দেশে জনসংখ্যা বাড়ার হার কমছে। স্বাধীনতার পর থেকেই এ প্রবণতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে জনমিতি। গতকাল বুধবার সবশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, বছরে ১ দশমিক ২২ শতাংশ হারে জনসংখ্যা বাড়ছে। ১৯৮১ সালে করা দ্বিতীয় জনশুমারিতে পাওয়া জনসংখ্যা বাড়ার হারের চেয়ে এ বৃদ্ধি অর্ধেকেরও কম। ওই জরিপে বছরে জনসংখ্যা বাড়ার হার ছিল ২ দশমিক ৮৪ শতাংশ।

'জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২' নামে প্রাথমিক প্রতিবেদন গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশে মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬১৬ জন। ১৯৭৪ সালে করা প্রথম জনশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ১৪ লাখ। অর্থাৎ ৪৮ বছরের ব্যবধানে দেশে জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি দাঁড়িয়েছে। এবারের মোট জনসংখ্যার মধ্যে ৮ কোটি ১৭ লাখ ১২ হাজার ৮২৪ জন পুরুষ, আর ৮ কোটি ৩৩ লাখ ৪৭ হাজার ২০৬ জন নারী। তৃতীয়লিঙ্গের সংখ্যা ১২ হাজার ৬২৯ জন।

জনসংখ্যা বাড়ার হার কমে আসাকে দেশের সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক আমিনুল হক সমকালকে বলেন, জনঘনত্বের দেশ হওয়ায় জনসংখ্যা বাড়ার নিয়ন্ত্রিত হার বিভিন্ন কারণে ইতিবাচক। যেমন, গোটা জাতীয় ব্যবস্থাপনা কিছুটা সহজ হবে। বেশি জনংখ্যার কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ প্রায় কোনো সেবাই সুশৃঙ্খলভাবে করা সম্ভব হয় না। জাতীয় খরচে এতে চাপ পড়ে। তিনি বলেন, জনসংখ্যার হার কমে আসার খারাপ দিক হচ্ছে, জনমিতির সুবিধা কম পাওয়া।

১০ কিংবা ১৫ বছর পরে জনমিতিক লভ্যাংশ কমে আসবে। এতে জনশক্তি রপ্তানি যেমন কমতে পারে; আবার দেশের শিল্পায়ন এবং উন্নয়ন কর্মযজ্ঞে শ্রমিক সংকট দেখা দিতে পারে।
তথ্য ঘেঁটে জানা যায়, ১৯৯১ সালে পরিচালিত তৃতীয় জনশুমারি প্রতিবেদনে জনসংখ্যা বাড়ার হার ছিল ২ দশমিক ০১ শতাংশ। ২০০১ সালে পরিচালিত চতুর্থ জনশুমারিতে এ হার ছিল ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। ২০১১ সালে পরিচালিত পঞ্চম জনশুমারিতে জনসংখ্যা বাড়ার হার ছিল ১ দশমিক ৪৬ শতাংশ। ১৯৭৪ সালে দেশে প্রথমবারের মতো জনশুমারি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন। বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব ড. শাহনাজ আরেফিনের সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস প্রমুখ।
এবারের জনশুমারিতে ১৭ হাজার ৫০৭ খানা এবং ৮৫ হাজার ৯৫৭ জনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি। এ কারণে লিঙ্গভিত্তিক জনসংখ্যার হিসাবে কিছুটা পার্থক্য দেখা গেছে। নতুন পরিসংখ্যানে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের তথ্য অন্তর্ভুক্ত নয়। সরকারি হিসাব মতে, বিদেশে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন ১ কোটি ২০ লাখ বাংলাদেশি। শ্রমিকের বাইরেও পড়ালেখা এবং অভিবাসী হিসেবে কিছুসংখ্যক মানুষ দেশের বাইরে রয়েছে। কোনো উৎস থেকে তাদের প্রকৃত তথ্য পাওয়া যায়নি।
দেশের মোট জনসংখ্যার বড় একটা অংশ এখনও গ্রামে বাস করে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, গ্রামে বাস করেন ১১ কোটি ৩০ লাখ ৬৩ হাজার ৫৮৭ জন। শহরে থাকেন ৫ কোটি ২০ লাখ ৯ হাজার ৭২ জন। বস্তির সংখ্যা ৫ লাখ ৭৪ হাজার ৮৬টি, সেখানে বাস করেন ১৮ লাখ ৪৮৬ জন। অন্যদিকে ভাসমান জনসংখ্যা ২২ হাজার ১৮৫। ১৯ হাজার ১৩৪টি ভাসমান ঘরে থাকেন তাঁরা। ঢাকা শহরে মোট ১ কোটি ২ লাখ ৭৮ হাজার ৮৮২ জন বাস করে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটিতে ৫৯ লাখ ৭৯ হাজার ৫৩৭ ও ঢাকা দক্ষিণ সিটির জনসংখ্যা ৪২ লাখ ৯৯ হাজার ৩৪৫ জন বসবাস করেন। দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে ঢাকা উত্তরে সবচেয়ে বেশি মানুষ বাস করে। আর সবচেয়ে কম মানুষ বাস করে বরিশাল সিটিতে, ৪ লাখ ১৯ হাজার ৩৫১। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বাস্তু সংখ্যা ৩ কোটি ৫৯ লাখ ৯৫১টি। জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে ৯৭ দশমিক ৬১ শতাংশ মানুষ।

