মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের একটি মামলায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছিল আজিজুর রহমান নামে এক যুবককে। এরপর কারাবন্দি অবস্থাতেই তাঁর নামে একে একে আটটি পরোয়ানা (কাস্টডি ও প্রডাকশন ওয়ারেন্ট) আসে। এসব মামলার বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না। তিন মাস ১০ দিন কারাবাসের পর বহু কষ্টে তাঁর জামিন হয়। এরই মধ্যে প্রমাণ হয়েছে, তাঁকে হয়রানি করতেই এসব মামলা আর পরোয়ানা জারি হয়। তবে ইতোমধ্যেই তাঁর জীবন তছনছ হয়ে যায়। মিথ্যা মামলা ও ভুয়া পরোয়ানার ধাক্কা সামলাতে তাঁর খরচ হয় ১৮ লাখ টাকা। সেই টাকা জোগাতে ভাড়াটের কাছে বন্ধক রাখতে হয়েছে বাড়ি, বিক্রি করেছেন আবাদি জমি।

জামিনের পর প্রতিকার চেয়ে তিনি হাইকোর্টে রিট করলে আদালতের নির্দেশে এ ব্যাপারে অনুসন্ধান করে চাঞ্চল্যকর তথ্য পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দেখা যায়, স্থানীয় বিরোধের জেরে প্রথম মামলাটিতে তাঁকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ফাঁসানো হয়েছে। এরপর একই প্রতিপক্ষের প্রচেষ্টায় একটি অসাধু চক্র ভুয়া পরোয়ানা তৈরি করতে থাকে। সেসব পাঠানো হয় কারাগারে।
পুলিশ, আদালত ও কারাগার-সংশ্নিষ্ট অসাধু ব্যক্তিদের যোগসাজশ এবং পরোয়ানা যাচাইয়ে গাফিলতি বা ত্রুটির কারণে এটা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন অনুসন্ধানকারীরা। অবশ্য সমকালের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে কোনো পক্ষই এ ঘটনার দায় নিতে রাজি হয়নি।

অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন সমকালকে বলেন, ভুয়া পরোয়ানার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হলে তারা এ ধরনের ঘটনা থেকে দূরে থাকবে। এই ঘটনায় একজন হয়রানির শিকার হয়েছেন, তাঁকে কারাগারে থাকতে হয়েছে, দৌড়াদৌড়ি করতে হচ্ছে, আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এটা খুবই দুঃখজনক। এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে অপরাধীদের জরিমানা ও সাজা নিশ্চিত করা দরকার। তবে এর সঙ্গে আদালতের কারও সংশ্নিষ্টতা থাকতে পারে বলে তিনি মনে করেন না।

কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এএসএম আনিসুল হক সমকালকে বলেন, কাস্টডি বা প্রডাকশন ওয়ারেন্ট (সিডব্লিউ বা পিডব্লিউ) আদালতের বাহক মারফত আসে। তাঁরাও রেজিস্টারে এ-সংক্রান্ত তথ্য রাখেন, কারাগারেও রাখা হয়। দেশের ১৫টি কারাগারে এখন প্রিজন ইনমেট ডাটা সিস্টেম (পিআইডিএস) চালু আছে। ফলে সহজেই কোনো বন্দির ব্যাপারে সব তথ্য পাওয়া সম্ভব। তার পরও এই প্রতারণার সঙ্গে কারও জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা হবে।
পিবিআই সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের মার্চে গাজীপুরের জয়দেবপুর থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা হয়। সেখানে পলাতক আসামির তালিকায় আজিজুরের (৪৮) নাম ছিল। ঘটনার এক বছর পর ২০১৮ সালের ৬ মার্চ পরোয়ানামূলে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। পরে বিভিন্ন সময়ে তিনি গাজীপুর জেলা ও কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে ছিলেন।

এ সময় তাঁর নামে বিভিন্ন মামলায় আটটি পরোয়ানা আসে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরের পাঁচটি, জামালপুর, মাদারীপুর ও ঢাকার মিরপুরের একটি করে মামলা রয়েছে। সেই মামলাগুলোয় তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে দেখা যায়, সেখান থেকে এমন কোনো পরোয়ানা জারি হয়নি। জামিনে মুক্ত হওয়ার পর চলতি বছর তিনি হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করেন। এর সূত্র ধরে অনুসন্ধানে নেমে প্রথম মামলাটিতে ব্যাপক গড়বড় দেখতে পায় পিবিআই গাজীপুর জেলা ইউনিট।
দায় এড়ানোর চেষ্টা পুলিশের :জয়দেবপুর থানার মামলাটির বাদী গাজীপুর জেলা ডিবির তৎকালীন এএসআই (বর্তমানে বগুড়া জেলা ডিবির এসআই) মুহাম্মদ জামাল উদ্দীন। তিনি সমকালের কাছে দাবি করেন, অন্য আসামিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী মামলায় আজিজুরের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে পিবিআইর অনুসন্ধানের সময় গ্রেপ্তারকৃতরা জানান, আজিজুরকে তাঁরা চেনেন না।

পিবিআই বলছে, মামলার বাদী এর আগে সাভারে কর্মরত ছিলেন। ঘটনার মাসখানেক আগে তিনি জয়দেবপুরে বদলি হন। এ ক্ষেত্রে তাঁর আগের কর্মস্থলের কারও মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুক্তভোগীকে ফাঁসানোর আশঙ্কা জোরালো। আজিজুর সমকালকে বলেন, এসআই জামাল উদ্দীনের বিরুদ্ধে তিনি মামলা করবেন।

ওই মামলাটির তদন্ত করেন গাজীপুর জেলা ডিবির তৎকালীন পরিদর্শক (বর্তমানে বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে কর্মরত) ডেরিক স্টিফেন কুঁইয়া। তিনি সমকালকে বলেন, 'মাদক মামলা তদন্তের জন্য আসামির এলাকা সাভারে যাওয়া আমার এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না। এ কারণে নিয়ম অনুযায়ী সাভার থানায় ইনকোয়ারি স্লিপ পাঠানো হয়। সেখান থেকে নেতিবাচক রিপোর্ট আসায় তাঁর বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়।'

নেপথ্যে স্থানীয় বিরোধ :অনুসন্ধান-সংশ্নিষ্টরা জানান, প্রথম মামলায় আজিজুরকে ফাঁসানোর বিষয়টি স্পষ্ট। এ ক্ষেত্রে মামলাটির বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তা দায় এড়াতে পারেন না। ঢাকার সাভারের ফিরিঙ্গিকান্দার বাসিন্দা আজিজুর প্রবাসে ছিলেন। ২০০৮ সালে তিনি দেশে ফেরেন। এরপর তাঁর স্ত্রী স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হন এবং জয়লাভ করেন। এতে পরাজিত প্রার্থী ও তাঁর স্বজন-সমর্থকদের সঙ্গে বিরোধের সৃষ্টি হয়। আবার মাদক ব্যবসার বিরোধিতা করায় আজিজুরের ওপর স্থানীয় একটি পক্ষ ক্ষেপেছিল। এ ছাড়া জমি নিয়েও বিভিন্নজনের সঙ্গে তাঁর বিরোধ আছে। ওই প্রতিপক্ষই তাঁকে ফাঁসাতে পুলিশ ও আদালতের অসাধু কর্মচারীদের সহায়তায় চক্রান্ত করেছে। তৈরি করেছে ভুয়া পরোয়ানা।

আপসের চেষ্টা পুলিশের :ভুক্তভোগী আজিজুর সমকালকে বলেন, ২০১১ সালে ভাকুর্তা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তাঁর স্ত্রী মাহিনুর বেগম জয়ী হলে পরাজিত প্রার্থী স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার মেয়ে কানিজ ফাতেমা শিল্পী ও তাঁর স্বজনরা তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হন। তাৎক্ষণিকভাবে তেমন কিছু করতে না পারলেও পরে কানিজ তাঁর দেবর ফজলুল করিম ও এসআই জামাল উদ্দীনের সহায়তায় তাঁকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসান। এই চক্রের সদস্যরা মাদক ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত। তাঁকে গ্রেপ্তারের পর তাঁরা ভুয়া পরোয়ানা তৈরি করে কারাগারে পাঠান।

আজিজুর জানান, কারামুক্ত হওয়ার পর তিনি ওই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গাজীপুরের পুলিশ সুপারের কাছে অভিযোগ দেন। তখন জামাল উদ্দীন তাঁকে ডেকে নিয়ে পুরো ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চান এবং অভিযোগ প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। তিনি রাজি না হওয়ায় এক বন্ধুর মাধ্যমে ৩০ হাজার টাকা দিয়েও ম্যানেজ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।

এ ব্যাপারে কানিজ ফাতেমার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে তাঁর দেবর ফজলুল করিম দাবি করেন, আজিজুরের সঙ্গে তাঁদের কোনো বিরোধ নেই। তাঁকে ফাঁসানো বা ভুয়া পরোয়ানা তৈরির বিষয়টি অবান্তর। তাঁর দাবি, আজিজুরের বিরুদ্ধে এলাকায় নানা অভিযোগ আছে। এসআই জামাল উদ্দীন দাবি করেন, ক্ষমা চাওয়া বা আপসের চেষ্টা করা হয়নি।

আজিজুর জানান, তিনি কারাগারে থাকার সময় পরিবারের সদস্যরা দুঃসহ দিন পার করেছেন। মামলার খরচ চালাতে তাঁর সাভারের একটি বাড়ি ১০ লাখ টাকায় ভাড়াটিয়ার কাছে বন্ধক রাখতে হয়েছে। জামিনের পর ৫ শতাংশ জমি বিক্রি করেছেন ৯ লাখ টাকায়। আর্থিকভাবে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যেই বাড়ির মালপত্র ক্রোক করার ভয় দেখিয়ে সাভার থানা পুলিশের এক সদস্য তাঁর স্ত্রীর কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা ঘুষ নেন। আইজিপির কাছে অভিযোগ করার পর অবশ্য তিনি সেই টাকা ফেরত দিয়েছেন। সব মিলিয়ে রিটে তিনি ৮০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়েছেন। আর জয়দেবপুর থানার মাদক মামলায় এরই মধ্যে তাঁকে খালাস দিয়েছেন আদালত।

ভুয়া পরোয়ানা ঠেকাতে সুপারিশ :পিবিআইপ্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক বনজ কুমার মজুমদার সমকালকে জানান, আজিজুরকে হয়রানির ক্ষেত্রে পুলিশের অংশে জড়িতদের শনাক্ত করতে পেরেছেন তাঁরা। তবে ভুয়া পরোয়ানার অংশটা ধরতে পারেননি। এ ধরনের ঘটনা রোধে কয়েকটি সুপারিশ করেছে পিবিআই।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, সুপারিশগুলো হচ্ছে- পরোয়ানা আদালত থেকে ইস্যুর পর বাহকের মাধ্যমে বা ডাকযোগে কারাগারে পাঠানোর পাশাপাশি এর যথার্থতা যাচাইয়ের সুবিধার্থে সংশ্নিষ্ট সংস্থাগুলোয় ই-মেইল, চিঠি বা মোবাইল ফোনে নিশ্চিত করা যেতে পারে। কারাগারে পরোয়ানা গৃহীত হওয়ার পর এর উৎস, সূত্র, প্রেরণের ধরন, বাহকের নাম, পদবি, মোবাইল ফোন নম্বর, প্রেরিত স্মারক ও গৃহীত ডায়েরির নম্বরের বিশদ তথ্য হাজতি রেজিস্টারে যুক্ত করা যেতে পারে।

ভুয়া পরোয়ানা দিয়ে হয়রানি নিরসনে পিডব্লিউ বা সিডব্লিউ প্রস্তুতকারীর (আদালতের প্রতিনিধি হিসেবে) মোবাইল ফোন নম্বর ব্যবহার বাধ্যতামূলক ও পরোয়ানা জারির প্রক্রিয়ায় পুলিশের প্রতিনিধি হিসেবে কোর্ট পুলিশ পরিদর্শককে সম্পৃক্ত করাসহ সংশ্নিষ্টদের এ বিষয়ে সম্যক ধারণা দিতে প্রশিক্ষণ সাপেক্ষে আদালত, পুলিশ ও কারাগারের সমন্বয়ে একটি সমন্বিত পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে।


বিষয় : ভুয়া পরোয়ানা যুবকের জীবন তছনছ

মন্তব্য করুন