মহাসড়কে ফের ঘটল যাত্রীবাহী বাসে ভয়াবহ ডাকাতি, বাসের ভেতর নারী যাত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা। ফের আলোচনায় মহাসড়কে নিরাপত্তা ইস্যু। গাড়িতে চড়তে গিয়ে প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনার দুশ্চিন্তার সঙ্গে এখন যাত্রী নিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে এসেছে। মহাসড়কে এই যাত্রীদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব হাইওয়ে পুলিশের। কিন্তু দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে বারবার যাত্রীবাহী গাড়িতে ভয়ংকর সব অপরাধ সংঘটিত হওয়ায় পুলিশের এই সংস্থার কার্যক্রম প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
কুষ্টিয়া থেকে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া একটি বাস গত মঙ্গলবার রাতে টাঙ্গাইল অতিক্রম করার পর ডাকাতরা অস্ত্রের মুখে চালককে জিম্মি করে বাসটি তাদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। তারা যাত্রীদের হাত, পা, চোখ বেঁধে তাদের সব লুটে নেয়। এ সময় এক নারী যাত্রী প্রতিবাদ করলে তাকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে ডাকাতরা। তিন ঘণ্টা ধরে বাসটিতে তাণ্ডব চললেও মহাসড়কে কোনো বাধার মুখে পড়েনি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে হাইওয়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে।

শুধু ওই ঘটনাটিই নয়, ২০১৭ সালে টাঙ্গাইলেই মহাসড়কে চলন্ত বাসে এক ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। পরিসংখ্যান বলছে, টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মধুপুর বনাঞ্চলসহ নির্জন এলাকায় রাতের আঁধারে চলন্ত বাসে ডাকাতির পাশাপাশি খুন-ধর্ষণের মতো ভয়ংকর ঘটনা ঘটছে। ওই দুটি ঘটনা ছাড়াও ২০১৮ সালের ৩০ আগস্ট রাতে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব থানা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এক প্রতিবন্ধী নারীকে বাসে তুলে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ২০১৬ সালের ১ এপ্রিল পোশাককর্মী এক নারী টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী এলাকায় বাসের ভেতর দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন। এ ছাড়া ২০০৯ সালের ২৬ জানুয়ারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকা ডাকাতের কবলে পড়ে খুন হন।

মহাসড়ক নিরাপদ ও যানজট মুক্ত করতে ২০০৫ সালে হাইওয়ে পুলিশের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে পুলিশের এই বিশেষায়িত ইউনিটে ছয়টি অঞ্চলে ৩৬টি থানা ও ৩৭টি ফাঁড়িতে জনবলের সংখ্যা ২ হাজার ৮৬১ জন। হাইওয়ে পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, সারাদেশে স্থানীয় ও মহাসড়ক মিলিয়ে তাদের প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার সড়কের দুর্ঘটনা রোধ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করতে হচ্ছে। এত অল্পসংখ্যক জনবল নিয়ে তা পুরোপুরি সম্ভব হচ্ছে না। এর পরও মহাসড়কে যানজট নিরসন ও নিরাপত্তা রক্ষায় নিরন্তরভাবে কার্যক্রম চলছে। অনেক পরিবহনের চালক-হেলপারের লোভ, রাতের যাত্রায় পথ থেকে যাত্রী তোলা এবং নির্দেশনা না মানায় মাঝে মধ্যে মহাসড়কে ডাকাতি হচ্ছে।

অবশ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, মহাসড়কের নির্ধারিত কিছু এলাকায় বারবার পরিবহন ডাকাতির মতো ঘটনা ঘটছে। হাইওয়ে পুলিশের তৎপরতা বাড়ানো গেলে, চেকপোস্টগুলো সক্রিয় হলে এ ধরনের অপরাধ থামানো সম্ভব।

মহাসড়কে অপরাধ বন্ধ করা যাচ্ছে না কেন, জানতে গতকাল শুক্রবার হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি মল্লিক ফখরুল ইসলামের মোবাইল নম্বরে বারবার ফোন দিলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে তাঁর বক্তব্য জানতে খুদে বার্তা পাঠালে তিনি তাতেও সাড়া দেননি।

বক্তব্য জানতে পুলিশের ওই ইউনিটের ডিআইজি আতিকা ইসলামের নম্বরে ফোন করে পরে খুদে বার্তা পাঠালে তিনি ব্যস্ততার কথা জানিয়ে অতিরিক্ত ডিআইজির সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। পরে অতিরিক্ত ডিআইজি মিজানুর রহমান জানান, নৌ পুলিশে তাঁর পদায়ন হওয়ায় বিষয়গুলো নিয়ে তিনি কথা বলতে চান না।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ সমকালকে বলেন, তাঁরা বিভিন্ন ফোরামেই রাতে চলাচলকারী যাত্রীবাহী বাসে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য বলে থাকেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, হাইওয়ে পুলিশের জনবল কম থাকায় বাস মালিকরা সে নিরাপত্তা পাচ্ছেন না। যেসব এলাকায় ডাকাতি হয়, সেসব এলাকায় চেকপোস্ট জোরদার করলেও এ ধরনের অপরাধ থামানো সম্ভব।

