মহাজনের কাছ থেকে মৌখিক চুক্তিতে তিন বিঘা জমি নিয়ে বর্গা চাষ করেছিলেন সবুজ দাস। চুক্তিতে বলা হয়, জমিতে ফসল ফলুক বা না ফলুক বিঘাপ্রতি পাঁচ মণ ধান অথবা ৩ হাজার টাকা দিতে হবে। সবুজের কপাল খারাপ। শিলাবৃষ্টি আর উজানের ঢলের পর এবারের বন্যায় সব ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। তাই গোলায় ধান ওঠেনি। কিন্তু মহাজনের ঋণ শোধ করতে হচ্ছে তাকে।

শুধু সবুজ দাসই নয়, নাসিরনগর উপজেলায় তার মতো ফুরেন্দ্র দাস, রবীন্দ্র দাস, কৃঞ্চ দাস, ফনিন্দ্র দাস, চন্দন দাস, শিশুকান্ত দাসসহ এমন হাজারো বর্গাচাষির ধান বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। তলিয়েছে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বিত্তবান কৃষকদের ধানও। এ উপজেলায় কার্ডধারী ৫৪ হাজারসহ প্রায় ৬০ হাজার কৃষক রয়েছেন। এর মধ্যে মাঝারি, ক্ষুদ্র ও ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যাই বেশি।

জানা যায়, নাসিরনগর উপজেলায় প্রায় পাঁচ হাজার বর্গাচাষি আছেন। তারা জমির চাষাবাদ থেকে শুরু করে বীজ, সার, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিকসহ সবকিছুর ব্যবস্থা করেন। কিন্তু উৎপাদিত ফসলের প্রায় অর্ধক দিয়ে দিতে হয় জমির মালিককে।

ভরাকুট ইউনিয়নের একটি গ্রাম পানিতে  ডুবে আছে।

কৃষকরা জানান, এর আগে চলতি বছরের ১১ এপ্রিল শিলাবৃষ্টি ও উজানের ঢলের কারণে বোরো ধান ও বাদাম নষ্ট হয়ে গেছে। এতে উপজেলার প্রায় দশ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে সরকারি প্রণোদনার জন্য সাড়ে ছয় হাজার কৃষকের তালিকা করে কৃষি অফিস। তার মধ্যে দুই হাজার দুইশ কৃষক প্রণোদনা পায়, বাকি চার হাজার ৪০০ কৃষক এখনও বঞ্চিত। ফলে মহাজনের ঋণ শোধ করতে অনেকে বিভিন্ন এনজিও থেকে ক্ষুদ্রঋণ নিয়েছেন। আবার সেই ঋণ শোধ করতেও কেউ কেউ ঋণ নিয়েছেন ব্যাংক থেকে। এর মধ্যেই নতুন করে এবার বোনা আমন ধান বন্যায় তলিয়ে গেছে।

কৃষি অফিস সূত্র বলছে, সম্প্রতি ভয়াবহ বন্যায় নাসিরনগরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কৃষিখাতে। ধান, বীজতলা ও মৌসুমী সবজিসহ সব ধরনের ফসল হারিয়েছেন কৃষকরা। বন্যার পানি না কমায় দুশ্চিন্তা আরও বাড়ছে তাদের। কারণ আগামী ভাদ্র মাসে আউশ ধানের বীজতলা তৈরির প্রকৃত সময়। আর শ্রাবণ মাসে তা জমিতে রোপণ করতে হবে। কিন্তু বন্যার পানি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় বীজতলা তৈরি নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সঠিক সময়ে বীজতলা তৈরি করতে না পারলে বছরজুড়ে খালি থাকবে আউশের মাঠ। এ অবস্থায় ঘুরে দাঁড়াতে সরকারি প্রণোদনা চান কৃষকরা।

উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, নাসিরনগরে এবার বন্যায় বোনা আমন ধানখেত তলিয়ে গেছে প্রায় দশ হাজার হেক্টর। কৃষক ক্ষতির শিকার হয়েছেন প্রায় ২৫ হাজার। পাটখেত পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে এক হাজার ২০০ হেক্টর। কৃষক ক্ষতির শিকার হয়েছেন প্রায় ৩ হাজার। রোপা আমন তলিয়ে গেছে ৬০ হেক্টর। কৃষক ক্ষতির শিকার হয়েছেন প্রায় ৮ হাজার। মৌসুমি শাক-সবজি তলিয়ে গেছে ৭০ হেক্টর। কৃষক ক্ষতির শিকার হয়েছেন প্রায় ৩ হাজার। সব মিলিয়ে উপজেলায় বন্যায় ক্ষতির শিকার হয়েছেন প্রায় ৩৯ হাজার কৃষক।

উপজেলার তিনটি কৃষি ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় নাসিরনগরে ১০ টাকা দিয়ে কৃষি ব্যাংকে হিসাব খুলেছেন আট হাজার ৭২০ জন। কিন্তু কৃষি ঋণ পেয়েছেন মাত্র ৩০৫ জন।

ত্রাণে চলছে তাদের জীবন।

চাপড়তলা ইউনিয়নের চাপড়তলা গ্রামের ছোট্ট মিয়া নামে একজন বর্গাচাষি কৃষক বলেন, অন্যের জমি চুক্তি নিয়ে ধান চাষ করছিলাম। ‘বন্যা সব লইয়া গেছে গা। এখন নিজে কিতা খামু, আর জমির মালিকের কীতা দিমু এই চিন্তায় আছি।’

চাতলপাড়ের পতইর গ্রামের জসিম উদ্দিন বলেন, স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছ থেকে চার বিঘা জমি নিয়ে বর্গা চাষ করেছিলাম। পানিতে সব তলিয়ে গেছে। জমির মালিককে প্রতি বিঘা জমিতে ৩ হাজার টাকা দিতে হয়। বন্যায় আমার খেতের সাথে ঘরও ভাসাই নিছে। এখন থাকি আশ্রয়ণ কেন্দ্রে। সাহায্য দিলে খাই, না দিলে এমনিই থাকি। এত লোকসান মাথায় নিয়ে আবার জমি চাষকরণ সম্ভব না। সরকারের কাছে অবিলম্বে প্রণোদনার দাবি তার।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আবু সাঈদ তারেক বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজলায় সবচেয়ে বেশি বোনা আমন ধান চাষ হয়। মৌসুমি সবজি চাষের ক্ষেত্রেও এগিয়ে নাসিরনগর। বন্যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নাসিরনগর উপজেলার কৃষক। এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকার কাজ শুরু করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, উপজেলায় মোট এক লাখ ৯ হাজার বিঘা বোনা ও রোপা আমন চাষযোগ্য জমি রয়েছে। আগামী মৌসুমে এসব জমি চাষ করতে বীজ প্রয়োজন হবে চার লাখ ৩৮ হাজার কেজি। প্রতি কেজি বীজের মূল্য ৪০ টাকা ধরে বাজারমূল্য প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকা। তবে বীজের কোনো সংকট হবে না।

এখনও পানিতে ডুবে আছে শত শত বিঘা ধানখেত।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. মোনাব্বর হোসেন বলেন, বর্তমান সরকার কৃষিবান্ধব সরকার। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে তাদের প্রণোদনার আওতায় আনা হবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া কৃষি অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) সুশান্ত সাহা সমকালকে জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করতে সরকারিভাবে নির্দেশনা আছে। নাসিরনগরেও বন্যার পানিতে বর্গাকৃষকসহ সকল ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা আমরা করছি। যাদের কৃষি কার্ড আছে তারা প্রণোদনা পাবে।

এর আগে শিলাবৃষ্টি ও উজানের ঢলের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সাড়ে চার হাজার কৃষকের প্রণোদনার তালিকা করার পরও সহায়তা পায়নি কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা কৃষি অফিসের প্রণোদনা ছিল না, জেলা প্রশাসক নিজের উদ্যোগে কিছু চাল সহায়তা দিয়েছিলেন।