চলতি বছরের জানুয়ারি-জুলাই পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীর প্রতি সহিংসতার কমপক্ষে ১২টি ঘটনা ঘটেছে ৷ এর মধ্যে ৭টি পার্বত্য চট্টগ্রামে এবং ৫টি সমতল এলাকায় সংঘঠিত হয়েছে ৷ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারী, শিশু ও মানসিক প্রতিবন্ধীও এসব ঘটনায় সহিংসতার শিকার  হয়েছেন। 

বেসরকারি সংস্থা কাপেং ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে ৷ মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে কাপেং ফাউন্ডেশন ৷

প্রতিবেদনে বলা হয়, নারীর প্রতি সহিংস ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে- ১ জনকে ধর্ষণ, ৩ জনকে দলগত ধর্ষণ, ২ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা, ৩ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা, ২ জনকে হত্যার চেষ্টা এবং আরও ২ জনকে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি মর্মান্তিক ও নৃশংস ছিল বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলায় এক জুম্ম নারীকে ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সহিংস আচরণ দিন দিন বাড়ছে ৷ ভূমি বেদখল, হামলা, বসতভিটা জ্বালিয়ে দেওয়া, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নিয়ে কাজ করা মানবাধিকার কর্মীদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা এবং হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা দেওয়া, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, ধর্ষণের পর হত্যা প্রভৃতি সংঘটিত হচ্ছে। সে কারণে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানবাধিকারের অবস্থা নাজুক হচ্ছে।

কাপেং ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ বলছে, ভূমি বেদখল অথবা দখলের চেষ্টা, আবাদী ফসল নষ্ট করে দেওয়া, বাধা, হত্যার হুমকি ও ভূমি থেকে উচ্ছেদ সংক্রান্ত ২১টি ঘটনা ঘটেছে। এগুলোর মধ্যে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর চিরায়ত ভূমি বেদখলের ঘটনা ঘটেছে ২টি৷ 

এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৮৯১ একরের মতো জমি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ভূমি দস্যু কর্তৃক দখল করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ৪৪টি পরিবার এবং ৪ জন্য ব্যক্তির অন্তত ২৩ একর জমি দখল করে নেওয়া হয়েছে। প্রায় ৩৯টির মতো ঘটনা ঘটেছে যেগুলোতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের আবাদী ফসল নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, ২ জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কৃষককে তাদের জমিতে কাজ করতে বাঁধা দেওয়া হয়েছে, ১ জনকে হত্যা করার হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং প্রায় ৭১টি উপজাতি পরিবার ভূমি থেকে উচ্ছেদের হুমকিতে রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বান্দরবানের আলিকদম উপজেলার মাতামুহুরি রিজার্ভ ফরেস্টের বিভিন্ন ঝিরি-ঝরনা থেকে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে ৷ সংরক্ষিত এলাকা থেকে অবাধে পাথর উত্তোলন করা হলেও প্রশাসনের কাছে ওই পাথর উত্তোলনকারীদের কোনো তথ্য নেই।  দীর্ঘদিন ধরে ক্রমাগত পাথর উত্তোলনের কারণে ঝিরি-ঝরনাগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে যার ফলশ্রুতিতে পাহাড়ে কৃষি কাজে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, পাহাড়ে বসবাস করা ত্রিপুরা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, চাকমা প্রভৃতি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সুপেয় পানির অভাবে ভুগছে।

কাপেং ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুসারে, উপজাতিদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়া, হামলা, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা ও আটক, তল্লাশি ও ভাঙচুর, হত্যা, মারধর ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যাসহ নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত মোট ৩৮টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৪৬টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, ১৬ জন উপজাতিকে বিনা অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, ১৩ টি বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়েছে, ১৪ জনকে নির্যাতন করা হয়েছে, ৩ জনকে হত্যা ও ২ জন আক্রমণের শিকার হয়েছে এবং ৩জনকে মারধর করা হয়েছে। এ ছাড়াও বান্দরবানের থানচি এবং আলিকদম উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ৬০ জনের অধিক ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়, যেখানে ১ জন শিশুসহ মোট ১০ জন রোগীর মৃত্যু হয়।

 কাপেং ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেপ্তার না করা, ন্যায় বিচার না পাওয়া, মিডিয়া এবং মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকাসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মূল ধারাগুলোর অবাস্তবায়নের ফলে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন বৃদ্ধি পেয়েছে।

 আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস-২০২২ উপলক্ষে কাপেং ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ সরকারকে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানবাধিকার সুরক্ষা ও প্রচারের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণসহ ভূমি ও প্রথাগত অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে ৷ সংগঠনটি দেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী অধিকার কর্মীদের মিথ্যা মামলা থেকে মুক্তি দেওয়া, সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সদস্যদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশনসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ ও যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণের জন্য আহ্বান জানিয়েছে৷