হেফাজতসহ সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তির সঙ্গে আপসের ফল কখনও শুভ হতে পারে না। কারণ এদের উদ্দেশ্যই হচ্ছে, দেশের ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা, এদেশে পাকিস্তানি চেতনা ও ভাবধারা সৃষ্টি করা, তালেবানি রাজত্ব কায়েম করা।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ আয়োজিত ‘সাম্প্রদায়িকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ কথা বলেন। নড়াইলসহ দেশের বিভিন্নস্থানে সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক হামলার প্রসঙ্গ তুলে বক্তারা বলেন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের হামলার কোনো ঘটনাই বিচ্ছিন্ন নয়, বরং পূর্বপরিকল্পিত। প্রশাসন এসব হামলাকে বিচ্ছিন্ন হামলা বলে দায় এড়াতে চায়। কিন্তু সরকার ও প্রশাসন এর দায় এড়াতে পারবে না। রাষ্ট্র ও এর প্রশাসনকে এসবের বিরুদ্ধে কঠোর থাকতে হবে। নাহলে কখনই এদেশে সাম্প্রদায়িক হামলা বন্ধ হবে না।

গোলটেবিল বৈঠকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, যেকোনো সাম্প্রদায়িক হামলার পর প্রশাসন বলে, এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু এর কোনোটিই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, সবগুলোই একসূত্রে গাঁথা। এ কথা যতদিন রাষ্ট্র বা প্রশাসন স্বীকার করবে না, ততদিন এর কোনো সমাধান হবে না। যথাযথ প্রতিষেধক ব্যবস্থা নেওয়াও সম্ভব হবে না।

তিনি বলেন, আমাদের লাল-সবুজের পতাকার সবুজ রংটা পাকিস্তানের পতাকার সবুজ রঙের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। আর লাল বৃত্ত পাকিস্তানের পতাকার চাঁদ-তারায় পরিণত হচ্ছে। আজকের এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ। আমি সন্দিহান, একদিন এদেশে এ সংগঠন থাকবে কি-না, সেটি নিয়ে।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, আজ অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শক্তিও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকতে হেফাজতি তালেবানিসহ ধর্মান্ধ মৌলবাদী শক্তির সঙ্গে আপস করছে। যারা মনে করেন এদের সঙ্গে আপস করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে, তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন।

তিনি বলেন, এরা একাত্তরের পরাজিত শক্তি, ২০১৩ সালের ৫ মে’র পরাজিত শক্তি। এই অপশক্তিকে এদেশ থেকে বিতাড়িত করে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিতে হবে। ধর্মান্ধ অপশক্তিকে নিঃশেষ করতে না পারলে আমরা নিজেরাই নিঃশেষ হয়ে যাব। তাই এদের বিরুদ্ধে একাত্তরের চেতনায় আরেকবার গর্জে উঠতে হবে। নতুন প্রজন্মকে উঠে দাঁড়াতে হবে।

রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আলী শিকদার বলেন, ধর্ম নিয়ে যেসব জাতি রাজনীতি করেছে, তারাই ধ্বংস হয়েছে। আমাদের এখান থেকে ফিরে আসতে হবে। সাম্প্রদায়িক দানব থেকে মুক্ত হতে বাংলাদেশে গণজাগরণ গড়ে তুলতে হবে। বাহাত্তরের অসাম্প্রদায়িক সংবিধান পরিপূর্ণভাবে ফিরিয়ে আনতে হবে। এটাকে সব রাজনৈতিক দলকেই মেনে নিতে হবে।

সাবেক তথ্য কমিশনার অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম বলেন, আমরা অসাম্প্রদায়িকতা ও বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষ দর্শনের কথা বলি। কিন্তু সেটা মন ও মানসিকতায় ধারণ করি না। আগামী জাতীয় নির্বাচনে যাদের মনোয়ন দেওয়া হবে, তারা মন-মানসিকতায় কতটা অসাম্প্রদায়িক, সেটা যাচাই-বাছাই করে নিতে হবে।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবেদ খান বলেন, সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনাগুলো রুখে দাঁড়াতে গণজাগরণ গড়ে তুলতে হবে। তবে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের মধ্যেও মৌলবাদী শক্তির সঙ্গে আপসের মনোভাব দেখা যাচ্ছে। মধ্যবিত্তের আবেগ ও চৈতন্যও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

দৈনিক সমকালের উপদেষ্টা সম্পাদক আবু সাঈদ খান বলেন, অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের পথে রাজনীতি খানিকটা পথ হারিয়েছে। সাম্প্রদায়িক অপশক্তি রাজনৈতিক দলেও ঢুকে গেছে। রাজনীতি ঠিক না হলে সমাজ ঠিক হবে না।

তিনি বলেন, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা বেশি। এই দলকে পরিপূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ নীতির ওপর দাঁড়াতে হবে। বিরোধী দলগুলো ও সমাজকেও ধর্মনিরপেক্ষ হতে হবে। কিন্তু মূল ধারার রাজনৈতিক দলগুলো আপসের রাজনীতিতে ঢুকে পড়েছে। বাম দলগুলোও অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে সাংস্কৃতিক জাগরণ গড়ে তুলতে হবে। অসাম্প্রদায়িক শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে নীতিবদ্ধ হতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, সারাক্ষণ বঙ্গবন্ধুর কথা বললেও বর্তমান সরকার বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ ও চেতনা থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করতে হবে। গত ১৩ বছরেও এই সরকার সেটা করতে সাহস পায়নি।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, রাজনৈতিক চক্রান্তের অংশ হিসেবে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনাগুলো ঘটছে। সবাইকে সম্মিলিতভাবে এটিকে প্রতিরোধ করতে হবে।

ধারণাপত্রে পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. চন্দ্রনাথ পোদ্দার বলেন, যারা সাম্প্রদায়িক হামলা করছে, তাদের লক্ষ্য এদেশ থেকে অন্য ধর্মাবলম্বীদের বিতাড়িত করা। তারা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের হার ১৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৭ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। একটা ভীতি ও ত্রাসের পরিবেশও তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। আজ যে সংকট দেখা দিয়েছে, তা ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নয়, মূল সংকট মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের।

সভাপতির বক্তব্যে পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি জে. এল ভৌমিক বলেন, ধর্ম অবমাননার নামে এদেশকে হিন্দুশূন্য করার প্রক্রিয়া চলছে। এটা বন্ধ করতে হবে। তা না হলে এদেশ টিকে থাকতে পারবে না।

গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য রাখেন সম্প্রীতি বাংলাদেশের আহ্বায়ক পীযূষ বন্দোপাধ্যায়, একাত্তর টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু, প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হাসান, আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, সম্প্রীতি বাংলাদেশ-এর সদস্য সচিব অধ্যাপক ডা. মামুন-আল মাহতাব স্বপ্নীল প্রমুখ।