জনশুমারিতে দেখা গেছে, পরিবারের সদস্য সংখ্যাও কমে এসেছে। পরিবারপ্রতি এখন ৪ জন সদস্য রয়েছে। আগেরবার ছিল ৪ দশমিক ৫ জন।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জনশুমারি ও গৃহগণনা জরিপটি পরিচালনা করে। গত ১৪ জুন রাত ১২টায় সারাদেশে একযোগে গণনা কার্যক্রম শুরু হয়। শেষ হয় ২১ জুন। অবশ্য, বন্যার কারণে সিলেট বিভাগের ৪ জেলা এবং নেত্রকোনায় এক সপ্তাহ গণনা কার্যক্রম বাড়ানো হয়। এবারই প্রথম ডিজিটাল ডিভাইস ট্যাব ব্যবহারের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

পুরুষের চেয়ে নারী বেশি :প্রতিবেদন বিশ্নেষণে দেখা যায়, পুরুষের চেয়ে নারী ১৬ লাখ ৩৪ হাজার ৩৮২ জন বেশি। গত জনশুমারি পর্যন্ত নারীর চেয়ে পুরুষের সংখ্যা বেশি ছিল। তখন পুরুষ ছিল ৭ কোটি ২১ লাখ ৯ হাজার ৭৯৬ জন, আর নারী ছিল ৭ কোটি ১৯ লাখ ৩৩ হাজার ৯০১ জন। ২০১১ সালের ওই জরিপ অনুযায়ী মোট জনসংখ্যা ছিল ১৪ কোটি ৪০ লাখ ৪৩ হাজার ৬৯৭ জন। নারীর সংখ্যা বাড়ার কারণ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আমিনুল হক বলেন, অভিবাসনের কারণে পুরুষের সংখ্যা কমছে। এ ছাড়া পুরুষের মধ্যে মৃত্যুহার নারীর চেয়ে বেশি।

