করোনার পর মূল্যস্ফীতির কশাঘাতে সাধারণ মানুষ যখন জর্জরিত, ঠিক তখনই বাড়ানো হলো জ্বালানি তেলের দাম। আর এটা যেনতেন বাড়ানো নয়; রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক দফায় এত বেশি আর কখনও বাড়ানো হয়নি। এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে সার্বিক নিত্যপণ্যের ওপর এর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, সেটা সাধারণ মানুষ সইতে পারবে কিনা, তা বিন্দুমাত্র বিবেচনা করা হয়েছে বলে মনে হয় না। শুধু জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করেই সরকার ক্ষান্ত হবে বলে মনে হয় না। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ ইঙ্গিত দিয়েছেন, অচিরেই গ্যাস ও বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হতে পারে। এ দুটি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে আছে। যে কোনো সময়ে এগুলোর মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণাও আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, সাধারণ মানুষ এই চাপ সইবে কীভাবে? বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যায়, করোনার আক্রমণে প্রচুর মানুষ হতদরিদ্রের কাতারে চলে গেছে। করোনায় হাজার হাজার কর্মজীবী চাকরিচ্যুত। আয় বাড়েনি এক পয়সাও, কিন্তু দ্রব্যমূল্য বেড়েই চলেছে। সংসার চালাতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেকে সঞ্চয় ভাঙিয়ে চলছেন। এ অবস্থায় সাধারণ মানুষের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য ক্রমান্বয়ে কমে আসছিল। শনিবার ক্রুড অয়েল প্রতি ব্যারেল ৯৪ ডলারে বিক্রি হয়েছে। পূর্বাভাস রয়েছে, চলতি বছরেই এ মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৮০ থেকে ৭০ ডলারে নেমে আসতে পারে। এ সময়ে সরকার মূল্যবৃদ্ধি না করেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করতে পারত। অথবা এতটা বেশি না বাড়িয়ে সহনীয় পর্যায়ে বাড়াতে পারত। দেশে বছরে কমবেশি ৬৫ লাখ টন জ্বালানি তেল ব্যবহূত হয়। বলতে গেলে এর পুরোটাই আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪৫ লাখ টনই ডিজেল। এই ডিজেলের ৬৫ শতাংশই ব্যবহার হয় গণপরিবহনে। তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর শুক্রবার রাত থেকেই পরিবহন খাতে বিশৃঙ্খলা চলছে। বহু স্থানে পরিবহন বন্ধ রেখেছে মালিকপক্ষ। তেল পাম্পে গভীর রাত থেকেই নজিরবিহীন ভিড়। গণপরিবহন পুরোটাই ডিজেলনির্ভর। ফলে পণ্য পরিবহনের ভাড়া বাড়বে। বাস-মিনিবাসে চলাচল করে সাধারণ মানুষ। তাদেরও বাড়তি ভাড়া গুনতে হবে। সার্বিকভাবে পণ্যমূল্য ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। এমনিতেই বাজার চড়া। শুক্রবার তেলের মূল্য বাড়ানোর পর গতকাল বাজারে পণ্যমূল্য আরও এক দফা বেড়েছে। এখন লাখ লাখ মোটরবাইক ভাড়ায় চলে। এই বাইকও এক প্রকার গণপরিবহনে পরিণত হয়েছে। এগুলো চলে পেট্রোল-অকটেন দিয়ে। এই তেলের মূল্যও ৫১ শতাংশের বেশি বাড়ানো হয়েছে। ফলে যাঁরা বাইকে চলাফেরা করেন, তাঁদেরও বাড়তি ভাড়া গুনতে হবে।