দেশে খনিজসম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রমে এক রকম ভাটার টান। অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতিতে উল্টো কমছে উৎপাদন। সরবরাহ বাড়াতে নেই সঠিক পরিকল্পনা। দিন দিন বাড়ছে এর চাহিদা। ঘাটতি মেটাতে জ্বালানি খাতে আমদানি নির্ভরতাও বাড়ছে। জ্বালানি তেলের পাশাপাশি এখন গ্যাসও আমদানি হচ্ছে। বাড়ছে কয়লা আমদানিও। বিশ্ববাজারে উচ্চ দর এবং পরিকল্পনা নির্ধারণে অদূরদর্শিতায় আমদানিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়েনি। ফলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই আপৎকালে জ্বালানি সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।

নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তায় বিদ্যুৎ, সার ও শিল্প উৎপাদন খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। জ্বালানির আকাশচুম্বী আন্তর্জাতিক দর সরকারের ভর্তুকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। খরচ সামলাতে বারবার বাড়ানো হচ্ছে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও তেলের দাম। বেড়ে যাচ্ছে দ্রব্যমূল্য, কৃষি উৎপাদন ও পরিবহন খরচ। সবকিছুর চাপে চিড়েচ্যাপ্টা সাধারণ মানুষের জীবন।

জ্বালানির এমন দুঃসময়ে আজ মঙ্গলবার পালিত হচ্ছে জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস। এ উপলক্ষে আলাদা বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নিয়ামক হিসেবে জ্বালানিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বিশেষজ্ঞরা নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় সম্পদ অনুসন্ধানে জোরাল পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

অনুসন্ধান গতিহীন, আমদানি বাড়বে :তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নিয়োজিত একমাত্র রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স অনেকটাই হাত গুটিয়ে আছে। কয়েক বছরে স্থলভাগে বড় কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিস্কৃত হয়নি। সমুদ্রেও গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম আশাব্যঞ্জক নয়। ২০১৪ সালে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ মিটলেও বাংলাদেশ এখনও সমুদ্রসম্পদ বিষয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। মাল্টিক্লায়েন্ট সার্ভের জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ পেলেও দু'বছরেও কাজ শুরু করেনি। এদিকে মিয়ানমার ২০১৪ সালে বিরোধ মেটার পরই সমুদ্রে তার অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করে। দেশটি এরই মধ্যে সমুদ্রে বড় ধরনের গ্যাসের মজুত আবিস্কার করেছে।

অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে মজুত গ্যাসক্ষেত্রগুলোয় উৎপাদন কমছে।

শুধু সিলেট গ্যাসফিল্ড কোম্পানির দৈনিক উৎপাদন এক বছরে ১৫ কোটি ঘনফুট থেকে ৮ কোটি ঘনফুট হয়েছে। পুরোনো গ্যাসকূপগুলো সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেই। রশিদপুরে একটি কূপে গ্যাস মিললেও মাত্র আড়াই কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপনের অভাবে ছয় বছর ধরে গ্যাস উত্তোলন বন্ধ।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, দেশের জ্বালানি খাত এককভাবে গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানির প্রায় ৭৩ শতাংশ মেটানো হয় গ্যাস থেকে। পেট্রোবাংলা বলছে, দেশে গ্যাসের মজুত আছে ৩৫ দশমিক ৮০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। এর মধ্যে উত্তোলনযোগ্য বলে ধরা হয় ২৮ দশমিক ৪৭ টিসিএফ। ১৫ টিসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। বাকি গ্যাস আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ফুরিয়ে যাবে বলে ধারণা জ্বালানি বিভাগের।

বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা ৪২০ কোটি ঘনফুট। পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, গত রোববার সারাদেশে গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে ২৯০ কোটি ঘনফুট। ঘাটতি ছিল ১৩০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে আমদানি করা এলএনজি থেকে মিলছে ৫৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে পাওয়া গেছে ২৩৫ কোটি ঘনফুট। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিস্কৃত না হলে দেশীয় গ্যাসের এই উৎপাদন সামনের বছরগুলোতে আরও কমবে। ২০১৭ সালের গ্যাস খাতের মহাপরিকল্পনা অনুসারে ২০২৫ সালে দেশে গ্যাসের চাহিদা দাঁড়াবে ৪৪০ কোটি ঘনফুট। একদিকে চাহিদা বাড়বে, অন্যদিকে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমতে পারে। এতে বেড়ে যাবে ঘাটতি। অনুসন্ধান না বাড়ালে আগামীতে দেশ আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, যা অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত। কারণ এলএনজি আমদানি করতে বছরে ২০-৩০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এলএনজি খাতে ভর্তুকির জন্য প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে। যদিও পেট্রোবাংলা অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ৪৪ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে। এলএনজি আমদানি যত বাড়বে, ভর্তুকিও তত বাড়বে।

কয়লা আমদানি সংকট বাড়বে :দেশে পর্যাপ্ত কয়লার মজুত থাকলেও পরিবেশ ইস্যু, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতা এবং ভূতাত্ত্বিক গঠনের কারণে অদূর ভবিষ্যতে উৎপাদন বাড়ার সম্ভাবনা নেই। তাই কয়লার ক্ষেত্রেও আমদানিনির্ভর হতে হবে। কারণ কয়লাভিত্তিক একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসছে।

পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, বাংলাদেশে আবিস্কৃৃত পাঁচটি খনিতে প্রায় ৭৯৬ কোটি টন কয়লা মজুত আছে। এর মধ্যে বড়পুকুরিয়ায় ৩৯, ?ফুলবাড়ীতে ৫৭, দীঘিপাড়ায় ৮৬, খালাসপীরে ৬৮ এবং জামালগঞ্জে ৫৪৫ কোটি টন কয়লা মজুত রয়েছে। এর মধ্যে শুধু বড়পুকুরিয়া খনি থেকে কয়লা তোলা হচ্ছে, যা দিয়ে ৪৪৪ মেগাওয়াটের দেশের একমাত্র কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চলছে। বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ মালিকানার পায়রায় এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ মালিকানায় রামপালে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট এবং মাতারবাড়ীতে জাপান ও বাংলাদেশের যৌথ মালিকানায় এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট প্রকল্প চালু হওয়ার অপেক্ষায়। এই তিন বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দৈনিক প্রয়োজন হবে ৩৮ হাজার টন কয়লা। বার্ষিক চাহিদার পরিমাণ এক কোটি ৩৮ লাখ ৭০ হাজার টন। এ ছাড়াও কয়েকটি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ চলমান, যেগুলো চলবে আমদানি করা কয়লা দিয়ে। কয়লার দাম গতকাল সোমবার বিশ্ববাজারে ছিল ৩১০ মার্কিন ডলার, যা গত বছরের জুনেও ১০০ ডলারের নিচে ছিল। এ বছরের শেষে এবং আগামী বছর যখন বড় বড় কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হবে তখন উচ্চমূল্যের কয়লা আমদানি খরচ বাংলাদেশ কতটুকু সামাল দিতে পারবে, তা নিয়ে শঙ্কায় খাতসংশ্নিষ্টরা।

জ্বালানি তেল :দেশের জ্বালানির অন্যতম উৎস জ্বালানি তেল। প্রতিবছর এ চাহিদা বাড়ার হার ১০ থেকে ১২ শতাংশ। দেশে বছরে ৫৫ থেকে ৬০ লাখ টন তেল আমদানি করা হয়। পরিবেশদূষণ এবং বেশি খরচের কারণে তেলের ব্যবহার বাড়ার সুযোগ নেই। বিশ্বে দাম বাড়ায় দেশে ৯ মাসের মধ্যে দুই দফা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে, যা জনজীবনে ফেলেছে বিরূপ প্রভাব।

বিকল্প উৎসে সুখবর নেই :জ্বালানির বিকল্প উৎসের মধ্যে পারমাণবিক জ্বালানি এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। এগুলো এখনও দেশের জন্য জ্বালানির ভালো উৎস হয়ে ওঠেনি। পারমাণবিক একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে চালু হবে। আরেকটি স্থাপনের কথা চলছে। আর নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ছে। তবে বাংলাদেশে জমিস্বল্পতার কারণে সৌরবিদ্যুতের বড় প্রকল্পগুলো হোঁচট খাচ্ছে। সমীক্ষায় বায়ুবিদ্যুতের খুব বেশি সম্ভাবনা পাওয়া যায়নি।

জ্বালানিতে বরাদ্দ কম :জ্বালানিকে জাতীয় বাজেটে সব সময় বিমাতার নজরে দেখা হয়েছে। ঘাটতি থাকলেও বাজেটে সব সময় জ্বালানিতে নামমাত্র বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ফলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা টেকসই হয়নি কখনও। চলতি অর্থবছরে (২০২২-২৩) জ্বালানিতে ১ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গত অর্থবছরের (২০২১-২২) বাজেটে বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ৮৬ কোটি টাকা। কয়েক বছর থেকেই এমনটা চলে আসছে।

জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. ম. তামিম বলেন, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে রয়েছে। স্থলভাগে নতুন গ্যাসক্ষেত্র মিলছে না। কয়লা নিয়েও নেই কোনো উদ্যোগ। সমুদ্র এখন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার বড় ভরসা হলেও সেখানে অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরুই হয়নি। সরকার মূলত তাকিয়ে আছে আমদানির দিকে। এখন বিশ্ববাজারে পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম বাড়ছে। তাই আমদানি নির্ভরতা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর পুরো নির্ভরশীল হওয়া বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে আমদানি নির্ভরতা কমাতে দেশে খনিজসম্পদের অনুসন্ধান বাড়াতে হবে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহারের ওপর। রোধ করতে হবে অপচয়ও।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরূল ইমাম সমকালকে বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দেশীয় সম্পদ অনুসন্ধানে জোর দিতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে।

জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস আজ :জ্বালানি ব্যবহারে জনগণকে সচেতন করতে ২০১০ সাল থেকে সরকারিভাবে পালন করা হচ্ছে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস। দিবসটির তাৎপর্য হচ্ছে, ১৯৭৫ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শেল অয়েল কোম্পানির কাছ থেকে ৪৫ লাখ পাউন্ড স্টার্লিংয়ে (তখনকার ১৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকা) পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানায় কিনে নেন। ক্ষেত্রগুলো হচ্ছে- তিতাস, বাখরাবাদ, রশিদপুর, হবিগঞ্জ ও কৈলাসটিলা। এই গ্যাসক্ষেত্রগুলো দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার বড় নির্ভরতা হয়ে ওঠে। এখন দেশে মোট গ্যাস উৎপাদনের মধ্যে আন্তর্জাতিক তেল গ্যাস কোম্পানি (আইওসি) ৫৯ শতাংশ এবং দেশীয় কোম্পানিগুলো ৪১ শতাংশ গ্যাস উৎপাদন করছে। দিবসটি উপলক্ষে আজ একটি ওয়েবিনারের আয়োজন করেছে জ্বালানি বিভাগ।