প্রসাধনী পণ্য 'হেনোলাক্স ক্রিম' একসময় ছিল তুমুল জনপ্রিয়। সে সময় নামকরা বেশ কয়েকজন মডেল ও অভিনেতা প্রতিষ্ঠানটির পণ্যের বিজ্ঞাপন করে সাড়া ফেলেন। এসব এখন অতীত। হেনোলাক্স কোম্পানি এখন 'ভাঙা হাট'। দীর্ঘদিন এই প্রতিষ্ঠানের কোনো পণ্য নেই বাজারে। পুরোনো সুনাম বিক্রি করেই বিনিয়োগের কথা বলে অনেকের কাছ থেকে টাকা হাতিয়েছেন কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নুরুল আমিন ও তাঁর স্ত্রী প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ফাতেমা আমিন। প্রতি মাসে লভ্যাংশ দেওয়ার টোপ ফেলে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ ছাত্রলীগ শাখার সাবেক সভাপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সদস্য গাজী আনিসুর রহমান হেনোলাক্সে ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। লভ্যাংশসহ তাঁর পাওনা ছিল ৩ কোটি টাকার বেশি। বারবার পাওনা টাকা চেয়ে না পেয়ে এবং ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েনের কষ্টে গত সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাব চত্বরে নিজের শরীরে আগুন দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান আনিসুর। শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে গতকাল মঙ্গলবার সকাল সোয়া ৬টার দিকে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে তিনি হারেন।

আনিসের মৃত্যুর পর গতকাল শাহবাগ থানায় মামলা করেন তাঁর ভাই নজরুল ইসলাম। আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে করা এই মামলায় হেনোলাক্সের মালিক নুরুল ও তাঁর স্ত্রী ফাতেমাকে আসামি করা হয়। গতকাল রাতে নুরুল ও তাঁর স্ত্রী ফাতেমাকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় র‌্যাব। সংস্থাটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, উত্তরা থেকে দু'জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আজ বুধবার এ ব্যাপারে সংবাদ সম্মেলন করা হবে।
এদিকে নিজের শরীরে আগুন দেওয়ার আগে টাকার দাবিতে মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন ও মামলা করেছিলেন আনিসুর। ফেসবুকে হেনোলাক্সের প্রতারণার বিরুদ্ধে স্ট্যাটাস দিয়েও সংশ্নিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। এত কিছুর পরও কারও টনক নড়েনি। টাকা না পাওয়ার হতাশা থেকে আত্মহননের পথ বেছে নেন তিনি।

আনিসুরের ভাই আবদুর রশিদ বলেন, 'আমার ভাইয়ের মতো আরও অনেককে পথে বসিয়েছেন হেনোলাক্সের মালিক। মুনাফার লোভ দেখিয়ে তাঁর কোম্পানিতে টাকা বিনিয়োগ করতে বাধ্য করা হয়। এরপর টাকা ফেরত চাইলে মিথ্যা মামলা ও হয়রানি করা হতো।'

পুলিশের রমনা বিভাগের এডিসি মোহাম্মদ শাহেন শাহ বলেন, প্রেস ক্লাব চত্বরের ঘটনার সময়ের সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। মামলার পর পুরো ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে।

ঠকবাজ হেনোলাক্স : হেনোলাক্স ও এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আমিন হারবালের ওয়েবসাইটে দাবি করা হয়েছে, তাদের কোম্পানির একশর বেশি পণ্য বাজারে রয়েছে। ১৯৮৯ সালে হেনোলাক্স কোম্পানির যাত্রা। আর আমিন হারবাল বাজার আসে ২০০৮ সালে।
হেনোলাক্সের ওয়েবসাইটে বিভিন্ন পণ্যের ছবিসহ বিজ্ঞাপন দেওয়া রয়েছে। হেনোলাক্স ক্রিম ছাড়াও রয়েছে রেডি টি, ম্যাংগো জেল, ভিটা, চাটনি, নুডলস ও সাবান। এ ছাড়া কোম্পানির ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিও রয়েছে ওয়েবসাইটে। এতে বলা হয়, 'আমিন ফুড প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের পণ্য বাজারজাত করতে সারাদেশে ডিলার ও ডিপো নিয়োগ করা হবে।'