তিনি বলেন, এই ডাকাতিতে পরিবহন শ্রমিকদেরও কিছু দায় রয়েছে। সংগঠন থেকে বারবার চলন্ত পথে যাত্রী তোলা যাবে না এবং বাসের যাত্রীদের ভিডিও করে রাখাসহ নানা নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু সেই নির্দেশনা সব পরিবহন মানছে না। না মানলে তো পরিবহন সংশ্নিষ্টরা কিছু করতে পারবে না, এজন্য হাইওয়ে পুলিশকেই এগিয়ে আসতে হবে। পথে চেকপোস্টে যদি বাস থামিয়ে যাত্রীদের তালিকা যাচাই করে বা ভিডিও দেখতে চায়, তাহলেও নির্দেশনা অমান্যকারীরা ধরা পড়বে। এদের বিরুদ্ধে পুলিশ ব্যবস্থা নিলে অন্যরা ঠিক হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী সমকালকে বলেন, তাঁদের নিষেধাজ্ঞার পরও অনেক বাস গন্তব্যে যাওয়ার সময় রাস্তা থেকে যাত্রী তুলে থাকে। এটা তো সড়কে দায়িত্বরত হাইওয়ে পুলিশের দেখার কথা। তারা ঠিকঠাক দায়িত্ব পালন করলে তো কেউ রাস্তা থেকে যাত্রী তুলতে পারে না। তা ছাড়া মঙ্গলবার ডাকাতের কবলে পড়া বাসটি নিজের রুট ছেড়ে অন্য সড়কে চলছিল। টহল পুলিশ যদি বাসটি আটকাত তাহলে হয়তো এমন ঘটনা ঘটত না। মহাসড়ক অনিরাপদ হয়ে ওঠার পেছনে সব পক্ষের দায় আছে।

মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, মহাসড়কে নিরাপত্তা না দিয়ে হাইওয়ে পুলিশ ছোটখাটো বিষয়গুলো নিয়ে পরিবহন সংশ্নিষ্টদের হয়রানি করে থাকে।

স্থানীয় লোকজন এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা বলছেন, টাঙ্গাইলের মধুপুর থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত অন্তত ৪৫ কিলোমিটার সড়ক এখন যাত্রী ও চালকদের কাছে আত হয়ে উঠেছে। বনাঞ্চল হওয়ার কারণে পুলিশের উপস্থিতি টের পেলেই নিমিষেই ডাকাত দলের সদস্যরা গা-ঢাকা দিচ্ছে। বিভিন্ন পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা গেছে, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত মধুপুর থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত সড়কে অন্তত ১৮টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। ওই এলাকায় রাস্তায় গাছ ফেলে ব্যারিকেড দিয়ে ডাকাতি হচ্ছে। এসব ডাকাতের বাইরে মহাসড়কে চলাচলকারী বিভিন্ন বাহনের যাত্রীরাও বখাটেদের উত্ত্যক্তের শিকার হচ্ছেন। টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী, মধুপুরসহ বিভিন্ন সড়কে ট্রাকে করে ঘুরতে যাওয়ার সময় বখাটেরা নানাভাবে উত্ত্যক্ত করছে যাত্রী, পথচারীদের।
ধনবাড়ী এলাকার একজন স্কুলশিক্ষক জানান, ১৪ থেকে ২২ বছর বয়সী বখাটে তরুণরা ট্রাকে শামিয়ানা ও উচ্চ শব্দের যন্ত্র লাগিয়ে মহাসড়কে নাচানাচি করে। এরা ট্রাক থেকে প্রাইভেটকারসহ ছোট ছোট গাড়িতে পানি ছুড়ে মারে, এমনকি প্রস্রাবও করে দেয়। সড়কের পাশে কোনো নারী বা স্কুল-কলেজগামী ছাত্রীদের দেখলে ট্রাক থামিয়ে নানাভাবে উত্ত্যক্ত করে চলে যায়। পুলিশের চেকপোস্ট বা টহল সক্রিয় থাকলে এই ধরনের অপরাধীরা মহাসড়কে দাপিয়ে বেড়াতে পারত না।

শুধু ওই এলাকাতেই নয়, দেশের অন্যান্য মহাসড়কেও প্রায় প্রতিরাতেই অঘটন ঘটছে। যাত্রীবাহী বাস ছাড়াও ব্যক্তিগত গাড়ি এবং পণ্যবাহী গাড়ি ডাকাতদের কবলে পড়ছে। শুধু চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে বাস, ট্রাক, প্রাইভেটকারসহ বিভিন্ন যানবাহন ডাকাতদের কবলে পড়ে অন্তত ২৫০ জন জাতীয় জরুরি সেবা '৯৯৯'-এ কল করে সাহায্য চেয়েছেন।

বিষয় : মহাসড়কে ডাকাতি

মন্তব্য করুন