতাংশ বা তার বেশি হওয়া উচিত। কল ড্রপ ২ শতাংশের কম হওয়া উচিত।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত বরিশাল বিভাগের টেস্ট ড্রাইভের ফল অনুসারে কোনো অপারেটরই ফোর-জির কাঙ্ক্ষিত মানের সেবা দিতে পারছে না। এ বিভাগে থ্রি-জি সেবার ক্ষেত্রে খারাপ ফল করেছে বাংলালিংক ও টেলিটক। বরিশালে কল কোয়ালিটির ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে রবি ও টেলিটক। গত ২৬ জানুয়ারি খুলনা বিভাগের টেস্ট ড্রাইভের ফল প্রকাশ করে বিটিআরসি। এতে দেখা যায়, ফোর-জির ক্ষেত্রে কোনো অপারেটরই বিটিআরসির নির্ধারিত মানের সেবা দিতে পারছে না। থ্রি-জির ক্ষেত্রে বিটিআরসির বেঞ্চমার্ক ২ এমবিপিএসের স্থানে রবির ছিল ১ দশমিক ৯৮ এমবিপিএস, বাংলালিংকের ১ দশমিক ৭৬ এবং টেলিটকের ১ দশমিক ৪৬ এমবিপিএস। এই বিভাগে কল কোয়ালিটিতে পিছিয়ে রয়েছে রবি ও টেলিটক।
কেন মিলছে না মানসম্মত সেবা :বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোবাইল অপারেটরগুলোর সেবার মান মূলত নির্ভর করে গ্রাহক অনুপাতে বেতার তরঙ্গ বা স্পেকট্রামের পরিমাণ, ফাইবার অপটিক্যাল নেটওয়ার্ক ও মোবাইল টাওয়ার-আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ অন্যান্য অবকাঠামোর ওপর।

গ্রামীণফোন মাত্র ১২ ভাগ, রবি ১৮ ভাগ, বাংলালিংক ৩১ ভাগ, টেলিটক ৬৪ ভাগ অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহার করছে। গত এপ্রিলে সর্বশেষ ফাইভ-জির তরঙ্গ নিলামের পর গ্রামীণফোনের মোট তরঙ্গ দাঁড়িয়েছে ১০৭ দশমিক ৪০ মেগাহার্টজে, রবির ১০৪ মেগাহার্টজ, বাংলালিংকের ৮০ মেগাহার্টজ ও টেলিটকের ৫৫ দশমিক ২০ মেগাহার্টজ। যদিও ফাইভ-জির তরঙ্গ সুবিধা এখনও সেভাবে ব্যবহূত হচ্ছে না। দেশে বর্তমানে মোবাইল গ্রাহক প্রায় ১৭ কোটি ৬৯ লাখ ৪০ হাজার। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের গ্রাহক প্রায় ৮ কোটি ২৪ লাখ ৮০ হাজার, রবির গ্রাহক ৫ কোটি ১৮ লাখ ১০ হাজার, বাংলালিংকের ৩ কোটি ৬৫ লাখ ৭০ হাজার ও টেলিটকের ৬০ লাখ ৯০ হাজার। গ্রাহকপ্রতি বেতার তরঙ্গের হিসাবে দেশের অপারেটরগুলো বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় এখনও অনেক পিছিয়ে আছে।

জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সমকালকে বলেন, গ্রাহক সন্তুষ্টিই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। দেশের ফোন অপারেটরগুলোর বিরুদ্ধে কলড্রপ, নেটের ধীরগতিসহ নানান অভিযোগ রয়েছে। বার বার সতর্ক করার পরও তারা সেবার মান বৃদ্ধি করছে না। তাই সবচেয়ে বড় অপারেটর হিসেবে প্রথমে গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অন্য অপারেটররাও যেন এ থেকে শিক্ষা নেয়। না হলেও তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিটিআরসির ভাইস চেয়ারম্যান সুব্রত রায় মৈত্র বলেন, অপারেটরদের সেবার মান উন্নত করতে হবে এর কোনো বিকল্প নেই। সেবার মান না বাড়লে সব অপারেটরদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানতে চাইলে গ্রামীণফোনের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, বিটিআরসি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার (আইটিইউ) সেবার মানদণ্ড অনুসরণ করে জিপি। ধারাবাহিকভাবে নেটওয়ার্ক ও সেবার মানোন্নয়নে তারা বিটিআরসির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে এবং নেটওয়ার্ক আধুনিকীকরণে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে।

বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান বলেন, তাঁরা সব সময় গ্রাহক সেবাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। এজন্য নিয়মিত বিনিয়োগ, নেটওয়ার্কে মান উন্নয়নের কাজ করে যাচ্ছেন। গ্রাহকের তুলনায় তরঙ্গ পর্যাপ্ত থাকায় তাঁরা মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে পারছেন।

রবির চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম বলেন, গ্রাহক সেবার মান উন্নয়নে তাঁরা প্রতিবছর ২০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করছেন। তাঁরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চেয়ে ভালো মানের গ্রাহক সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। এর পরও কিছু অবকাঠামোগত জটিলতা থেকে যাচ্ছে। ঢাকা শহরে টাওয়ার বসানোর জায়গা মিলছে না। ভবনের ভেতর যন্ত্রপাতি স্থাপনে বাধা রয়েছে। ফাইবার অপটিক বসানোর ক্ষমতা নেই। এসব বিষয়ে সরকারের সহযোগিতা পেলে আরও মানসম্মত সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।

কোথাও কোথাও মিলছে জিপির সিম :ভয়েস কল ও ইন্টারনেটে মানসম্মত সেবা দিতে না পারায় বুধবার গ্রামীণফোনের সিম বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা দেয় বিটিআরসি, যা বৃহস্পতিবার থেকে কার্যকর হয়েছে। তবে এখনও কোথাও কোথাও জিপির সিম পাওয়া যাচ্ছে। পাড়া-মহল্লার মোবাইল ফোনের দোকান, ফুটপাতের রিটেইল বিক্রেতাদের গতকালও সিম বিক্রি করতে দেখা গেছে রাজধানীর একাধিক জায়গায়। মতিঝিল, পল্টন, মালিবাগে একাধিক রিটেইল বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সিম বিক্রি করা যাবে না এমন কোনো নির্দেশ তাদের দেওয়া হয়নি। তবে গ্রামীণফোনের কাস্টমার কেয়ারগুলোতে সিমি বিক্রি বন্ধ রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে গ্রামীণফোনের পক্ষ থেকে বলা হয়, সিম বিক্রি হচ্ছে না। কারণ তাঁরা নতুন কোনো সিম চালুর তথ্য পাননি।