মানববন্ধন :হেনোলাক্সের নুরুল ও তাঁর স্ত্রী ফাতেমার শাস্তির দাবিতে গতকাল দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছেন স্বজনরা। তাঁরা বলছেন, এটি আত্মহনন নয়, হত্যাকাণ্ড। হত্যাকারী নুরুল আমিনের ফাঁসি দাবি করেন তাঁরা।

হেনোলাক্সের কার্যালয়ে তালা :হেনোলাক্সের প্রধান কার্যালয় পুরানা পল্টনের স্কাই ভিউ হেনোলাক্স সেন্টারে। হোল্ডিং ৩/১। ১০ তলা ভবনের তৃতীয় তলায় হেনোলাক্সের কার্যালয়। গতকাল দুপুর আড়াইটায় কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, কলাপসিবল গেটে তালা ঝুলছে। ভবনটির এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে গাজী আনিসের আত্মহনন-চেষ্টার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরই ওই কার্যালয় বন্ধ করে কর্মচারীরা চলে যান। গতকাল সেটি আর খোলা হয়নি। সোমবার দুপুরের আগে হেনোলাক্সের কর্ণধার নুরুল আমিন কার্যালয়ে এসেছিলেন। কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে যান।

খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, হেনোলাক্সের প্রধান অফিসে তেমন কার্যক্রম নেই। জনবল মাত্র দু'জন। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে থাকা একটি নম্বরে ফোন করলে অফিস সহকারী পরিচয় দিয়ে আব্দুল মালেক নামে একজন বলেন, হেনোলাক্সের বিভিন্ন পণ্য ছিল একসময় বাজারে ছিল। এর কারখানা ছিল কদমতলীতে। বর্তমানে প্রায় সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। আমিনের গ্রামের বাড়ি নরসিংদীতে।

নরসিংদীর শিবপুরের জয়নগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নাদিম সরকার বলেন, নুরুল আমিন একসময় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ছিলেন। পরিবারও তেমন সচ্ছল ছিল না। আশির দশকের মাঝামাঝি হেনোলাক্স প্রতিষ্ঠার পর দ্রুত সবকিছু বদলে যায়। ঢাকা ও নরসিংদীতে জায়গা-জমি কেনেন। শুনেছি হেনোলাক্স লোকসানের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, স্কাই ভিউ হেনোলাক্স সেন্টারের জমির মালিক নুরুল আমিন। স্কাই ভিউ নামের ডেভেলপার কোম্পানি ১০তলা ভবনটি তৈরি করে ৫০ শতাংশ মালিকানা চুক্তিতে। নিচতলায় দোকানপাট। বাকি ৯ তলায় ৩৬টি ফ্ল্যাটের অর্ধেক মালিক স্কাই ভিউ ও বাদ বাকি ফ্ল্যাটের মালিক আমিন।

দাফন কুষ্টিয়ায় :গতকাল দুপুরের পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়। বিকেল ৪টায় স্বজনরা লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার উদ্দেশে রওনা হন। এর আগে গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল-আলম হানিফ বার্ন ইনস্টিটিউটে গিয়ে গাজী আনিসের স্বজনদের সান্ত্বনা দেন। এ সময় তিনি বলেন, গাজী আনিসের মৃত্যুর ঘটনায় দোষীদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।

মেনে নিতে পারছেন না কুষ্টিয়ার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা :কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, ৯০-এর রাজপথ কাঁপানো সাবেক ছাত্রলীগ নেতা গাজী আনিসুরের আত্মহনন মেনে নিতে পারছেন না তাঁর সেই সময়কার সহকর্মী ও রাজনৈতিক সহযোদ্ধারা। তাঁর মতো দৃঢ়চেতা একজন মানুষ নিজের শরীরে আগুন দিয়ে এমন কাজ করতে পারে- এটা তাঁদের বিশ্বাস হচ্ছে না। ঘটনার পেছনের কারণ উদ্ঘাটন করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তাঁদের।