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, সরকার নিরুপায় হয়ে তেলের মূল্য বাড়িয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য কমে গেলে তখন এ মূল্য পুনর্বিবেচনা করা হবে। সাধারণত লক্ষ্য করা যায়, বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে তখন দেশীয় বাজারেও দাম বাড়ানো হয়। কিন্তু বিশ্ববাজারে দাম যখন কমে, তখন দেশের বাজারে কমানোর নজির খুব একটা নেই। এর আগে বিশ্ববাজারে তেলের দাম অনেক কমেছিল। কম দামে তেল আমদানি করে বেশি দামে দেশের বাজারে বিক্রি করে বিপিসি (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন) ৪৮ হাজার কোটি টাকা লাভ করেছিল। তখন কিন্তু দেশের বাজারে তেলের মূল্য কমানো হয়নি। পাশের দেশ ভারতে জ্বালানি তেলের মূল্য বাজারমূল্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে বিশ্ববাজারের মূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি মূল্য সমন্বয় নীতিমালা আছে। ওই নীতিমালা অনুযায়ী সেখানে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় হয়। বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য বাড়লে ভারতেও তা বাড়ে। আবার বিশ্ববাজারে কমলে তা কমানো হয়। সরকার এই তেলের মূল্যে কোনো হস্তক্ষেপ করে না। বাংলাদেশেও এলপিজি বা সিলিন্ডার গ্যাসের মূল্য এভাবে নির্ধারিত হয়ে থাকে। এলপিজির আমদানিমূল্য বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন প্রতি মাসেই প্রতি কেজি এলপি গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ করে থাকে। যেমন গত মাসে এলপি গ্যাসের মূল্য সামান্য কমেছে। আবার কোনো কোনো মাসে বেড়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকার এই প্রাইসিং ফর্মুলা অনুসরণ করতে পারে।

বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যে ওঠানামা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সরকার দেশে তেলের মজুত সক্ষমতা বাড়ায়নি। দেশে জ্বালানি তেলের মজুত ক্ষমতা ৩৫ থেকে ৪০ দিনের। অর্থাৎ সারাদেশে আমাদের যত ডিপো আছে তাতে সর্বোচ্চ ৪০ দিনের মজুত করা সম্ভব। এই মজুত সক্ষমতা কেন বাড়ানো হয় না, তা বোধগম্য নয়। কয়েক মাস আগে করোনাকালে তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৫০ ডলার। মজুত ক্ষমতা বেশি থাকলে কম দামে তখন অনেক বেশি আমদানি করা যেত। কিন্তু আমাদের সেই মজুত সক্ষমতা না থাকার কারণে ধারাবাহিকভাবে আমদানি করতে হয়। বিশ্ববাজারে দাম বেশি থাকলেও অপেক্ষা করার কোনো সুযোগ থাকে না। বিশ্ববাজারে ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেলের দাম অনেক কম। যেমন গতকাল ছিল ব্যারেলপ্রতি ৯৪ ডলার। কিন্তু পরিশোধিত ডিজেলের দাম ছিল ১৩০ ডলার। চট্টগ্রামে আমাদের একটি তেল পরিশোধনাগার আছে। সেখানে বছরে ১৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল রিফাইন বা পরিশোধন করা যায়। আজ থেকে ১২ বছর আগে আরও একটি পরিশোধনাগার তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এই পরিশোধনাগারটির ক্ষমতা ৩০ লাখ টন। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে দেশেই ৪৫ লাখ টন তেল পরিশোধন করা যেত। বেশি দামে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানিনির্ভরতা কমত। বৈদেশিক মুদ্রারও সাশ্রয় হতো। কিন্তু এই প্রকল্প এখনও আঁতুড়ঘরে। কবে এ প্রকল্প আলোর মুখ দেখবে, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। তেল আমদানিকারক একমাত্র সরকারি সংস্থা বিপিসির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও কম নয়। জ্বালানি তেলের সিস্টেম লসের নামে অনেক চুরি হয় বলে অভিযোগ আছে। এটা কমানোর ক্ষেত্রে তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায় না। বিপিসি যে পরিমাণ লোকসান দেখায়, তার সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। এ জন্য বিপিসির আমদানি ব্যয়, বিক্রি, লাভ-লোকসান নিয়ে গণশুনানি হতে পারে। বিপিসির কার্যক্রমে আরও স্বচ্ছতা আনা প্রয়োজন। এ বিষয়গুলো সরকার নজরে আনলে জনগণের দুর্ভোগ কিছুটা কমতে পারে।

সবুজ ইউনুস: সহযোগী সম্পাদক ও অনলাইন ইনচার্জ, সমকাল