অনলাইনে লুডু বা হেড-টেল খেলার মাধ্যমে বাজি ধরা যায়। প্রতিবার মাত্র ২০ টাকা। জিতলে জুয়াড়ি পাবেন ৩৮ টাকা, আর হারলে অ্যাকাউন্ট থেকে ২০ টাকা গায়েব। শুরুতে বেশ মজার মনে হলেও আসলে এটি ভয়ংকর এক ফাঁদ। কারণ, পুরো 'গেম-প্ল্যান' এমনভাবে তৈরি যে, জুয়াড়ি দু-একবার জিতবেন, কিন্তু এতে আসক্ত হয়ে খেলা চালিয়ে যাওয়া মানে সর্বস্ব খোয়ানো। এভাবে বহু মানুষ নিঃস্ব হয়েছেন, জুয়ার টাকা জোগাতে খুনোখুনির ঘটনাও ঘটেছে। বিপরীতে জুয়ার সাইট পরিচালনাকারীরা হাতিয়েছে কোটি কোটি টাকা। অনলাইন জুয়ার জগতের তেমনই এক 'গুরু' সবুজ সরকার। এসএসসি পাসের বিদ্যা নিয়ে এই যুবক গত পাঁচ বছরে ৫ কোটি টাকা হাতিয়েছে। সম্প্রতি এক সহযোগীসহ তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ।

ডিবি কর্মকর্তারা বলছেন, এতদিন বিদেশ থেকে অনলাইন জুয়ার সাইট পরিচালনার তথ্য পাওয়া গেছে। সেসব সাইটের বাংলাদেশি এজেন্টদের আনা হয়েছে আইনের আওতায়। তবে এবারের ঘটনা ভিন্ন। গ্রেপ্তার সবুজ দেশে বসেই বিপুলসংখ্যক জুয়ার সাইট চালিয়ে আসছিল। জামালপুরের সরিষাবাড়ী থানার পশ্চিমপাড়া গ্রামের তরুণদের বড় অংশই এখন জুয়ার সাইট পরিচালনায় যুক্ত। এর আগে ফরিদপুরের ভাঙ্গা ও মধুখালীতে যেভাবে অনলাইন ব্যাংক গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণার ঘাঁটি গড়ে উঠেছিল, তেমনি পশ্চিমপাড়ায় বিস্তার লাভ করেছে অনলাইন জুয়া।

তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রচুর মানুষ অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়েছেন। কৌতূহল থেকে এতে যুক্ত হলেও পরে তা নেশায় পরিণত হচ্ছে। আর আসক্তির সুযোগ নিয়ে তাদের সর্বস্বান্ত করে ছাড়ছে জুয়ার সাইট পরিচালনাকারীরা। এর প্রভাবে নানারকম অপরাধও সংঘটিত হচ্ছে। গত ১৩ মার্চ রাজধানীর মধ্য বাড্ডায় ব্যক্তিগত গাড়িচালকের হাতে খুন হন সেভেন রিংস সিমেন্ট কোম্পানির একজন ব্যবস্থাপক। অনলাইন জুয়ায় নিঃস্ব হয়ে টাকা পাওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁকে খুন করে গাড়িচালক। আবার অনলাইন জুয়ায় বাধা দেওয়ায় গত বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের বাতিয়া পূর্বপাড়া গ্রামে স্ত্রীকে হত্যা করে স্বামী। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে অনলাইন জুয়া নিয়ে প্রায়ই মারামারির ঘটনা ঘটছে। এসব চক্রের সদস্যরা অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করছে।

ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের ওয়েব বেজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের ইনচার্জ অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. আশরাফউল্লাহ জানান, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে রমনা থানায় করা একটি মামলা তদন্তের একপর্যায়ে এই চক্রের সদস্যদের অবস্থান সম্পর্কে জানা যায়। এরপর গত ৫ জুলাই জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে অভিযান চালিয়ে ১৮০টি জুয়ার সাইটের মালিক সবুজ সরকার ও তার এজেন্ট মেহেদী হাসান ওরফে রনিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে গুরুত্বপূর্ণ নানা তথ্য।

ডিবির এই কর্মকর্তা জানান, সাইবার নজরদারির একপর্যায়ে অনলাইন জুয়ার লোভনীয় বিজ্ঞাপন দেখে সে ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া হয়। ওয়েবসাইটে ঢুকে বিভিন্ন ধরনের জুয়া খেলার আয়োজন দেখা যায়। খেলার জন্য একজন ব্যবহারকারীকে ওই সাইটে ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়। সেইসঙ্গে সাইটে দেওয়া অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পাঠিয়ে অ্যাকাউন্টে টাকা জমা করতে হয়। কমপক্ষে ৩০০ টাকা জমা করতে হয় এবং সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জমা করা যায়। প্রতিবার স্ট্রাইকে বা বাজি ধরতে ২০ টাকা লাগে।

ডিবি সূত্র জানায়, জুয়ার সাইট পরিচালনার জন্য সবুজ ১ হাজার টাকায় একটি ডোমেইন কিনে ১৫ হাজার টাকা দিয়ে সাইটটি ডেভেলপ করে নিত। এরপর সাইটটি এলাকার লোকজনের কাছে ২০-২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করত। তবে শর্ত অনুযায়ী জুয়ার সাইট পরিচালনাকারীরা তাদের লাভের ৫০ শতাংশ অর্থ তার হাতে তুলে দিত। বিনিময়ে সব সাইটের অ্যাডমিন প্যানেল রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ছিল তার। গত পাঁচ বছরে এই চক্রের ৫ কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য মিলেছে।