ওই অনুষ্ঠানে ড. শিরীন শারমিন বলেন, দেশে নারীর সংখ্যা বাড়া প্রমাণ করে, জাতীয় উন্নয়নে তাঁদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে হবে। বেশিসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই প্রতিবেদন জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করেন তিনি। অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান প্রতিবেদনের নির্ভুলতা প্রসঙ্গে বলেন, ভুল হোক আর যাই হোক- এটাই গ্রহণযোগ্য পরিসংখ্যান। পৃথিবীর কোনো পরিসংখ্যানই নির্ভুল নয়।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় খানা পর্যায়ে গণনাকর্মীরা যাননি বলে এবার ব্যাপক অভিযোগ ছিল। কোনো কোনো বাসার দরজায় শুধু স্টিকার লাগিয়ে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছেন গণনাকর্মীরা। রাজধানীর অনেকেই অভিযোগ করেন, তাঁদের বাসায় কোনো গণনাকর্মী যাননি। অনেক বাসায় কর্মীরা গেলেও সব তথ্য জানতে চাননি।

হিন্দু ধর্মাবলম্বী কমেছে :দেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে এখন মুসলমান ৯১ শতাংশ আর সনাতন ধর্মাবলম্বী ৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ। ২০১১ সালের জনশুমারিতে সনাতন ধর্মাবলম্বী ছিল ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। জনশুমারিতে সনাতন ধর্মাবলম্বী কমেছে দশমিক ৫৯ শতাংশ। প্রথম জনশুমারিতে হিন্দু ছিল ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। এবারের শুমারিতে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাওয়া গেছে শূন্য দশমিক ৬১ শতাংশ। খ্রিষ্টান শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশ এবং শূন্য দশমিক ১২ শতাংশ অন্য ধর্মাবলম্বী। বিবিএসের ২০১১ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা প্রতিবেদনে দেশে হিন্দু জনসংখ্যা আগের চেয়ে কম ছিল। প্রতিবেদনে এর দুটি কারণ উল্লেখ করা হয়। প্রথমত, হিন্দুদের আউট মাইগ্রেশন এবং হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যে মোট প্রজনন হার তুলনামূলক কম। অর্থাৎ হিন্দু দম্পতিরা তুলনামূলকভাবে কম সন্তান জন্ম দেন।

জনঘনত্ব আরও বেড়েছে :প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১১৯ জন। ২০১১ সালের শেষ জনশুমারিতে যা ছিল ৯৭৬ জন। ২০০১ সালে ছিল ৮৪৩ জন। ১৯৯১ সালে ছিল ৪২০ এবং ১৯৮১ সালে ছিল ৫৯০ জন। ১৯৭৪ সালের প্রথম জনশুমারিতে এ সংখ্যা ছিল ৪৮৪ জন। বিভাগভিত্তিক বিশ্নেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি জনঘনত্ব ঢাকায়। প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২ হাজার ১০৫ জন। অন্যদিকে সবচেয়ে কম বরিশালে ৬৮৮ জন।

সিটি করপোরেশনভিত্তিক বিভাজনে দেখা যায়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় সবচেয়ে বেশি মানুষের বাস। এ সংখ্যা ৫৯ লাখ ৭৯ হাজার ৫৩৭ জন। সবচেয়ে কম বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায়, ৪ লাখ ১৯ হাজার ৩৫১ জন। জনঘনত্ব সবচেয়ে বেশি ঢাকা দক্ষিণ সিটি এলাকায়, ৩৯ হাজার ৩৫৩ জন।

সাক্ষরতায় পিছিয়ে নারী :সাক্ষরতার হার বেড়ে হয়েছে ৭৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ। আগের শুমারিতে ছিল ৫১ দশমিক ৭৭ শতাংশ। গ্রামে এ হার ৭১ দশমিক ৫৬ শতাংশ। শহরে ৮১ দশমিক ২৮ শতাংশ। আবার জনসংখ্যায় নারী এগিয়ে থাকলেও সাক্ষরতায় পিছিয়ে আছে তারা। লিঙ্গভিত্তিক বিশ্নেষণে দেখা যায়, নারীদের সাক্ষরতার হার ৭২ দশমিক ৮২ শতাংশ, যেখানে পুরুষের এ হার ৭৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ। সাক্ষরতার সর্বোচ্চ হার ঢাকা বিভাগে ৭৮ দশমিক ০৯ শতাংশ। সর্বনিম্ন ময়মনসিংহে ৬৭ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ।