নীতিমালা থাকলেও মালিকপক্ষের খেয়াল খুশিমতো চলছে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও দুটি প্রতিষ্ঠানে চলছে ভর্তি। ভর্তি পরীক্ষায় মেধা তালিকায় অনেক পেছনে থাকা শিক্ষার্থীকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ভর্তি, এমনকি ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেননি- এমন শিক্ষার্থীকেও ভর্তি করার অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন কলেজের বিরুদ্ধে। শিক্ষক পদে নিয়োগ এবং হাসপাতালে রোগী থাকার শর্তও পূরণ করতে পারছে না কিছু মেডিকেল কলেজ। সব মিলিয়ে বেসরকারি মেডিকেল শিক্ষায় অনিয়মই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের দায় নিতে চাইছে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বেসরকারি মেডিকেল শিক্ষার মান উন্নয়নে গঠিত বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন। মেডিকেল শিক্ষা তদারককারী বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল বেশ কয়েকবার হুঁশিয়ারি দিয়েছে নিয়মবহির্ভূতভাবে পাঠদান অব্যাহত রাখলে নিবন্ধন বা সনদ কোনোটাই দেওয়া হবে না। কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও গাজীপুরের আইচি ও আশুলিয়ার নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজ ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তি করেছে। শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় পাঁচ বছর আগেই এই দুটি কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে আইচি মেডিকেল কলেজ ৫০ আসনের সবক'টিতেই এবার শিক্ষার্থী ভর্তি করেছে। অথচ সেখানে দুটি বিভাগে শিক্ষক নেই, সাতটি বিভাগে অধ্যাপকের পদ শূন্য। হাসপাতালে ৭০ শতাংশ সিটে রোগী থাকার কথা থাকলেও গত মঙ্গলবার ২০ জনের বেশি রোগী পাননি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লোকজন। গত বছর ১১ ফেব্রুয়ারি নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজের ৫৬ জন শিক্ষার্থী ভর্তি বাতিল করে অন্যত্র মাইগ্রেশনের জন্য আবেদন করেন। এর পরও গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ২৭ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৭৩টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। এসব কলেজে প্রতিবছর ৬ হাজার ৪০০ শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। তবে নানা শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে সাতটি কলেজে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনায় নিষেধাজ্ঞা দেয় সরকার। শর্ত পূরণে একেবারেই ব্যর্থ হওয়ায় রাজশাহীর শাহ মখদুম, রংপুরের নর্দান, গাজীপুরের নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। কলেজগুলোর শিক্ষার্থীদের অন্য কলেজে মাইগ্রেশন করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের কেয়ার মেডিকেল কলেজ, ধানমন্ডির নর্দান মেডিকেল কলেজ, গাজীপুরের আইচি মেডিকেল কলেজ ও আশুলিয়ার নাইটিংগেল কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তিতে নিষেধাজ্ঞা জারি রাখে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
গাজীপুরের আইচি মেডিকেল কলেজের শাখা ডেমরার আমুলিয়ার আইচি মেডিকেল কলেজেও শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে স্থগিতাদেশ রয়েছে।

নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো মেডিকেল কলেজে সাময়িকভাবে ভর্তি স্থগিত হওয়ার পর দুই বছরের মধ্যে ফের শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে ব্যর্থ হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কলেজের অনুমোদন বাতিল বলে গণ্য হবে। তারা মেডিকেল কলেজ হিসেবে পরিচয়ই দিতে পারবে না। কিন্তু গাজীপুরের আইচি ও আশুলিয়ার নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজ কোর্টে মামলা করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আদেশকে স্থগিত করে কার্যক্রম চালাচ্ছে। তারা প্রতিবছর শিক্ষার্থী ভর্তি করছে। অনুমোদন না থাকায় এখন যাঁরা ভর্তি হচ্ছেন, চার বছর পর তাঁরা স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলন করলেও কোনো লাভ হবে না বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

