এ আগুন খুবই পলকা, আজকের মধ্যেই নিভে যাওয়ার কথা। কাল থেকে অন্তত আর কেউ তাতে ঘি ঢালবে না। সাদা বলের কিছু সাফল্য হয়তো ভুলিয়ে দেবে লাল বলে টাইগারদের করুণ পারফরম্যান্সের কথা। টক শোতেও কেউ আর ঘরোয়া ক্রিকেটে 'কিচ্ছু হচ্ছে না' বলবেন না, ফেসবুকের দেয়ালেও আর কেউ কাউকে ট্রল করবে না- ডিসেম্বরে ভারত না আসা পর্যন্ত প্রত্যেকেই ধৈর্য ধরেই থাকবে। টেস্ট ঘিরে অসন্তোষের আগুন ছাইচাপা পড়ে থাকবে ওই ডিসেম্বর পর্যন্ত। এটাও বাংলাদেশ ক্রিকেটেরই এক চলমান সংস্কৃতি- অন্য কোনো বড় ঘটনা না ঘটা পর্যন্ত সময়টুকুতে খালি মুখ বুজে থাকতে হবে! তাহলেই সবাই সব কিছু ভুলে যাবে। এ সত্য সবারই জানা। বিশেষ করে ক্রিকেটারদের, তাঁরা জানেন, টেস্টের ব্যর্থতা ভুলিয়ে দিতে পারে কাল থেকে শুরু হওয়া টি২০ সিরিজ কিংবা তার পরের ওয়ানডে সিরিজে।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের অস্থির এই সময়ে বিসিবি প্রধান নাজমুল হাসান পাপন দর্শক, সমর্থক এবং মিডিয়াকে যে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন। আদতে তাদের ধৈর্য ধরতেই হবে, কারণ বাংলাদেশ দল তাদের একান্তই আপন। চারদিক থেকে সমালোচনার তীর ধেয়ে আসায় অভিভাবকের মতোই ক্রিকেটারদের হয়ে ঢাল ধরেছেন নাজমুল হাসান। সমালোচনার স্রোতে তিনিও যদি গা ভাসাতেন তাহলে ক্রিকেটাররাও বিপন্ন বোধ করতেন। কিন্তু এটাও সত্য, যে ধৈর্যের ডাক তিনি দিয়েছেন, তা যদি ব্যাটাররাও শুনতেন তাহলে সবার মধ্যে এই অস্থিরতা তৈরিই হতো না। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজেই ক্যারিবীয় পেসারদের অফস্টাম্পের বাইরের বল চালাতে গিয়ে অনেকেই উইকেট দিয়েছেন। যদি তাঁরা একটু ধৈর্য প্রদর্শন করতেন, তাহলে অন্তত পাঁচ দিনের টেস্ট তিন-চার দিনেই শেষ হতো না। টেস্ট ম্যাচের একাদশে থাকা মানেই ৬ লাখ টাকা সম্মানী, সেখানে যদি তাঁরা তিন দিনই টিকতে না পারেন তাহলে ওই সম্মানীকেও বোধহয় অসম্মানিত করা হয়। বিসিবি প্রধান বলেছেন, 'আমার কাছে তামিম দেশের সেরা ওপেনার। মুশফিক সেরা ব্যাটার। তাই সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহকে নিয়ে বলার কিছু নেই।' তিনি যাঁদের নাম বলেছেন তাঁরা নিশ্চয় নিজ নিজ ক্ষেত্রে সেরা, কিন্তু তাঁদের দল কি সেরা? তাঁদের দল কি সেরা পারফরম্যান্স করে? এই 'দল' নিয়েই তো উদ্বিগ্ন থাকেন সমর্থকরা। কোনো নির্দিষ্ট ক্রিকেটারের কোনো ব্যক্তিগত অর্জন যদি দলের পরিকল্পনায় কাজে না আসে তাহলে সেই দায়ভার কার?

