হঠাৎ করে দেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট বেড়ে গেছে। রাজধানীতেই দিনরাতে ৪ থেকে ৫ বার বিদ্যুতের লোডশেডিং হচ্ছে। গ্রাম-মফস্বলে দিনরাতে ৮ থেকে ১০ বার বিদ্যুৎ থাকছে না। এদিকে গ্যাসের সংকট বাড়ায় বাসাবাড়ি ও শিল্পকারখানায় ভোগান্তি বেড়েছে। সকাল থেকেই চুলা জ্বলছে না অধিকাংশ বাড়িতে। কলকারখানাগুলোয় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গত ১৫ দিনে গ্যাস সরবরাহ কমেছে ৩৫ কোটি ঘনফুট। গ্যাস সংকটে ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ গ্যাস ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হওয়া নিয়ে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

সংকটের কারণ: সূত্র জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কেনা বন্ধ করেছে সরকার। এ জন্য দেশে গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে আবাসিক শিল্পকারখানাসহ বিদ্যুৎ খাতে। গত জুনের শেষ সপ্তাহে স্পট মার্কেট থেকে যে এলএনজি কিনতে ইউনিট প্রতি (এমএমবিটিইউ) প্রায় ২৫ ডলার খরচ হয়েছিল, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ ডলারে। লোকসান কমাতে আপাতত স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনছে না সরকার।

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ কমেছে: পেট্রোবাংলার তথ্য থেকে জানা যায়, গত ১৫ দিনে দেশে গ্যাসের সরবরাহ কমেছে দিনে ৩৫ কোটি ঘনফুট। গত ২০ জুন পেট্রোবাংলা দিনে ৩১৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করে। এর মধ্যে এলএনজি থেকে পাওয়া গেছে ৮৩ কোটি ঘনফুট। ওই দিন বিদ্যুৎ উৎপাদনে ১০৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হয়। তার পরও গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ ছিল এক হাজার ২৬৯ মেগাওয়াট। গত ৩০ জুন পেট্রোবাংলা সরবরাহ করে ২৯৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস। এর মধ্যে এলএনজি থেকে মেলে প্রায় ৬২ কোটি ঘনফুট। গতকাল রোববার গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে ২৮২ কোটি ঘনফুটে। এলএনজি থেকে পাওয়া যায় মাত্র ৪৯ দশমিক ৬ কোটি ঘনফুট। এ দিন বিদ্যুৎ উৎপাদনে দেওয়া হয় ৯৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস। গ্যাস সংকটে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হয়েছে। সরকারি তথ্যমতে সারাদেশে ৮১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। তবে বিতরণ কোম্পানিগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লোডশেডিংয়ের পরিমাণ প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট।

ঢাকা বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে থাকা ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী বিকাশ দেওয়ান সমকালকে জানান, দুই-তিন দিন ধরে বিদ্যুৎ কম পাচ্ছেন। তাই লোডশেডিং করতে হচ্ছে। জানা গেছে, সংস্থাটি ১৬৫০ মেগাওয়াট চাহিদার মধ্যে ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম পাচ্ছে। এতে আধাঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণকারী অন্য সংস্থা ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী কাওসার আমীর আলী সমকালকে বলেন, তাঁদের সর্বোচ্চ চাহিদা ৯৬০ মেগাওয়াট। তাঁরা ১০০ থেকে ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম পাচ্ছেন। এলাকাভেদে তিন থেকে চারবার আধাঘণ্টা থেকে ১ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে থাকা ওজোপাডিকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আজাহারুল ইসলাম জানান, তাঁরাও বিদ্যুৎ কম পাওয়ায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তাদের সর্বোচ্চ চাহিদা ৬৪০ মেগাওয়াট। উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে থাকা নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকিউল ইসলাম সমকালকে জানান, তাঁরা ৯০ থেকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম পাচ্ছেন।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান জানান, তাঁরা দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নানা পদক্ষেপ নিয়েছেন। শিগগির পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

প্রতিমন্ত্রীর স্ট্যাটাস: গতকাল নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, গ্যাসের স্বল্পতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে অনেক জায়গাতেই বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন পুনরায় স্বাভাবিক হবে। তিনি বলেন, যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের উচ্চমূল্য ও সরবরাহ সব দেশকেই সমস্যায় ফেলেছে। বিষয়টি ্বাংলাদেশকেও বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। পোস্টে তিনি বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হয়ে সাময়িক অসুবিধার জন্য আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেন।

ভোগান্তি চরমে: জানা যায়, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ময়মনসিংহ এলাকার পোশাকসহ অন্যান্য কারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শিল্পমালিকরা জানান, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে দিনের অধিকাংশ সময় কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সময়মতো বিদেশে পণ্য পাঠানো সম্ভব নাও হতে পারে। ফলে রপ্তানি অর্ডার বাতিলের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

আবাসিকেও গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে। রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় দিনরাতের অধিকাংশ সময় চুলা জ্বলছে না। গোপীবাগের বাসিন্দা মেহেরুন নেছা বলেন, সকালে অফিসে যাওয়ার তাড়া থাকায় ভোরে উঠে তাড়াহুড়া করে রান্না করতে হয়। এমনিতে সকাল ১১টার পর গ্যাসের চাপ কমে যায়। বিকেলের দিকে চাপ বাড়ে। গত তিন দিন সকাল থেকেই চুলা জ্বলার মতো গ্যাস মিলছে না।

গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় সন্ধ্যায়ও এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। মগবাজার এলাকার বাসিন্দা ইন্দ্রজিৎ সরকার জানান, বাসায় নবজাতক রয়েছে। গত দুই দিন থেকে দিনে তিন-চারবার বিদ্যুৎ যাচ্ছে। গরমের কারণে তার কয়েক মাস বয়সী সন্তান অসুস্থ হয়ে পড়েছে। রাজধানীর আশকোনায় শনিবার রাত থেকে লোডশেডিং বেড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় এক বাসিন্দা।

ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে দিনের অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না বলে জানিয়েছেন সমকাল প্রতিনিধি। ময়মনসিংহ, বরিশালসহ দেশের অন্য অঞ্চলেও তীব্র লোডশেডিংয়ের তথ্য পাওয়া গেছে।

রংপুর অফিস জানায়, রংপুর বিভাগে তীব্র লোডশেডিংয়ে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। দিনরাতে ৮ থেকে ১০ বার থাকছে না বিদ্যুৎ। একবার গেলে কমপক্ষে এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ আসছে। গত ক'দিন ধরে রংপুর বিভাগে তীব্র তাপদাহ অনুভূত হচ্ছে। বাইরে প্রচণ্ড গরম ও ঘরে বিদ্যুৎ না থাকায় জ্বর, সর্দি, কাশিসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা বিপাকে পড়েছেন। বিদ্যুতের অভাবে কলকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।