ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে এসে আত্মহননের পথ বেছে নিলেন খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) খন্দকার লাবণী আক্তার (৩৬)। বুধবার রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মাগুরা জেলার শ্রীপুরের সারঙ্গদিয়া গ্রামের নানাবাড়িতে গলায় ওড়না পেঁচানো অবস্থায় তাঁর ঝুলন্ত লাশ পাওয়া যায়। পাঁচ দিনের ছুটিতে তিনি গ্রামের বাড়ি মাগুরায় গিয়েছিলেন। লাবণী শ্রীপুরের ৬ নম্বর কাদিরপাড়া ইউনিয়নের বরালদিহ গ্রামের শফিকুল আযমের মেয়ে। তিনি বিসিএস ৩০ ব্যাচের কর্মকর্তা। এমন পদমর্যাদার পুলিশ কর্মকর্তার আত্মহত্যার ঘটনা নজিরবিহীন।

এদিকে, লাবণীর মৃত্যুর সাত ঘণ্টার মধ্যে তাঁর সাবেক দেহরক্ষী পুলিশ কনস্টেবল মাহমুদুল হাসানও আত্মহত্যা করেন। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টায় মাগুরা পুলিশ লাইন্স ব্যারাকের ছাদে নিজ নামে ইস্যু করা অস্ত্র দিয়ে থুতনির নিচে গুলি করে আত্মহত্যা করেন তিনি। আর অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই পুলিশ সদস্যের আত্মহননের ঘটনা চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। এ দুটি ঘটনা একই সূত্রে গাঁথা কিনা, তা নিয়ে অনেকের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। 'অসম সম্পর্কে' তাঁরা জড়িত ছিলেন কিনা, তা নিয়েও আছে আলোচনা। পুলিশের একটি দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, সম্পর্কের জটিলতা থেকে তাঁরা এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

মাহমুদুল হাসান পুলিশের চাকরিতে যোগদান করেন বছর তিনেক আগে। সারদায় প্রশিক্ষণ শেষে খুলনায় তাঁর পোস্টিং হয়। যোগদানের পর তিনি দায়িত্ব পান লাবণীর দেহরক্ষী হিসেবে কাজ করার। দেড় মাস আগে মাহমুদুলের পোস্টিং হয় মাগুরায়। মাহমুদুলের গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার পিপুলবাড়িয়ায়। তবে তাঁদের পরিবার বর্তমানে শহরের নতুন কমলাপুর এলাকায় বসবাস করছে। মাহমুদুলের বাবা মো. এজাজুল হক খান চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশের কনস্টেবল হিসেবে কর্মরত।

লাবণীর বাবা খন্দকার শফিকুল আজম সমকালকে বলেন, তাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে নানা কারণে দ্বন্দ্ব ছিল। তবে কী নিয়ে এই দ্বন্দ্ব, তা আমাকে বলেনি। কেন আত্মহত্যা করেছে বলে মনে করেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, স্বামীর সঙ্গে মনোমালিন্য ছিল, তা না হলে লাবণী আত্মহত্যা করল কেন?

এডিসি লাবণী ও তাঁর সাবেক দেহরক্ষী পুলিশ কনস্টেবল মাহমুদুলের আত্মহত্যার মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কিনা, সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা তাঁর জানা নেই। পুলিশ কনস্টেবল কেন আত্মহত্যা করেছেন, এটা বলতে পারব না।

মাহমুদুলের বাবা এজাজুল হক খান বলেন, 'মাহমুদুলের মধ্যে কখনও কোনো হতাশা দেখিনি। সে কেন আত্মহত্যা করল, বিষয়টি বুঝতে পারছি না। বাড়িতে নিয়মিত কথাও হতো তার।' এদিকে পুলিশ সদরদপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানান, দুটি ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে।
জানা গেছে, পুলিশের এডিসি লাবণীর স্বামী তারেক আবদুল্লাহ বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক (এডি) হিসেবে কর্মরত। তাঁদের ৮ ও ৪ বছর বয়সী দুটি কন্যাসন্তান রয়েছে। বছর দশেক আগে পারিবারিকভাবে লাবণীকে বিয়ে করেন তিনি। অবশ্য তাঁর শ্বশুরপক্ষের লোকজন ফরিদপুরে বসবাস করেন। লাবণীর স্বামী তারেক আবদুল্লাহ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ভারতে চিকিৎসাধীন। গতকাল তাঁর দেশে ফেরার কথা ছিল।

