যেভাবে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করা হলো, তাতে কোনো নিয়ম ও ছক মানা হয়নি। বিশ্বব্যাংকেরও নিয়ম রয়েছে- জ্বালানির মতো জনগুরুত্বপূর্ণ যেসব বিষয় রয়েছে, সেসবের দাম সরকার বা মন্ত্রণালয় একাই বৃদ্ধি করতে পারে না। এজন্য ভোক্তা, মন্ত্রণালয় এবং সরকার আলোচনা করবে। একটি গণশুনানির মধ্য দিয়ে দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করতে পারে। এই ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হতে হবে, দাম কতটা ধরা হবে। কতটুকু ভর্তুকি প্রত্যাহার করা হবে।

শোনা যাচ্ছে, সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএফএম) ঋণ পেতে গিয়ে অংশীজনের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই সরাসরি জ্বালানির দাম বৃদ্ধি করল। বাংলাদেশের সব ধরনের জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণ করার একমাত্র সংস্থা হলো বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এখন সরকার যেভাবে নির্বাহী আদেশে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করেছে, এটা তার করার কথা নয়। এটি নিয়ে ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো এর আগেও মামলা করেছিল, সে মামলা এখনও ঝুলে আছে। এমন পরিস্থিতিতে আবারও চাইলে মামলা করতে পারে।

আর আইএমএফ ঋণ সম্পর্কে আমি এর আগেও মন্তব্য করেছিলাম। সেগুলোর বেশিরভাগই অনেকের মতের সঙ্গে মেলেনি। আমার মতে, যে কোনো ঋণকে বিচার করতে গেলে দুটি দিক থেকে বিচার করতে হয়। একটি হচ্ছে পরিমাণের দিক থেকে। পরিমাণের গুরুত্ব কতটুকু আমাদের কাছে। অর্থাৎ, ঋণের পরিমাণটি কেমন, তা বিচার করা। দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, গুণগত। অর্থাৎ, কোনো শর্ত আছে কিনা। ঋণটি কী কাজে লাগবে? এর উপযোগিতা বিশ্নেষণ করা।

এখনকার আলোচিত আইএমএফ ঋণের পরিমাণ আমাদের সারা বছরের রপ্তানি আয়ের মোট কত অংশ, তা দিয়ে আমরা বিচার করতে পারি। ধরি, গত বছর আমাদের রপ্তানি আয় ৬০ বিলিয়ন ডলার। তাহলে এই ঋণের পরিমাণ আমাদের এক সপ্তাহের আয়ের সমান। আবার যদি আমরা আমদানি করার দিক থেকে বিবেচনা করি, আইএমএফের ঋণ মোট আমদানির কত শতাংশ তা দেখতে পারি। এখন সবকিছুর দাম বৃদ্ধির পরে অবশ্য আমদানি ব্যয় বেড়েছে। বর্তমানে ৫-৬ শতাংশ আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। তার পরও আমদানি গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ বিলিয়ন ডলারে। তাতে দেখা যায়, আইএমএফের এই ঋণের পরিমাণ আমদানি ব্যয়ের দিক থেকে এক সপ্তাহের ব্যয়ের সমান।

সুতরাং এই ঋণ যে পরিমাণগত দিক থেকে বিশাল বড় অঙ্কের ঋণ, তা আমি মনে করি না। কিন্তু আকস্মিক পণ্যের দাম বৃদ্ধির ফলে যে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, সেটা সামলানোর জন্য সরকার অস্থির হয়ে এই কাজ করছে। আইএমএফের শর্ত মেনে ঋণ নিচ্ছে। আবার এই চাপ বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় ফুয়েল দিচ্ছে তারা, যারা চায় আইএমএফের ঋণ নিয়ে দেশের অর্থনীতির মৌলিক বা মূল দিক পরিবর্তন করতে।

এখন এই মৌলিক দিকটি কী? আমাদের মতো দেশে প্রথমে যেটি করতে বাধ্য হই সেটি হলো, যে কোনো পরিস্থিতিতে শুরুতেই ভর্তুকি বাদ দিতে বাধ্য হই। কর আরোপ করতে বাধ্য হই। যেমন- আমাদের দেশের কৃষিপণ্য এবং জ্বালানি খাতে কিছুটা ভর্তুকি দিয়ে থাকি। কৃষিতে ভর্তুকি দিই। কারণ, নইলে কৃষিতে উৎপাদন কমে যাবে। আমাদের একটি বিরাট অংশের আয় কমে যাবে। বাজার সংকুচিত হবে। শিল্পায়ন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কৃষি উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যাভাব দেখা দিতে পারে। তখন আরও ডলার বেশি বরাদ্দ করে খাদ্য আমদানি করতে হতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকারে যেহেতু আওয়ামী লীগ আছে এবং দলটি এখনও যেহেতু গ্রামের কথা বলে থাকে; এখনও কৃষিতে ভর্তুকি দেওয়া হয়। বিশেষ করে মতিয়া চৌধুরী যখন কৃষিমন্ত্রী ছিলেন, তখন থেকে। সে সময় থেকে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এই ভর্তুকির বিরোধিতা করে আসছে। এসব প্রতিষ্ঠান সব সময়ই ভর্তুকিবিরোধী। আইএমএফের সঙ্গে আমাদের উন্নয়নের দর্শনগত একটি বিরোধ রয়েছে।

অবশ্য জ্বালানি খাতে ভর্তুকির বিষয়টি অনেকটা ভিন্ন। জ্বালানির ক্ষেত্রে লাফিয়ে লাফিয়ে যেভাবে দাম বেড়েছে, সেখানে দাম বাড়িয়ে হয়তো ভর্তুকি কিছুটা কমিয়ে আনতে চেয়েছে সরকার। কিন্তু অনেকে মনে করেন, আমাদের জ্বালানিতে যে দুর্নীতি আছে, যে পরিমাণ অপচয় আছে, তা যদি সরকার ঠিকমতো রোধ করতে পারত তাহলে ভর্তুকি কিছুটা কমিয়ে আনা যেত। তাহলে আইএমএফের ঋণও এত জরুরি হতো না।

এই প্রশ্নও জরুরি- ভর্তুকি দিয়ে আমরা কতদিন চলব? এখন অনেকেই বলেন, আমাদের একটি অর্থনৈতিক সংস্কার দরকার। সেটি দ্রুত করতে মনোযোগ দিতে হবে।
এম এম আকাশ: অর্থনীতিবিদ; অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়