এদিকে, এবারের ভর্তি পরীক্ষায় একজন শিক্ষার্থী ১০০ নম্বরের মধ্যে ১১ নম্বর এবং অন্য একজন ১৮ নম্বর পেলেও দু'জনকেই আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে রাজধানীর বেসরকারি শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ মেধা তালিকায় দেখিয়ে ভর্তি করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া একজন তালিকায় ৫৬ হাজার নম্বরে থাকলেও মেধাক্রমে ২ হাজার ৮০০ দেখিয়ে তাঁকে ভর্তি করেছে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ। এমনকি পরীক্ষা না দিলেও এক শিক্ষার্থীকে ইউনিভার্সেল মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর তদন্তে নামে। সংশ্নিষ্ট মেডিকেল কলেজের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করা হয়। ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে জানিয়ে মেডিকেল কলেজগুলো ওই শিক্ষার্থীদের ভর্তির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। এ ছাড়া বেশকিছু অনিয়মের অভিযোগ পেয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এসব নিয়ে তদন্ত হচ্ছে। অভিযোগের প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নাইটিংগেল কলেজের এক শিক্ষার্থী সমকালকে বলেন, কলেজ কর্তৃপক্ষ তাদের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ও আদালতের কিছু কাগজপত্র দেখিয়ে ভর্তি করায়। প্রথম বর্ষে বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন এনে দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু এখনও রেজিস্ট্রেশন এনে দিতে পারেনি। কলেজের শিক্ষাব্যবস্থা সংক্রান্ত সব সুযোগ-সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত। তিনি আরও বলেন, 'আমরা স্বাস্থ্যশিক্ষা থেকে পিছিয়ে পড়ছি এবং চূড়ান্ত পেশাগত পরীক্ষার পর কীভাবে ইন্টার্নশিপ করব, তা বোধগম্য নয়। আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।' তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের অন্যত্র মাইগ্রেশনের ব্যবস্থা করতে মন্ত্রী, সচিব এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে আবেদন করা হয়েছে। দুই বছর ধরে তাঁরা আন্দোলন করছেন।
ভর্তির বিষয়ে জানতে চাইলে মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. দীপক রায় সমকালকে বলেন, 'বিষয়টি আমি জানি না। আপনি চাইলে মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।'

রংপুর নর্দান মেডিকেল কলেজের এক সাবেক শিক্ষার্থী বর্তমানে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই চিকিৎসক বলেন, শিক্ষার্থী থাকাকালে তাঁদের টানা দুই বছর কোনো ক্লাস হয়নি। বেসিক সাবজেক্ট এনাটমিতে একটি আইটেমও তাঁরা হাতে-কলমে শিখতে পারেননি। এখন রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে নতুন করে শিখতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ডা. আরমান হোসেন সমকালকে বলেন, শিক্ষার্থী ভর্তি করানোর আগে অভিভাবকের উচিত কলেজ সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজখবর নেওয়া। কলেজ পরিচালনায় সরকারের হালনাগাদ অনুমোদন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংশ্নিষ্টতা ও বিএমডিসির স্বীকৃতি আছে কিনা যাচাই করা। অনেকেই খোঁজ নিচ্ছেন না। সন্তান চিকিৎসক হবে- এমন স্বপ্ন পূরণে মানহীন মেডিকেল কলেজে ভর্তি করানো হচ্ছে। নীতিমালা অমান্য করে কেউ শিক্ষার্থী ভর্তি করলে কোনোভাবেই তাদের সনদ ও নিবন্ধন দেওয়া হবে না।

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এনায়েত হোসেন বলেন, কেউ অসদুপায়ে ভর্তি করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যেসব মেডিকেলের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তারা শিক্ষার্থী ভর্তি করলেও নিবন্ধন পাবে না। বেসরকারি মেডিকেল কলেজে শিক্ষার মান উন্নয়নে আইন হচ্ছে। এ ছাড়া ভর্তির জন্য সেন্ট্রাল স্টুডেন্ট পোর্টাল সিস্টেম নিবন্ধন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মেডিকেল কলেজ চাইলেও অনিয়ম করতে পারবে না। ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দুটি কলেজ শিক্ষার্থী ভর্তি করছে বলে শুনেছেন। আদালতের মাধ্যমে আইনগতভাবে তা মোকাবিলা করা হবে।