দলের পরিকল্পনায় ব্যাটারদের অধৈর্যের কথা নিশ্চয়ই নেই। কিন্তু দলের দুই সিনিয়র ক্রিকেটার তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসানের টেস্ট ইনিংসগুলো বিশ্নেষণ করলে দেখা যাবে, সেখানে অধৈর্যের ছাপ স্পষ্ট এবং তাঁরা সেটা করেই সাফল্য পেয়েছেন। তামিমের টেস্টে যে দশটি সেঞ্চুরি রয়েছে তার স্ট্রাইক রেটগুলো ছিল এমন- ২০৬ (৭৪.১০), ১৫১ (৮২.৫১), ১৩৩ (৬১), ১২৮ (৫২.৬৭), ১২৬ (৯৮.৬৩), ১০৯ (৩২.৮৩), ১০৯ (৬৩.৭৪), ১০৮ (৯৮.৭৩), ১০৯ (৭০.৭৪) এবং ১০৩ (১০৩)। তাঁর শতক গড়া ইনিংসের বেশিরভাগের স্ট্রাইক রেটই ছিল সত্তরের ওপরে। অনেকটা ওয়ানডে স্টাইলে। শুরু থেকেই চালিয়ে খেলেই তিনি যখন সেঞ্চুরি পান তখন কেন তিনি ডিফেন্সিভ খেলে ধৈর্যের পরিচয় দেবেন। একই অবস্থা সাকিব আল হাসানেরও। তাঁর টেস্টের পাঁচ সেঞ্চুরির স্ট্রাইক রেট ছিল এমন- ২১৭ (৭৮.৬২), ১৪৪ (৫৯.৫০ ), ১৩৭ (৭৬.১১), ১১৬ (৭২.৯৫), ১০০ (৭৭.৫১)। টেস্টকে তাঁরা ওয়ানডেরই লম্বা সংস্করণ বলে ধরে নিয়ে থাকেন। তো তাঁরা যখন এভাবে খেলেই 'দেশসেরা' তখন তাঁদের উত্তরসূরিরাও তো একই স্টাইলে খেলে সফল হতে চাইবেন। এটাই তো ক্রিকেট সংস্কৃতি। কিন্তু তফাতটা হলো সাকিব কিংবা তামিম আক্রমণাত্মক হয়ে টেস্ট ব্যাটিং করে রান না পেলেও পরের ম্যাচে টিকে থাকা নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। তাঁরা ম্যাচের পর ম্যাচ এভাবেই খেলে থাকেন। অন্যরা সেখানে ব্যর্থ হলেই কিন্তু বাদ পড়ার শঙ্কায় থাকতে হয়, একই সঙ্গে ফেসবুকের আদালতেও দাঁড়াতে হয়।

এবারের সিরিজেই ক্যারিবীয় ব্যাটার ক্রেগ ব্রাথওয়েট ২৭৪ বল খেলে ৯৪ রান করে দলের ভিত গড়েছিলেন। দলের প্রয়োজনে এই ভিত গড়াকেই তিনি তাঁর দায়িত্ব হিসেবে মনে করেছিলেন।

বাংলাদেশ দল যখন দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে দেশে ফেরার পর দলেরই এক সিনিয়র ক্রিকেটার তাঁর কাছের মানুষের কাছে আক্ষেপ করেছিলেন- 'কী সব প্রশ্ন করে সবাই। টেস্ট একটু খারাপ হওয়াতেই এমন করছে, তারা কি বুঝতে পারছে না ওয়ানডেতে আমরা কি বিরাট অর্জন করেছি।' এবার অন্তত বিমানবন্দরে এসে টেস্ট ব্যর্থতার প্রশ্ন শুনতে হবে না তাঁদের। কারণ মুখে 'শিক্ষা নিতে হবে' বললেও কবেই বা আমরা 'শিক্ষা' নিয়েছি। ধৈর্য তাই দর্শকদেরই ধরতে হবে।