২০১৯ সালের ৩ জুন খুলনা মহানগর পুলিশে যোগদান করেন লাবণী। শুরুতে তাঁকে গোয়েন্দা বিভাগে এডিসি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে তাঁকে পুলিশ লাইনে এডিসি (ফোর্স) হিসেবে বদলি করা হয়। চলতি বছরের শুরুতে তাঁকে আবারও গোয়েন্দা বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুতে সহকর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

খুলনা মহানগর পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ২০২০ সালে লাবণীর স্বামী ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। স্বামীকে ভারতের চেন্নাইতে নিয়ে অপারেশন, কেমোথেরাপি চিকিৎসার সব কাজ তিনি একাই সামলেছেন। করোনার ওই সময় ভারতে আসা-যাওয়া কঠিন ছিল। ওই সময় নিজের ছুটি, দু'জনের ভিসা, ভারতে যাওয়া-আসার অর্থ জোগাড়ে কঠিন সময় পার করেছেন লাবণী।

কেএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম) এস এম ফজলুর রহমান সমকালকে বলেন, চেন্নাইতে চিকিৎসার বিপুল ব্যয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতেন লাবণী। তাঁর স্বামী বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা হলেও সেখান থেকে বেশি সহায়তা পাননি। কেএমপির কর্মকর্তারা তাঁর স্বামীর চিকিৎসার ব্যয়ের বড় একটা অংশ বহন করেছেন। এ ছাড়া পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্ট ও পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনও সহযোগিতা করেছে। কিন্তু দুই বছর ধরে ক্যান্সারের মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসা খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন লাবণী। গত কয়েক মাসে আর্থিক কষ্টে পড়ে যান। গত মাসের বাড়ি ভাড়ার টাকাও বকেয়া পড়ে ছিল তাঁর।

গত ১৭ জুলাই এক দফা আত্মহত্যার চেষ্টা করেন লাবণী। অতিরিক্ত কাশির সিরাপ খেলে ওই দিন দুপুরে অসুস্থ অবস্থায় খুলনার বেসরকারি সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। হাসপাতালের রেজিস্টারে দেখা গেছে, ১৭ জুলাই দুপুর ১টা ৫৩ মিনিটে অচেতন অবস্থায় তাঁকে জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। ১৮ জুলাই রাত ১২টা ৫৩ মিনিটে তিনি হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নেন। পরদিন থেকে তাঁকে পাঁচ দিনের ছুটি দিয়ে বাড়িতে পাঠানো হয়েছিল।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. মাসুদুর রহমান ভূঁইয়া সমকালকে জানান, লাবণীর স্বামী ক্যান্সারে আক্রান্ত। দুবার তাঁর অপারেশন হয়েছে। লাবণীর স্বামী তাঁকে মাঝেমধ্যে বলতেন, আমি বেশি দিন বাঁচব না। বাচ্চা দুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতেন। এটা লাবণী মেনে নিতে পারতেন না। তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। সে কারণে গত সপ্তাহেও একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। তখন তাঁকে খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। চিকিৎসা শেষে পাঁচ দিনের ছুটিতে বাড়ি যান লাবণী।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার বলেন, এডিসি লাবণী ও কনস্টেবল মাহমুদুল হাসানের আত্মহত্যার সঙ্গে কোনো যোগসূত্র নেই। এর মধ্যে যোগসূত্র খোঁজা অনৈতিক হবে।

তবে কেউ কেউ এমন প্রশ্নও তোলেন- হতাশা থেকে আত্মহত্যার প্রবণতা জানার পরও কেন তাঁকে কাউন্সেলিং করানোর ব্যবস্থা নেওয়া হলো না। এ ছাড়া পরিবারের দায়িত্বশীল সদস্যদের কাছে লাবণীর মানসিক অবস্থার বিষয়টি স্পষ্ট করা উচিত ছিল।

এ ব্যাপারে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার বলেন, গত সপ্তাহে আত্মহত্যার চেষ্টা করলে তাঁকে খুলনার একটি হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখানো হয়েছে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলার জন্য পুলিশ কর্মকর্তারা তাঁকে বুঝিয়েছিলেন।

এদিকে পুলিশ কনস্টেবল মাহমুদুল হাসানের চাচা শওকত আলী খান বলেন, 'সর্বশেষ ঈদে মাহমুদুল বাড়িতে এসেছিল। মাহমুদুল এখনও বিয়ে করেনি। সে আত্মহত্যা করতে পারে- এটা বিশ্বাস হয় না। কারণ, মাহমুদুল ভদ্র ও ভালো ছেলে ছিল। সে কেন আত্মহত্যা করল, তা খতিয়ে দেখা উচিত। নিছকই একটি আত্মহত্যা, নাকি অন্য কোনো বিষয় আছে- সেটাও পরিস্কার হওয়া প্রয়োজন।